রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বর্ধমান-বরাফরের ১, ২ ও ৩ নং মন্দির তিনটিকে দ্বাদশ-শতকীয় বলিয়া মনে করিতেন; কিন্তু এরূপ মনে করিবার কোনও সঙ্গত কারণ নাই। বস্তুত গঠনরীতির দিক হইতে এই তিনটির একটিও চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের আগেকার মন্দির বলিয়া মনে হয় না। বর্ধমান-গৌরাঙ্গাপুরের ইছাইঘোষের দেউলটি সম্বন্ধেও প্রায় একই কথা বলা চলে; এই মন্দিরটি যেন আরও পরবর্তী। তবে, মধ্যযুগেও যে বাঙলাদেশে রেখা বা শিখরা-দেউল নির্মিত হইত, বিশেষভাবে পশ্চিম-বাঙলায়, এই মন্দিরগুলি তাহার প্রমাণ।
প্রাচীন বাঙলার রেখা বা শিখরা-দেউলগুলি বিশ্লেষণ করিলে সহজেই ইহাদের সঙ্গে ভুবনেশ্বরের শত্ৰুঘ্নেশ্বর, পরশুরামেশ্বর, মুক্তেশ্বর প্রভৃতি মন্দিরের সাদৃশ্য ধরা পড়িয়া যায় এবং
পূর্ববর্তী। তাহা ছাড়া, বাঙলার মন্দিরগুলির আর একটি বৈশিষ্ট্যও ধরা পড়ে; ওড়িশার মন্দিরগুলির মতো এই মন্দিরগুলির কোনও জগমোহন বা ভোগমণ্ডপ কিছু নাই, আমলক-সহ শিখর-শীর্ষ গর্ভগৃহই দেউলের একমাত্র অঙ্গ; অবশ্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে জগমোহনের পরিবর্তে সম্মুখ দিকের দেয়ালে একটি অলিন্দের সংযোজন আছে। ওড়িশার লিঙ্গরাজ ও পরবর্তী মন্দিরগুলির ভূমি-নকশায়ও অলংকরণে যে বৈচিত্র্য ও জটিলতা তাহাও বাঙলার মন্দিরগুলিতে নাই। বস্তুত, বাঙলার মন্দিরগুলি ক্ষুদ্রকায় হইলেও খুব মার্জিত ও সংযত রুচির পরিচয় বহন করে; চৈত্য-গবাক্ষ ও ক্ষুদ্রায়তন শিখরালংকার ছাড়া এই মন্দিরগুলির বিশেষ আর কোনও অলংকরণ নাই।
৩. স্তূপশীর্ষ ভদ্র বা পীড়-দেউলের নিদর্শন প্রাচীন বাঙলায় খুব বেশি দেখা যায় না। তবে, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রক্ষিত একটি পাণ্ডুলিপি-চিত্রে নালেন্দ্ৰ নামক স্থানের লোকনাথ-মন্দিরের একটি প্রতিকৃতি আছে। এই প্রতিকৃতিতে এই ধরনের মন্দিরের অন্তত একটি নিদর্শন দৃষ্টিগোচর। চতুষ্কোণ গৰ্ভগৃহের উপর ক্রমহ্রস্বায়মান ঢালু চালের কয়েকটি স্তর, তাহার উপর একটি বৃহদায়তন স্তূপ এবং প্রত্যেকটি স্তরের চারিটি কোণে কোণে একটি একটি করিয়া ক্ষুদ্রাকৃতি স্তূপের অলংকরণ। ইট বা পাথরের তৈরি এই রীতি কোনও দেউল নির্মাণের কোনও সাক্ষ্য আমাদের সম্মুখে নাই। তবে নির্মিত যে হইত। তাহার প্রমাণ এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রটি। ব্ৰহ্মদেশ-পাগানের অভয়দান এবং পাটো থাম্যা-মন্দির (একাদশ-শতক) দুটির স্থাপত্যরূপ ও রীতির পশ্চাতে যে এই ধরনের মন্দিরের অনুপ্রেরণা বিদ্যমান, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ নাই।
৪. শিখর শীর্ষ পীড় বা ভদ্ৰ দেউলেরও নির্মাণ-নিদর্শন আমাদের সম্মুখে উপস্থিত নাই; তবে একটি পাণ্ডুলিপি-চিত্রে পুণ্ড্রবর্ধনের বুদ্ধ-মন্দিরের যে প্রতিকৃতি আছে এবং কয়েকটি প্রস্তর-ফলকে যে ধরনের কয়েকটি মন্দির উৎকীর্ণ আছে তাহাতে অনুমান করা চলে যে, এই শিখর শীর্ষ পীড় বা ভদ্ৰ দেউলও বাঙলাদেশে সুপরিচিত সুপ্রচলিত ছিল। এই ধরনের মন্দিরের চতুষ্কোণ গৰ্ভগৃহের উপর স্তরে স্তরে ক্রমহ্রস্বায়মান চাল এবং সর্বোচ্চ চালটির উপর বক্ররেখায় একটি শিখর, শিখরের উপর আমলক-শিলা; বৌদ্ধমন্দির হইলে আমলক-শিলার উপর একটি অতি ক্ষুদ্রকায় স্তূপের প্রতীক। শিখরের আকৃতি কোথাও হ্রস্ব, কোথাও দীর্ঘািয়ত। ব্ৰহ্মদেশের পাগান নগরে একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় থাটবিঞ, টিহ্-লো-মিনহ-লো. শোয়েগু-জ্যি ও অন্যান্য অনেকগুলি মন্দিরের পশ্চাতে প্রাচীন বাঙলার এই ধরনের মন্দিরের অনুপ্রেরণা বিদ্যমান।
