এ তথ্য সুস্পষ্ট যে, প্রাচ্য-ভারতীয় এই চিত্ৰকলা বহিরঙ্গ এবং অন্তর্নিহিত সত্তার দিক হইতে সমসাময়িক প্রতিমা-শিল্পের চিত্রিত প্ৰতিলিপি মাত্র। প্রস্তর ও ব্রোঞ্জ-প্রতিমায় যেমন, এই যুগের আলোচ্য চিত্রগুলিতেও তেমনই নির্দিষ্ট বঙ্কিম রেখার নিয়ন্ত্রণে মূর্তি মণ্ডনায়িত; রেখার প্রবহমান তরঙ্গ দেহ-কাঠামো, নাভিবৃত্ত এবং করাঙ্গুলিতে সুস্পষ্ট। পাথরে এবং ধাতুতে যে তরঙ্গ সৃষ্টি করা হইয়াছে সুদৃঢ় বস্তু-পদার্থের নমনীয় রূপাস্তরের সাহায্যে, চিত্রে তাহাই সম্ভব হইয়াছে রঙের মণ্ডণের সাহায্যে। চিত্রের প্রতিমাগুলির মুখাবয়ব ও ভঙ্গি, দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সংস্থান ও ভঙ্গি প্রভৃতি একটু যত্নের সঙ্গে বিশ্লেষণ করিলে সহজেই সমসাময়িক প্রস্তর-প্রতিমাশিল্পের সহিত এই চিত্রশিল্পের পারিবারিক সাদৃশ্য ধরা পড়িয়া যায়।
মূলগত আদর্শের দিক হইতে এই চিত্রশিল্প বাঘ-অজস্তা-এলোরা গুহার প্রাচীর চিন্ত্ৰৈতিহ্যের সঙ্গে নিবিড় সম্বন্ধে আবদ্ধ এবং এই ঐতিহ্যের আশ্রযেই রচিত। .এই শিল্পােদশের দুইটি দিক; একটি ক্ল্যাসিক্যাল, অপরটি মধ্যযুগীয়। এই নামকরণ দু’টির অর্থ আজ পরিষ্কার এবং সৰ্ব্বজনগ্রাহ্য। ক্লাসিক আদর্শের প্রধান বৈশিষ্ট্য রং ও রেখায় পরিপূর্ণ মণ্ডনায়িত ডোলে সমৃদ্ধ রূপায়ণ; মধ্যযুগীয় আদর্শের প্রধান নির্ভর তীক্ষ্ণ, ডৌলবিহীন রেখা এবং তরল সমতল রঙের প্রলেপ। এলোরার এই দুই আদর্শই পাশাপাশি সক্রিয়; একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় প্রাচ্য-ভারতীয় চিত্রশিল্পেও তাঁহাই। তাহার ফলে আদর্শ ওঁ রীতির একটা সংমিশ্রণও ঘটিয়াছে। এই সংমিশ্রণের ফলে ক্লাসিক আদর্শের দৈহিক কাঠামোর গভীর, সমাহিত ও ব্যঞ্জনাপূর্ণ রেখার বিবর্তন ঘটে এবং অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গায়িত প্রবাহে বহুরেখার সামঞ্জস্যে যে-সব ভঙ্গি মূর্ত হইত সে-সব ভঙ্গি দৃঢ়, তীক্ষ্ণ ও কঠিন ভঙ্গিতে রূপান্তর লাভ করে।
মধ্যযুগীয় রীতি ও আদর্শ
এলোরার চিত্রে এবং সমসাময়িক রাজপুতানার ভাস্কর্যে রেখানির্ভর পরিকল্পনার প্রথম সূত্রপাত এবং এই সংমিশ্রণের প্রকাশ দেখা গেল। অষ্টম শতকে। কিন্তু মধ্যযুগীয় আদর্শের সর্বাপেক্ষা ব্যাপক প্রকাশ ধরা পড়ে পশ্চিম-ভারতে, বিশেষ ভাবে গুজরাট অঞ্চলে, দশম একাদশ-দ্বাদশ শতক হইতেই। তবে, মধ্যযুগীয় শিল্পাদর্শের এই গতি একান্ত ভাবে পশ্চিম-ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাঙলাদেশে সুন্দরবনে ও চট্টগ্রামে দুই তিনটি তাম্রপট্টে উৎকীর্ণ রেখাচিত্র পাওয়া গিয়াছে। এই চিত্রগুলি একান্ত তীক্ষ্ণ, ভোলবিহীন রেখানির্ভর এবং রেখার সঙ্গে রেখার যোজনা তীক্ষ্ম কৌণিক। ইহাদের রেখার চরিত্র এবং বিন্যাসের সঙ্গে এলোরার কোনও কোনও চিত্রের এবং গুজরাটী জৈন পুঁথিচিত্রের আত্মীয়তা ঘনিষ্ঠ। একাদশ-দ্বাদশ শতকের ভাস্কর্যেও কোথাও কোথাও এই ধরনের রেখার বিন্যাস দৃষ্টিগোচর, যেমন ওড়িশায় ও মধ্যভারতে, রাজপুতানা! ও গুজরাটে। এই নূতনতর শিল্পীরীতি ও আদর্শের প্রাচীনতর ইতিহাস যাহাঁই হউক এবং যেখানেই ইহার প্রাথমিক উদ্ভব দেখা দিক না কেন