চিত্র-বিন্যাসের রীতি অনেকটা ভাস্কর্য-বিন্যাসের রীতিই অনুসরণ করিয়াছে। মূল প্রতিমাটি পার্শ্বপ্রতিমাগুলির চেয়ে আকারে বড় এবং সাধারণত অলংকৃত পটভূমি বা দীর্ঘািয়ত বা অর্ধগোলাকৃতি প্রভামণ্ডলের পটে দণ্ডায়মান বা উপবিষ্ট, অথবা মন্দিরের অলিন্দে স্থাপিত। মূল প্রতিমার দেহকাণ্ডের দুই পাশে এক বা দুই সারিতে, সরলরেখায় বা চক্রাকারে মণ্ডলের অন্যান্য দেবদেবীরা বিন্যস্ত। যে-সব ক্ষেত্রে মূল প্রতিমা কাঠামোর এক পার্শ্বে সে-সব ক্ষেত্রে পার্শ্ব-দেবতারা সারি সারিতে বা অর্ধচক্রাকারে অন্য পার্শ্বে বিন্যস্ত। শূন্যস্থান বড় একটা নাই; যে-সব স্থানে আছে সেখানে বিচরমান বা উড়াউীয়মান সহচর-সহচরী, লতাপাতা, অলংকার প্রভৃতির সাহায্যে বৈচিত্র্য রূপায়িত।
তারিখ-সম্বলিত পাণ্ডুলিপিগুলির সাহায্যে এই চিত্রগুলির একটা ধারাবাহিক বিচার চলিতে পারে, কিন্তু তাহাতে চিত্রশৈলীর বিবর্তনের কোনও ইতিহাস উদ্ধার করা কঠিন। মোটামুটি ভাবে একাদশ ও দ্বাদশ শতকের এই সৃষ্টি-প্রচেষ্টার মধ্যে শিল্পের যে-রােপ প্রত্যক্ষ তাহা অবিচল ও নির্দিষ্ট। বিবর্তমান কোনও প্রবাহ ইহাদের মধ্যে ধরা প্ৰায় যায় না বলিলেই চলে। ছবিগুলি দেখিলে এবং একটু বিশ্লেষণ করিলে স্পষ্টই বুঝা যায়, এই চিত্ররীতি ও শৈলী একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের বিবর্তিত রূপ এবং বহুদিন সুঅভ্যস্ত। এই সুবিস্তৃত দেশের অন্যত্র, নানাস্থানে যে শিল্পরূপ ও রীতি প্রাচীর-গোত্রে অথবা পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠায় বহুদিন সুঅভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে, যে রূপ ও রীতি বাঘ-অজন্তা-এলোরার গুহাগাত্রে স্বাক্ষর রচনা করিয়াছে তাহাই প্রাচীন বাঙলার এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলিতেও ধরা পড়িয়াছে। ইহারা চলমান ভারতীয় চিত্রশিল্প-প্রবাহেরই একটা অচ্ছেদ্য ধারা এবং সেই ধারারই অন্যতম নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশ। তবে, এ-কথাও সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার্য যে, একাদশ-দ্বাদশ শতকে পৌঁছিয়া সে-ধারা স্তিমিত হইয়া আসিয়াছে, নূতন স্রোত সঞ্চার আর কিছু দেখা যাইতেছে না, নূতনতর সৃষ্টির সম্ভাবনা কমিয়া আসিয়াছে; ঐতিহ্যের বাহক হিসাবেই যেন ইহাদের মূল্য!
চিত্রশৈলী
মহীপালের রাজ্যাঙ্কের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বৎসরে লিখিত ও চিত্রিত পাণ্ডুলিপি দুইটির ছবিগুলি বিশ্লেষণ করিয়া দেখা যাইতে পারে। ষষ্ঠ বৎসরে চিত্রিত ছবিগুলিতে (কলিকাতা-এসিয়াটিক-সোসাইটি, ৪৭১৩ নং পাণ্ডুলিপি) শিল্পীর দৃষ্টি রঙের ঘন মণ্ডনায়িত ডোলের প্রতি যতটা সজাগ ঠিক ততটাই সজাগ তরঙ্গায়িত ও প্রবাহমান রেখার ভীেলের দিকে। বহিরেখায় সুপূর্ণ ভীেলের প্রতি সঙ্গতি রাখিয়া অন্যান্য রেখাগুলিকে সূক্ষ্ম বা গভীর করা হইয়াছে। দেহ এবং মুখাবয়বে যেখানে প্রয়োজন সেখানে সাদা রঙের সাহায্যে উচ্চতম স্তর দেখান হইয়াছে। কিন্তু সাধারণ ভাবে কোথাও কোনও স্বচ্ছ সূক্ষ্ম মণ্ডন বা ভাব-ব্যঞ্জনার কোনও পরিচয় নাই; মুখ ও দেহভঙ্গি লাবণ্যবিহীন, কঠিন; সমস্ত রূপায়ণই একান্তভাবে রেখানির্ভর। এই রাজারই পঞ্চম বৎসরে চিত্রিত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবিগুলিতে রঙের ঘন মণ্ডনায়িত ভৌলের কোনও চেষ্টা প্রায় নাই বলিলেই চলে, থাকিলেও খুব ক্ষীণ; তুলি টানা হইয়াছে কঠিন সমতলে উচ্চবাচ বা নতোন্নত