যাহাই হউক, প্রাচীন বাঙলার স্থাপত্যের সুসংবদ্ধ ইতিহাস রচনা করিবার মতো উপাদান স্বল্পই। ধ্বংসস্তূপে পরিণত বা অর্ধভগ্ন যে দুই চারিটি বিহার-মন্দির ইতস্তত বিক্ষিপ্ত তাহারই ভগ্নাংশগুলি আহরণ করিয়া এবং মৃৎ ও প্রস্তরফলকে উৎকীর্ণ ও পাণ্ডুলিপি-পৃষ্ঠায় চিত্রিত মন্দিরাদির আকৃতি-প্রকৃতির সাক্ষ্য একত্র করিয়া একটি সমগ্র রূপ গড়িয়া তুলিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে। তাহা ছাড়া, প্রত্নসাক্ষ্য যাহা কিছু আছে তাহা একান্তই বিহার-দেউল ইত্যাদি সম্বন্ধে; স্থাপত্যের অন্যান্য দিক সম্বন্ধে বলিবার মতো উপাদান একেবারে নাই বলিলেই চলে। প্রাচীন বাঙলার ধর্মগত বাস্তু মোটামুটি তিন শ্রেণীর; স্তূপ, বিহার ও মন্দির। স্তূপ ও বিহার সাধারণভাবে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সঙ্গে জড়িত, বিশেষভাবে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে। প্রাচীন বাঙলায় জৈন-স্তূপের একটি মাত্ৰ সংশয়িত উল্লেখ জানা যায় এবং জৈন-বিহারের একটি মাত্র নিঃসংশয় উল্লেখ। এই বিহারটি ছিল উত্তরবঙ্গের পাহাড়পুরে; স্তূপটিও বোধ হয় উত্তরবঙ্গেই; আর সমস্ত স্তূপ এবং বিহারই বৌদ্ধধর্মের আশ্রয়ে রচিত।
স্তূপ
ধৰ্মগত স্থাপত্যের কথা বলিতে গেলে স্তূপের কথাই বলিতে হয় সর্বাগ্রে। স্তূপ প্রাক-বৌদ্ধ যুগের; বৈদিক আমলেও দেহাস্থি প্রোথিত করিবার জন্য শ্মশানের উপর মাটির স্তূপ তৈরি হইত। কিন্তু এই স্থাপত্যরূপকে বিশেষভাবে গ্রহণ করেন বৌদ্ধরাই। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে স্তূপ তিন প্রকারের ১৭ শারীর ধাতু স্তূপ- এই শ্রেণীর স্তূপে বুদ্ধদেবের এবং তাহার অনুচর ও শিষ্যবর্গের শবীরাবশেষ রক্ষিত ও পূজিত হইত; ২: পরিভোগিক ধাতু স্তূপ— এই শ্রেণীর স্তূপে বুদ্ধদেব কর্তৃক ব্যবহৃত দ্রব্যাদি রক্ষিত ও পূজিত হইত; ৩. নির্দেশিক বা উদ্দেশিক স্তূপ— বুদ্ধদেব ও বৌদ্ধধর্মের জীবনেতিহাসের সঙ্গে জড়িত কোনও স্থান বা ঘটনাকে উদ্দেশ্য করিয়া বা তাহাকে নির্দেশ বা চিহ্নিত করিবার জন্য এই শ্রেণীর স্তূপ নির্মিত হইত। পরবর্তী কালে স্তূপ মাত্রই বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের প্রতীক হইয়া দাঁড়ায় এবং সেই ভাবেই সমগ্র বৌদ্ধসমাজের পূজা লাভ করে। তাহা ছাড়া, বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলিতে পূজা দিতে আসিয়া নৈবেদ্য বা নিবেদনরূপে ছোট বড় স্তূপ নির্মাণ করিয়া ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও একটা সাধারণ রীতি হইয়া দাঁড়ায়। এই স্তূপগুলিকে বলা হইত নিবেদন-স্তূপ।
কিন্তু যে-শ্রেণীর স্তূপই হোক বা যে উদ্দেশ্যেই তাহা রচিত হউক না কেন, আকৃতি-প্রকৃতি ও গঠনপদ্ধতিতে ইহাদের মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। একেবারে আদিতে স্তূপ বলিতে গোলাকার একটি বেদীর উপর অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি একটি অণ্ড ছাড়া কিছুই বুঝাইত না। অণ্ডটির ঠিক উপরেই থাকিত হমিকা; এই হার্মিকা-বেষ্টনীর মধ্যে একটি ভাণ্ডে রাখা হইত। শারীর বা পরিভোগিক ধাতু; পর্বদিবসে ধাতুসহ এই ভাণ্ডটি নীচে নামাইয়া ভক্ত পূজারীদের দেখান