পাহাড়পুরের মন্দির
প্রায় পঁচিশ বৎসর আগে রাজশাহী জেলার পাহাড়পুর গ্রামে এক বিরাট ধবংসস্তূপ উন্মোচন করিয়া একটি বিপুলকায় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। চারিদিকে কক্ষসারি লইয়া সুবিস্তৃত বিহারের ধ্বংসাবশেষ, তাহারই সম্মুখে বিস্তৃত প্রাঙ্গণের কেন্দ্ৰস্থলে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। মন্দিরের চাল নাই, চুড়া নাই; চারিদিকের প্রাচীর পড়িয়াছে ভাঙিয়া; প্রদক্ষিণ পথ, পূজাকক্ষ, সমস্তই ইটে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে; তবু এই বিরাট ধ্বংসাবশেষের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ইহার গঠনরেখা ও রীতি ধীরে ধীরে অনুসরণ করিলে ইহার সামগ্রিক আকৃতি-প্রকৃতি ক্রমশ চোখের সম্মুখে ফুটিয়া ওঠে। তখন স্বীকার করিতে বাধা থাকে না, এই মন্দির প্রাচীন বাঙলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিস্ময়। ভারতীয় ও বহির্ভারতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে এই মন্দির গরিমায় উজ্জ্বল এবং রূপে ও রীতিতে তুলনাহীন না হইলেও এই জাতীয় আপাতজ্ঞাত সকল সর্বতোভদ্র মন্দিরের পুরোভাগে ইহার স্থান।
ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্ৰে ‘সর্বতোভদ্র’ নামে একশ্রেণীর মন্দিরের উল্লেখ ও পরিচয় আছে। এই ধরনের মন্দির চতুষ্কোণ এবং চতুঃশালগুহ, অর্থৎ ইহার চারিদিকে চারিটি গর্ভগৃহ এবং সেই গৃহে প্রবেশের জন্য চারিদিকে চারিটি তোরণ। শাস্ত্রানুযায়ী এই ধরনের মন্দির হইত। পঞ্চতল, প্রত্যেক তলের ষোলোটি কোণ অর্থাৎ চতুষ্কোণের প্রত্যেকটি বাহু সম্মুখে বিস্তুত করিয়া এক এক দিকে চারিটি (চারিদিকে ষোলোটি) কোণ রচনা, প্রত্যেক তল ঘিরিয়া প্ৰদক্ষিণ পথ এবং প্রাচীর; সমগ্র মন্দিরটি অলংকৃত হইত। অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতি শিখর ও চূড়ায়। পাহাড়পুরের সুবিস্তৃত মন্দিরটি এই সর্বতোভদ্র মন্দিরের উজজুল নিদর্শন। এই ধরনের সর্বতোভদ্র মন্দির ভারতের নানাস্থানে নিশ্চয়ই নির্মিত হইয়াছিল, নহিলে বাস্তুশাস্ত্ৰে ইহার উল্লেখ থাকিবার কথা নয়; কিন্তু এক পাহাড়পুর ছাড়া ভারতবর্ষে আর কোথাও এই ধরনের মন্দির আজ আর দৃষ্টিগোচর নয়, আর কোনও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষও এ-পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। বোধ হয় মন্দির-স্থাপত্যের এই রূপ ও রীতি ভারতবর্ষে বহুল প্রচারিত ও অভ্যস্ত হইতে পারে নাই; তবে এই রূপ ও রীতি যে বহির্ভারতে, অন্তত প্রাচীন যবদ্বীপ ও ব্ৰহ্মদেশের মনোহরণ করিয়াছিল, এ-সম্বন্ধে সুপ্রচুর সাক্ষ্য বিদ্যমান। ব্ৰহ্মদেশে প্রাচীন পাগান নগরের চতঃশাল থািটবিএঃ বা সর্বজ্ঞ, শোয়েগু-জ্যি, টিহু-লো-মিনহ-লো প্রভৃতি মন্দিরের পশ্চাতে এই ধরনের সর্বতোভদ্র মন্দিরের অনুপ্রেরণা ছিল এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। যবিদ্বীপে প্রাস্বনাম নগরীর প্রাচীন লোরো-জোংরাং মন্দির, শিব-মন্দির প্রভৃতিও একই অনুপ্রেরণায় কল্পিত ও গঠিত। কালের দিক হইতে অষ্টম-শতকীয় পাহাড়পুর-মন্দির ইহাদের সকলের আদিতে।
