আদর্শের সাদৃশ্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট! তবে, পার্থক্যও সমান প্রত্যক্ষ। পশ্চিম-ভারতীয় অঙ্কনরীতিতে রেখা অত্যন্ত বেশি তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল, কোণগুলি প্রায় জ্যামিতিক চিত্রের মতো সূক্ষ্ম, ভগ্ন অথবা ভঙ্গুর রেখা একান্ত প্রাণহীন , আবেগহীন। প্রাচ্য-ভারতীয় পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলির কিংবা তাম্রপট্রোৎকীর্ণ রেখাচিত্রগুলির লালিতাময়, আবেগময় রেখার সংবেদনী ক্ষমতা পশ্চিমী রেখার নাই। পশ্চিমী রেখা কঠিন ও সমতল চিত্ৰভূমিকে তাহার নির্দিষ্ট বন্ধনীর মধ্যে শুধু আবদ্ধ করিয়া রাখে মাত্র; প্রাচ্য-ভারতের আবেগর্মিয় সংবেদনী রেখা বন্ধনীবদ্ধ চিত্ৰভূমির মণ্ডণায়িত রূপটিকে প্রকাশ করে। রেখা-বিন্যাসের এই ঐতিহ্য শুধু যে নেপালে ও ব্রহ্মদেশে বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল তাঁহাই নয়, মধ্যযুগের শেষপাদেও এই ঐতিহ্য বাঙলা-আসাম-ওড়িশায় বাঘ-অজস্তার বিশুদ্ধ আদর্শের পাশাপাশি নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছিল। আধুনিক কালে কলিকাতার কালীঘাটের পটে অজস্তার রেখা-রচনার রীতি ও আদর্শ উজ্জবীবিত ছিল। বিংশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত; আর মধ্যযুগীয় আদর্শ বলবত্তর ছিল ফরিদপুর-যশোহর-মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-বীরভূমের জড়ানো পটে। এ-ক্ষেত্রেও বাঙলার চিত্রকলা কোনও বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র সত্তা নয়, বরং সমসাময়িক সর্বভারতীয় চিত্ররীতি ও আদর্শের স্থানীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি অধ্যায় মাত্ৰ।
০৬. স্থাপত্য শিল্প
স্থাপত্য শিল্প
প্রাচীন বাঙলার কুটীর, প্রাসাদ, বিহার, মন্দির প্রভৃতি সম্বন্ধে উপাদানের অভাবে সবিস্তারে কিছু বলিবার উপায় নাই। অথচ, অন্তত পঞ্চম শতক হইতে আরম্ভ করিয়া লিপিমালায় ও সমসাময়িক সাহিত্যে নানাপ্রকারের সমৃদ্ধ ঘরবাড়ি, রাজপ্রাসাদ, স্তূপ, বিহার, মন্দির প্রভৃতির উল্লেখ ও স্বল্পবিস্তর বিবরণ সুপ্রচুর। পঞ্চম শতকে ফা-হিয়েন এবং সপ্তম শতকে য়ুয়ান-চোয়াঙ বাঙলার সর্বত্র অসংখ্য, স্তূপ-বিহার ও দেবমন্দির প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। লিপিমালায় ভূ-ভূষণ, পর্বতশৃঙ্গস্পধী, স্বৰ্ণকলসশীর্ষ, মেঘবত্মবিরোধী নানা মন্দিরের উল্লেখ বিদ্যমান। সমসাময়িক পাণ্ডুলিপি-চিত্রে রঙে ও রেখায় নানা স্তূপ ও মন্দিরের প্রতিচিত্র রূপায়িত। সমসাময়িক তক্ষণ-ফলকেও নানা আকৃতি-প্রকৃতির গৃহ, স্তূপ ও মন্দিরের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ। অথচ আজ আর এই সব ঘরবাড়ি, বিহার-মন্দিরের কিছুই অবশিষ্ট নাই, মাটির ধুলায় প্রায় সবই গিয়াছে মিশিয়া, অথবা তাহাদের ধ্বংসাবশেষ বনে জঙ্গলে ঢাকা পুড়িয়া ক্ষুদ্র বৃহৎ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়া গিয়াছে। মাত্র দুই চারিটি একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় মন্দির সকল বাধা-বিরোধ-উপেক্ষা তুচ্ছ করিয়া এখনও দাঁড়াইয়া আছে; দুই চারিটির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার ও সংস্কার করা হইয়াছে প্রত্নবিলাসী মনের আনন্দ-বিধান বা ঐতিহাসিকের কৌতুহল চরিতার্থ করিবার জন্য।
