স্তূপের পরই বিহারের কথা বলিতে হয়। স্তূপ যদি ছিল পূজার প্রতীক, শ্রদ্ধার বস্তু বিহার ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের আবাসস্থল, অধ্যয়ন-অধ্যাপনার, নিয়মসংযম-পালনের আশ্ৰয়। আদিম বৌদ্ধ বা জৈন বিহার পাড়ার কুঁদিয়া তৈরি গুহা মাত্র। সাধারণত একই পাহাড়ে যেখানে খানিকটা সমতল ভূমি আছে তাহার তিন দিক ঘিরিয়া সমান-অসমান গুহার সারি; সেই পাহাড়েরই অন্যত্র সুবিধানুযায়ী এবং প্রয়োজনানুযায়ী আরও কয়েকটি গুহা। এই গুহাগুলি ভিক্ষুকদের আবাস-স্থল, বৃহত্তর একটি বা দু’টি গুহা সম্মেলন-স্থল বা পজাস্থল , সমতলে আঙ্গিনাটি সভ্যস্থল এবং সব কিছু লইয়া একটি বিহার। কিন্তু এই ধরনের বিহার-রচনা ঠিক স্থাপত্য নয়, নির্মাণগত কোনও বুদ্ধি বা সৌন্দর্যের কোনো প্রেরণা এ-ক্ষেত্রে সক্রিয় নয়। পাহাড় কুঁদিয়া এই ধরনের বিহার রচনা ছাড়া ইট বা পাথরের ভিত্ ও কাঠামোর উপর বাঁশ, কাঠ ইত্যাদির সাহায্যে বিহার রচনার একটা চেষ্টাও ছিল এবং সে-ক্ষেত্রে বিন্যাসের একটা যুক্তিও সক্রিয় ছিল। মাঝখানে সুবিস্তৃত অঙ্গন; সেই অঙ্গনের চারিদিক ঘিরিয়া কক্ষশ্রেণী; এক একদিকের কেন্দ্র-কক্ষটি বৃহত্তর; অঙ্গনের এক কোণে কুল্প ও স্নানািচমনস্থান; এবং বিহারে ঢুকিবার একটিমাত্র প্রবেশদ্বার।
বৌদ্ধ ও জৈন সংঘের বিস্তৃতি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমৃদ্ধ বৃহদায়তন বিহারের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং ইটের সাহায্যে সেই বিহার-রচনার সূচনা হয়, সদ্যোক্ত বাঁশ-কাঠে নির্মিত বিহারের বিন্যাস অনুযায়ী। একতল বিহারে যখন কুলাইল না। তখন দ্বিতল, ত্রিতল, এমন কি নবতাল পর্যন্ত বিহার নির্মিত হইতে আরম্ভ করিল এবং গোড়ায় যে বিহার ছিল ভিক্ষুকদের আবাসস্থল মাত্র সেই বিহারই হইয়া উঠিল বিরাট জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার, ধৰ্মকৰ্ম-সাধনার কেন্দ্র।
প্রাচীন বাঙলায়ও এই ধরনের ছোট-বড় বিহার ছিল অনেক এবং ইহাদের কথা আগেই অন্য প্রসঙ্গে বলিয়াছি। এই সব বিহারের সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্যের কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায় য়ুয়ান-চোয়াঙ-কথিত পুণ্ড্রবর্ধনের পো-সি-পো বা ভাসূ-বিহার এবং কর্ণসুবর্ণের লো-টো-মো-চিহ বা রক্তমৃত্তিকা-বিহারের বর্ণনায়। ভাসু-বিহারের ধ্বংসাবশেষ দৃষ্টিগোচর মহাস্থানের সন্নিকটে বৃহৎ একটি স্তূপে, রক্তমৃত্তিকা-বিহারের ধ্বংসাবশেষ মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙামাটির সন্নিকটে রাক্ষসডাঙ্গায়।
সোমপুর-বিহার