একাদশ-দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতকেই ইহা একটি সর্বভারতীয় রীতি ও আদর্শ বলিয়া স্বীকৃত ও অভ্যস্ত হইয়াছিল। সমসাময়িক বাঙলার প্রস্তর ও ধাতব-ভাস্কর-শিল্পে এই নূতন রীতি ও আদর্শের স্পর্শ কিছু লাগে নাই, কিন্তু সমসাময়িক চিত্রকলার পক্ষে ইহার প্রভাব কাটাইয়া চলা সম্ভব হয় নাই। এই প্রভাব যে শুধু সদ্যোক্ত তাম্রপট্টের রেখাচিত্রগুলিতেই তাহা নয়, পূর্বালোচিত কোনও কোনও পুঁথিচিত্রেও সুস্পষ্ট, বিশেষ ভাবে যে পাণ্ডুলিপিগুলির চিত্রণ ও রচনা নেপালে। পূর্ব-ভারত হইতে এই প্রভাব নেপালে এবং ব্ৰহ্মদেশেও বিস্তার লাভ করে।
এই মধ্যযুগচিহ্নিত রেখানির্ভর চিত্র-পরিকল্পনা যে-তিনটি তাম্রপট্রোৎকীর্ণ রেখাচিত্রে পূৰ্ণ-পরিণতরূপে দৃষ্টিগোচর, তাহার একটির কথা উল্লেখ করিয়াছেন আচার্য কুমারস্বামী তাহার Portfolio of Indian Art-গ্রন্থে; ইহার প্রতিচিত্রও তিনি প্রকাশ করিয়াছেন। ইহার তারিখ আনুমানিক একাদশ শতক। দ্বিতীয়টি রাজা ভোম্মানপালের সুন্দরবন-পট্টোলীর পশ্চাদপটে উৎকীর্ণ। তৃতীয়টি চট্টগ্রাম-জেলার মোহার-গ্রামে প্রাপ্ত দেববংশীয় জনৈক রাজার পট্টোলীর উপরিভাগে উৎকীর্ণ। শেষোক্ত দুইটিরই তারিখ দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতক এবং দুইটিই অধুনা আশুতোষ-চিত্রশালায় রক্ষিত। উভয় চিত্রেই তীক্ষ রেখার দ্রুত রূপায়ণ, এবং সে-রূপায়ণে সজীব প্রবহমানতা অব্যাহত; অবিচ্ছিন্ন গতিও অক্ষুঃ। তবে, বেশ বুঝা যায়, যেখানেই সামান্য সুযোগও পাইয়াছেন শিল্পী। সেইখনেই চঞ্চল বঙ্কিম রেখাপ্রবাহ সৃষ্টি করিয়া পরিতৃপ্তি লাভ করিয়াছেন। তাহা ছাড়া, অকিঞ্চিৎকর বিষয়বস্তুতেওঁ এমন একটা অহেতুক প্রাণময়তা ও রেখাপ্রাচুর্য পরিস্ফুট বিষয়বস্তুর সঙ্গে যাহার কোনও সঙ্গতি দেখা যায় না। বস্তুত, এই রেখা-পরিকল্পনা কোনও গভীর উপলব্ধি বা প্রেরণা হইতে উদ্ভূত বলিয়াই মনে হয় না। সম্ভবত, এই অস্বাভাবিক ও সঙ্গতিবিহীন প্রাচুর্য ও প্রাণময়তার ফলেই পার্শ্ব হইতে খচিত অর্ধাকৃতি অথবা ত্রি-চতুর্থাংশ চিত্রিত মুখমণ্ডলের রেখা চধুবৎ সুতীক্ষ্ণ নাসিকায় অথবা কৌণিক চিবুকে, তীক্ষ ধনুকাকৃতি ভ্ৰ, অথবা দীর্ঘািয়ত বঙ্কিম উর্ধের্বাষ্ঠে পরিণতি লাভ করিয়াছে। মনে হয়, শিল্পী যেন তীক্ষ দ্রুত রেখার বিলাসে প্রায় আত্মবিস্মৃত হইয়া গিয়াছেন, কারণ রঙের মণ্ডণায়িত রূপায়ণ যেখানে নাই। সেখানে শিল্পীর হাতে রেখাই বিষয়বস্তুর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের একমাত্র অবলম্বন। চঞ্চল ও দীর্ঘািয়ত বঙ্কিম রেখা সৃষ্টির প্রচেষ্টার মধ্যে এই কামনা প্রত্যক্ষ। এমন কি প্রতিমার সম্মুখভঙ্গি চিত্রণের সময়ও মুখমণ্ডলকে সম্পূর্ণ রেখানির্ভর করিয়াই আঁকা হইয়াছে এবং শিল্পী যেখানেই তীক্ষ ভাব সঞ্চারের অবকাশ পাইয়াছেন সেখানেই রেখাগুলিতে ভীষণ চাঞ্চল্য ও পুনরাবৃত্তি দেখা দিয়াছে। মেহারে প্রাপ্ত রেখাচিত্রটিতে অবশ্য অধিকতর শক্তির বিকাশ; তাহার প্রধান কারণ, এই চিত্রটির রেখা-রূপায়ণ খানিকটা মণ্ডণায়িত। কিন্তু এ-ক্ষেত্রেও মধ্যযুগীয় শিল্পীরীতি ও আদর্শের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
