ঢাকা জেলার আস্রফপুর-গ্রামে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জের একটি স্বল্পায়তন নিবেদন-স্তূপ বোধ হয় বাঙলার সর্বপ্রাচীন (আ সপ্তম-শতক) স্তূপ-নিদর্শন রাজশাহী জেলার পাহাড়পুর এবং চট্টগ্রাম জেলার ঝেওয়ারী গ্রামেও দুইটি ব্রোঞ্জের আকৃতি নিবেদন স্তূপ পাওয়া গিয়াছে। এই ধরনের স্তূপের প্রতিকৃতি বাঙলার সমসাময়িক প্রস্তরফলকেও উৎকীর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাদের আকৃতি-বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বিশেষভাবে বলিবার কিছু নাই।
পাথরে কুঁদিয়া তৈরি একটিমাত্র নিবেদন-স্তূপের খবর আমরা জানি; এই স্তূপটি যোগী-শুফায় প্রতিষ্ঠিত। প্রথম দর্শনে ইহাকে স্তূপ বলিয়াই মনে হয় না। ভিত, বেদী, মেধি, অণ্ড, হর্মিকা, ছত্রাবলী প্রভৃতি সব কিছুরই গতি এমন উর্ধ্বমুখী যে সমগ্র স্তূপটিকে মনে হয় যেন একটি ক্রমহ্রস্বয়মান গোলাকৃতি স্তম্ভ এবং স্তম্ভেরই অংশে খাজ কাটিয়া কাটিয়া যেন স্তূপটির বিভিন্ন অংশের রূপ দেওয়া হইয়াছে। চতুষ্কোণ হৰ্মিকাটি তো যেন একান্তই একটি গোলাকৃতি আমলক-শিলায় পরিণত।
সমসাময়িক পাণ্ডুলিপি-চিত্রেও কয়েকটি স্তূপের প্রতিকৃতি দেখিতে পাওয়া যায়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পাণ্ডুলিপিতে (১০১৫ খ্ৰী) বরেন্দ্রভূমির মৃগস্থাপন-স্তূপের একটি চিত্র আছে; সপ্তম শতকে এই স্তূপটির কথাই বোধ হয় ইৎসিঙ উল্লেখ করিয়াছেন। আর একটি পাণ্ডুলিপি পত্রে বরেন্দ্রভূমির “তুলাক্ষেত্রে বর্ধমান-স্তূপ”-এর একটি চিত্র আছে। এই বর্ধমান স্থান-নাম হয়, খুব সম্ভব জৈন-তীৰ্থংকর বর্ধমানের নাম এবং যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে এই স্তূপটির প্রাচীন বাঙলায়। জৈন-স্তূপের একমাত্র জ্ঞাত নিদর্শন। তৃতীয় আর একটি স্তূপের ছবি আছে আর একটি পাণ্ডুলিপিতে অলংকরণ-সমৃদ্ধির কথা বাদ দিলে আকৃতি-প্রকৃতির দিক হইতে সব ক’টি স্তূপ প্রায় একই প্রকারের। খাজকাটা চতুষ্কোণ ভিত্তি, ধাপে ধাপে তৈরি বেদী, পদ্মাকৃতি মেধি, ক্রমহ্রস্বয়মান অণ্ড ও ছত্রাবলী প্রত্যেকটি স্তূপেরই বৈশিষ্ট্য।
রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে, বিশেষভাবে সত্যপীরের ভিটায় এবং বাঁকুড়া জেলার বহুলাড়ায় খননবিষ্কারের ফলে ইটের তৈরি কয়েকটি নিবেদন-স্তূপ আমাদের দৃষ্টিগোচর হইয়াছে। এই ধরনের স্বল্পায়তন নিবেদন-স্তুপুগুলি হয় পৃথক পৃথক, না হয় একই ভিতের উপর সারি সারি সাজানো, বা একই ভিতের উপর একটি বৃহত্তর স্তূপের চারদিকে চক্রাকারে ছোট ছোট স্তূপের বিন্যাস। এই ধরনের স্তূপ প্রায় সমস্তুই দশম-একাদশ-দ্বাদশ শতকের এবং ভিত্ ছাড়া ইহাদের আর কিছুই প্রায়ই অবশিষ্ট নাই, অর্থাৎ ইহাদের ভূমি-নকশা ছাড়া আর কিছু বুঝিবার কোনও সুযোগ নাই। এই ভূমি-নকশা কোনও কোনও ক্ষেত্রে চতুষ্কোণ বা গোলাকার, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চতুষ্কোণ ভিতের চারদিকে, ঠিক মধ্যখানে একটি একটি করিয়া চতুষ্কোণ সংযোজিত; তাহার ফলে সমগ্র ভূমি-নকশাটি যেন একটি ক্রুশের আকার ধারণ করিয়াছে। ভিতুগুলি প্রায়ই বেশ উঁচু এবং অনেক নিদর্শনে ক্রমহ্রস্বায়মান স্তরে স্তরে বিভক্ত। ভিতের দেয়ালের গায়ে নানা বুদ্ধমূর্তি। এই রূপ ও বিন্যাসের দিক হইতে, বস্তুত, সকল দিক হইতেই সমসাময়িক বিহারের নিবেদন-স্তূপগুলির সঙ্গে ইহাদের কোনোই পার্থক্য নাই? খননবিষ্কারের ফলে দেখা গিয়াছে, এই স্তূপগুলির গর্ভে অসংখ্য বৌদ্ধসূত্রোংকীর্ণ মাটির শীলমোহর রক্ষিত থাকিত। বৌদ্ধ বিশ্বাসানুযায়ী এই সূত্রগুলিই ধর্মশরীর এবং দেহাবশেষের পরিবর্তে এই ধর্মশরীরই স্তূপগর্ভে রক্ষা করা নিয়ম দাঁড়াইয়া গিয়াছিল।
স্তূপ-স্থাপত্যে বাঙলাদেশ নূতন কোনও বৈশিষ্ট্য রচনা করে নাই বলিয়াই মনে হয়; নূতন সমৃদ্ধির সংযোজনাও নাই। বৃহদাকৃতি স্তূপ-রচনার কোনও চেষ্টাও বোধ হয় ছিল না। বস্তুত, নৈবেদ্য বা নিবেদন উদ্দেশ্য ছাড়া, স্ব-স্বতন্ত্র স্থাপত্য নিদর্শন হিসারে স্তূপ গড়িয়া তুলিবার উল্লেখযোগ্য বিশেষ কোনো চেষ্টা বোধ হয় প্রাচীন বাঙলায় কিছু ছিল না, অন্তত প্রত্নসাক্ষ্যে তেমন প্রমাণ কিছু নাই। স্থাপত্য হিসাবে স্তূপ প্রাচীন বাঙলার চিত্ত আকর্ষণ করে নাই, অন্তত যে-সব নিদর্শন আমরা দেখিতেছি। তাহাতে সে-প্রমাণ নাই। অথচ, প্রায় সমসাময়িক কালে ব্ৰহ্মদেশের রাজধানী পাগান-নগরে দেখিতেছি, স্তূপ রচনার কী সমৃদ্ধি, কী ঐশ্বর্য! প্রায় একই ধরনের কি স্তু সুবিস্তৃত ভূমি-নকশার উপর সুউচ্চ ভিত্ স্তরে স্তরে ক্রমহ্রস্বায়মান হইয়া উপরের দিকে উঠিয়া গিয়াছে; তাহার উপর সুবৃহৎ সুউচ্চ গোলাকৃতি মেধি, মেধির উপর ঘন্টাকৃতি অণ্ড, অণ্ডের উপর চতুষ্কোণ হেমিকা এবং হমিকার উপর ক্রমহ্রস্বায়মান ছত্রাবলী। পাগানের স্তূপের বিভিন্ন অঙ্গের রূপ ও বিন্যাস রচনা ও নির্মােণরীতিতে একই যুক্তি অনুসরণ করিয়াছে, অথচ পাগান স্তূপ শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে, কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করে শুধু তাহার বৃহদায়তন দিয়া, কল্পনার বিরাটত্ব দিয়া। তুলনায় বাঙলা-বিহারের সমসাময়িক স্তূপ-স্থাপত্যকে যেন খেলনার বস্তু বলিয়া মনে হয়, শুধু যেন নিয়মরক্ষা! তাহার কারণ সহজবোধ্য। মহাযান-বজযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে স্তূপের সম্বন্ধ স্বল্পই; তাহা ছাড়া, নিবেদন-স্তূপ তো যথার্থত স্তূপই নয়, স্তূপের মৌলিক উদ্দেশ্যও বহন করে না।