হইত, পুরোভাগে রাখিয়া গণ্যযাত্রা করা হইত। এবং যেহেতু ধাতুগর্ভ এই ভাণ্ডটিই ছিল পূজা ও শ্রদ্ধার বস্তু সেই হেতু ইহাকে রৌদ্রবৃষ্টি হইতে রক্ষা করিবার জন্য, হর্মিকার ঠিক উপরেই থাকিত একটি ছত্রাবরণ। কালক্রমে ছোটই হোক আর বড়ই হোক প্রত্যেকটি অঙ্গকে পৃথক পৃথকভাবে লম্বিত করিয়া সমগ্র স্তূপটিকেই লম্বিত, সুউচ্চ করিয়া গড়িয়া তুলিবার দিকে একটা ঝোক সুস্পষ্ট হইয়া ওঠে এবং তোরণ, বেষ্টনী ও নানা অলংকরণ প্রভৃতি সংযোজিত হইতে আরম্ভ করে। সপ্তম-অষ্টম শতক নাগাদ নিম্ন ও গোলাকৃতি বেদীটি একটি গোল এবং লম্বিত মেধিতে পরিণতি লাভ করে; তাহার উপরকার অণ্ডটিও প্রমাণানুযায়ী ক্রমশ উচ্চ হইতে উচ্চতর হইতে থাকে। উচ্চতা আরও বাড়াইবার জন্য বেদীর নীচে আবার একটি সুউচ্চ চতুষ্কোণ ভিতও কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা দিতে আরম্ভ করে; আর হিমিকার উপর ক্রম-হ্রস্বায়মান ছাত্রের সংখ্যা একটি দুইটি করিয়া বাড়িতে বাড়িতে সূচ্যগ্র সমগ্রতায় একটি সূচ্যগ্ৰ শিখরের আকৃতি লাভ করে। তাহার ফলে স্তূপের প্রাথমিক, অর্থাৎ নিম্নবেদীর উপর অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি অণ্ডের যে স্থাপত্য-বৈশিষ্ট্য ছিল তাহা একেবারে অন্তহিঁত হইয়া গেল; অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে সমান মূলা পাইয়া অণ্ডের প্রাধান্য নষ্ট হইয়া গেল এবং স্তূপ আর যথার্থত স্তূপ থাকিল না, বিভিন্ন অঙ্গ মিলিয়া লম্বিত এবং কৌণিক একটি শিখরের আকৃতি ধারণ করিল। বাঙলাদেশে যে কয়েকটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে আমরা পরিচিত ইহাদের সমস্তই স্তূপ-স্থাপত্যের বিবর্তনের এই স্তরের, অর্থাৎ একেবারে শেষ স্তরের এবং ইহাদের প্রত্যেকটিই নিবেদন-স্তূপ। যুয়ান-চোয়াঙ অবশ্য বলিতেছেন, বাঙলাদেশের সর্বত্র তিনি নৃপতি অশোকের পোষকতায় বুদ্ধদেবের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত অনেকগুলি স্তূপ দেখিয়াছিলেন, কিন্তু এ-তথ্য খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে খুব সম্ভব বৌদ্ধধর্ম প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নানা সময়ে উদ্দেশিক-স্তূপ বাঙলায় নানা স্থানে নির্মিত হইয়াছিল নানা জনের পোষকতায়; য়ুয়ান-চোয়াঙ হয়তো এই সব স্তূপই কিছু কিছু দেখিয়াছিলেন, কিন্তু আজ আর ইহাদের কিছুই অবশিষ্ট নাই।
সংখ্যায় বা আকৃতি-প্রকৃতির বৈচিত্র্যে সমসাময়িক বিহার-প্রান্তের অসংখ্য নিবেদন-স্তূপগুলির সঙ্গে বাঙলার স্বল্প সংখ্যক নিবেদন-স্তূপের কোনও তুলনাই হয় না। ব্রোঞ্জ-ধাতুতে ঢালাই করা কিংবা পাথর কুঁদিয়া গড়া কয়েকটি স্বল্পায়তন নিবেদন-স্তূপ বাঙলার নানাস্থানে পাওয়া গিয়াছে; এ-গুলিকে ঠিক স্থাপত্য-নিদর্শন বলা চলে না, তবু সমসাময়িক বাঙলার স্তূপ-স্থাপত্যের আকৃতি-প্রকৃতি বুঝিতে হইলে ইহাদের আলোচনা করিতেই হয়। কয়েকটি ইটের তৈরি অপেক্ষাকৃত বৃহদায়তন স্তূপের ধ্বংসাবশেষও বাঙলায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখিতে পাওয়া যায়; আকৃতি-প্রকৃতির দিক হইতে বিহারের সমসাময়িক স্তূপ-স্থাপত্যের সঙ্গে ইহাদের বিশেষ কোনও পার্থক্য কিছু নাই।