খননাবিষ্কারের ফলে জানা গিয়াছে রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে অন্তত দুইটি বিহার ছিল। ৪৭৮-৭৯ খ্ৰীষ্ট তারিখের একটি লিপিতে জানা যায়, এই স্থানের বট-গোহালী বা গোয়াল-ভিটায় আচার্য গুহনদীর একটি জৈন-বিহার ছিল, আর অষ্টম শতকের শেষার্ধে যে সোমপুরের শ্ৰীধর্মপাল-মহাবিহার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল এবং পরবর্তীকালে এই বিহারের খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা দেশে-দেশান্তরে ব্যাপ্ত হইয়াছিল, এ-তথ্য তো সুবিদিত। জৈন-বিহারটির ভূমি-নকশা ও আকৃতি-প্রকৃতি কী ছিল তাহা জানিবার কোনও উপায় আজ আর নাই। কিন্তু সুবিস্তৃত ধর্মপাল-বিহারটির নকশা ও আকৃতি-প্রকৃতি দৃষ্টিগোচর। এত বৃহৎ ও সমৃদ্ধ বিহার ভারতবর্ষের এক নালন্দা ছাড়া আর কোথাও আবিষ্কৃত হয় নাই; ইহার মহাবিহার নাম যথার্থ এবং সার্থক। বিস্তৃতভাবে এই বিহারের বর্ণনা দিবার স্থান ও সুযোগ নাই, তবু কিছুটা পরিচয় লইতেই হয়।
প্রত্যেক দিকে প্রায় ৯০০ ফিট, এমন একটি সমচতুষ্কোণ জুড়িয়া বিহারটি বিস্তৃত এবং দৃঢ় সুপ্রিশস্ত বহিঃপ্রাচীরদ্বারা বেষ্টিত। এই প্রাচীর ঘেঁষিয়া ভিতরের দিকে সারি সারি প্রায় ১৮০টির উপর কক্ষ; প্রত্যেক দিকের কেন্দ্রের কক্ষটি বৃহত্তর। কক্ষসারির সম্মুখ দিয়া সুপ্ৰশস্ত বারান্দা লম্বমান হইয়া চলিয়া গিয়াছে চারিদিক ঘিরিয়া; কেন্দ্রের সিঁড়ি বাহিয়া বারান্দা হইতে নামিলেই সুপ্রিশস্ত অঙ্গন এবং অঙ্গনের একেবারে কেন্দ্ৰস্থলে সুউচ্চ সুবৃহৎ মন্দির। বারান্দার প্রান্তে সিঁড়ির উপরই স্তম্ভশ্রেণী; এই স্তম্ভশ্রেণী ও কক্ষের দেয়ালের উপর ছাদ। বহিঃপ্রাচীরের প্রশস্ততা এবং স্তম্ভশ্রেণীর ঘন সন্নিবেশ দেখিয়া মনে হয়। বিহারটির একাধিক তল ছিল এবং কেন্দ্রীয় মন্দিরের উচ্চতা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে প্রমাণ রক্ষা করিয়া সমগ্র বিহারটির উচ্চতা ও সমৃদ্ধি নিরূপিত হইয়াছিল।
বিহার-মন্দিরে প্রবেশের প্রধান তোরণ ছিল উত্তর দিকে। সমতল ভূমি হইতে সুপ্ৰশস্ত সোপানশ্রেণী বাহিয়া উপরে উঠিয়া সুবৃহৎ একটি দরজা পার হইলেই সম্মুখে স্তম্ভসমৃদ্ধ সুপ্ৰশস্ত একটি কক্ষ; সেই কক্ষটি সোজা পার হইয়া গেলে দক্ষিণ দিকের কেন্দ্রে একটি ক্ষুদ্রতর দ্বার। এই দ্বার দিয়া ঢুকিতে হয়। আর একটি স্তম্ভযুক্ত ক্ষুদ্রতর কক্ষে। কক্ষটির পরই লম্বমান বারান্দা; এই বারান্দা ধরিয়া চতুর্দিকের কক্ষশ্রেণী সমানে ঘুরিয়া আসা যায়, আর সোপান বাহিয়া নীচে নামিলেই সুপ্ৰশস্ত অঙ্গন; একেবারে চোখের সম্মুখে সুউচ্চ মন্দিরের সম্মুখ দৃশ্য। প্রবেশের প্রধান তোরণটি ছাড়া উত্তর দিকের প্রায় পূর্বতম প্রান্তে আর একটি ছোট তোরণ। পূর্বদিকের বৃহত্তর কেন্দ্রীয় কক্ষের ভিতর দিয়া ভিতর-বাহিরে যাওয়া আসা করিবার আরও একটি খিড়কী-তোরণ বোধ হয় ছিল আবাসিকদের ব্যবহারের জন্য। দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে যাতায়াতের কোনও পার্থই ছিল না।