ধ্বংসের কারণ সহজবোধ্য। কাঠ, বাঁশ বা ইট, যাহাই হোক, এই উষ্ণ জলীয় বৃষ্টিপাত পলিমাটির দেশে কিছুই কালের সঙ্গে সংগ্রামে বেশিদিন টিকিয়া থাকিতে পারে না বাঙলাদেশ পাথরের দেশ নয়; অধিকাংশ বিহার-মন্দির ইত্যাদি এবং কিছু কিছু সমৃদ্ধ প্রাসাদে ইটে নির্মিত হইতে; কিন্তু ইটও কালজয়ী হইয়া আমাদের কালে আসিমা পীে ছিতে পারে নাই। তাহার উপর আবার মানুষের লোভ ও লুন্ঠনম্পূহা প্রকৃতির সঙ্গে হাত মিলাইয়া ধ্বংসলীলায় মাতিয়াছে। পরধর্মদ্বেষী বিধমীরাও অনেক বিহার-মন্দির লুণ্ঠন ও ধ্বংস করিয়াছেন। প্রাচীনতম হিন্দু ও বৌদ্ধ-মন্দির ধ্বংস করিয়া তাহার কিছু কিছু অংশ পরবতী কালের মসজিদ, চাবুতরা, দরবার-গৃহ প্রভৃতিতে ব্যবহৃত হইয়াছে, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নাই। গৌড়-পাণ্ডুয়া, ত্ৰিবেণী প্রভৃতি স্থানের মধ্যযুগীয় প্রত্নাবশেষ একটু মনোযোগে বিশ্লেষণ করিলেই তাহা ধরা পড়িয়া যায়।
সাধারণ স্বল্পবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এমন কি সমৃদ্ধ লোকেরাও নিজেদের বসবাসের জন্য যে সব ঘরবাড়ি প্রাসাদ ইত্যাদি রচনা করিতেন তাহারও উপাদান ছিল খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি; পার্থক্য যাহা ছিল তাহা শুধু আয়তন ও অলংকরণের সমৃদ্ধি ও জটিলতার। উচ্চবিত্ত লোকদের ইট ব্যবহারের সামর্থ্য ছিল না, এমন নয়; ইটের তৈরি ছোটবড় ঘরবাড়ি নিশ্চয়ই কিছু কিছু ছিল। কিন্তু সাধারণভাবে যুক্তিটা ছিল এই যে, পঞ্চভূতে রচিত এই নশ্বর ক্ষণস্থায়ী মানবদেহের আশ্রয়ের জন্য সুচিরকালস্থায়ী গৃহের কি-ই-বা প্রয়োজন। সে-প্রয়োজন যদি কাহারও থাকে তাহা দেবতার, কারণ দেবদেহের তো বিনাশ নাই এবং সুচিরস্থায়ী আবাসের প্রয়োজন তো তাঁহারই। যাহাই হউক, মানুষের বসবাসের জন্য তৈরি গৃহের আকৃতি-প্রকৃতি কিরূপ ছিল তাহা নিশ্চয় করিয়া বলিবার মতো খুব উপাদান আমাদের নাই; তবে কিছু কিছু উৎকীর্ণ মৃৎ ও প্রস্তর-ফলকের সাক্ষ্যে কতকটা আভাস ধরিতে পারা কঠিন নয়। সাম্প্রতিক বাঙলাদেশের পল্লীগ্রামে আজও বাঁশ বা কাঠের খুঁটির উপর চতুষ্কোণ নকশার ভিত্তিতে মাটির দেয়াল বা বাঁশের চাচারীর বেড়ায় ঘেরা যে ধরনের ধনুকাকৃতি দোচালা, চৌচালা, আটচালা ঘর দেখিতে পাওয়া যায়, সেই ধরনের বাঙলা-ঘর রচনাই ছিল প্রাচীন রীতি। এই আকৃতি-প্রকৃতিই ভারতীয় স্থাপত্যের ইতিহাসে গৌড়ীয় বা বাঙলা রীতি নামে খ্যাত এবং তাঁহাই পরবর্তী কালে মধ্যযুগীয় ভারতীয় স্থাপত্যে বাঙলার দান বলিয়া গৃহীত ও স্বীকৃত হইয়াছিল। এই গঠন ও আকৃতিই উনবিংশ-শতকে ‘বাংলো-বাড়ি’ নামে ইঙ্গ-ভারতীয় সমাজে পরিচিতি লাভ করে। এই ধরনের গৌড়ীয় রীতির আবাস-গৃহই গরীবের কুটীর হইতে আরম্ভ করিয়া ধনীর প্রাসাদ পর্যন্ত সমাজের সকল স্তরে বিস্তৃত ছিল; পার্থক্য যাহা ছিল তাহা শুধু সমৃদ্ধি ও অলংকরণের। দ্বিতল-ত্রিতল গৃহও এই রীতিতেই নির্মিত হইত; উপরের চাল বিন্যস্ত হইত। ক্রমহ্রস্বায়মান ধনুকাকৃতি রেখায়। কোনও কোনও মন্দিরও ঠিক এই গৌড়ীয় রীতিতেই নির্মিত হইত; বস্তুত, একাধিক প্রস্তর ফলকে এই ধরনের মন্দির উৎকীর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়।