ইঙ্গিীত-রচনার কোনো চেষ্টাই প্রায় করা হয় নাই। প্রতিমার প্রকৃত ভঙ্গি এবং অবস্থান যাহাঁই হউক না কেন, দেহাবয়ব ও মুখমণ্ডল সর্বদাই কঠিন; শুধু রেখা-প্রবাহের সাহায্যে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে মাত্ৰ! কিন্তু এই প্রথাবদ্ধ, সমতল এবং তরল রঙের প্রলেপ মণ্ডনায়িত ডৌলসমৃদ্ধ রেখার বিন্যাসকে বিশেষ স্পর্শ করে নাই। বস্তুত, এই পাণ্ডুলিপির চিত্রগুলির তরল ও সমতল পটভূমিতে মণ্ডনায়িত রেখাপ্রবাহই একমাত্র আকর্ষণীয় বস্তু।
সদ্যোক্ত কেমব্রিজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলি সম্বন্ধে যে-কথা বলা হইল সে-কথা বোস্টন-চিত্রশালার পাণ্ডুলিপি-চিত্র, সোয়ামুরা পাণ্ডুলিপি-চিত্র, ব্ৰেণ্ডেনবুর্গ পাণ্ডুলিপি-চিত্র, অজিত ঘোষ-সংগ্রহের পাণ্ডুলিপি-চিত্র এবং রাজশাহী-চিত্রশালার পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলি সম্বন্ধেও বলা চলে, অবশ্য খুবই সাধারণ ভাবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, ব্ৰেণ্ডেনবুর্গ-পাণ্ডুলিপির অধিকাংশ চিত্র রঙের মণ্ডন অত্যন্ত ক্ষীণ, প্রলেপ অত্যন্ত তরল। কিন্তু রেখাগুলি পূর্ণ মণ্ডনায়িত এবং অপরূপ মাধুর্য ও সংবেদনশীলতায় জীবন্ত; বিন্যাসও নিখুঁত। অথচ, এই পাণ্ডুলিপিতেই এমন কতকগুলি ছবি আছে যেখানে রঙের মণ্ডনায়িত ভৌল প্রত্যক্ষ এবং সঙ্গে সঙ্গে রেখার ডেলাও। সুতরাং দেখা যাইতেছে, একই পাণ্ডুলিপির চিত্রমালায় রঙের মণ্ডনায়িত ডোল এবং ডৌলবিহীন তরল সমতল রঙের প্রলেপ একই সঙ্গে পাশাপাশি বিদ্যমান; উভয় ক্ষেত্রেই তরঙ্গায়িত ও প্রবহমান রেখার সমৃদ্ধ ডৌল উপস্থিত। এই বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট এবং আরো সমৃদ্ধ অভিজ্ঞান দেখা যায় স্বেতোস্লাভ, রোয়েরিক সংগ্রহের গণ্ডবৃহ-পাণ্ডুলিপির অনেকগুলি চিত্রে। কলিকাতা এসিয়াটিক সোসাইটির এ-১৫ নং পাণ্ডুলিপির চিত্রাবলী তুলনায় অনেক বেশি। সমৃদ্ধ এবং উচ্চাঙ্গের। রঙের মণ্ডনায়িত রূপায়ণ রীতি এ-ক্ষেত্রেও উপস্থিত, তবে ক্ষীণ এবং বৈচিত্রবিহীন, কিন্তু যতখানি আছে ততখানি সুবিন্যস্ত এবং মনোরম। রেখার মণ্ডনায়িত গতির প্রবহমানতা পরিপূর্ণ অব্যাহত। ভাব-ব্যঞ্জনায় এবং ভঙ্গির লালিতেও এই চিত্রগুলি সমৃদ্ধ। বস্তুত, প্রবহমান রেখার এই মণ্ডনায়িত গতিই এই ছবিগুলির মেরুদণ্ড। কিন্তু কোনও কোনও পাণ্ডুলিপি-চিত্রে এই রেখাই হইয়া পড়িয়াছে দুর্বল অনিশ্চিত এবং ভঙ্গুর, যেমন, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬৪৩ নং পাণ্ডুলিপিতে, কলিকাতা এসিয়াটিক সোসাইটির ৪২০৩ নং পাণ্ডুলিপিতে। পূর্ব-ভারতীয় শিল্পােদশের এবং রীতির স্বাক্ষর উভয় নিদর্শনেই উপস্থিত, কিন্তু তৎসত্ত্বেও রঙের মণ্ডনায়িত ডৌল এবং রেখার সমৃদ্ধ মণ্ডনায়িত গতি দুইই স্তিমিত ও শিথিল হইয়া পড়িয়াছে; রেখা তো ভঙ্গর এবং নিজীবী বলিলেই চলে। প্রতিমার ভঙ্গি কঠিন, বিন্যাস স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন; বস্তুত, একই চিত্রে একটি প্রতিমা আর একটি প্রতিমার সঙ্গে কোনও আত্মিক যোগসূত্ৰে যেন আবদ্ধ নয়। কলিকতা, এসিয়াটিক সোসাইটির ৯৭৮৯ এ-নং পাণ্ডুলিপির চিত্রগুলি কালক্রমের দিক হইতে বোধ হয় সর্বাপেক্ষা অর্বাচীন। শিল্পশৈলীর দিক হইতে এই চিত্রগুলিকে বাঙলার সমসাময়িক প্রস্তুর-প্রতিমাশিল্পের চিত্ৰিত প্ৰতিলিপি বলা যাইতে পারে। রেখা ও রঙের মণ্ডনায়িত ডৌলই এই চিত্রগুলির বৈশিষ্ট্য এবং সেই হিসাবে পূর্বতন ব্লেণ্ডেনবুর্গ ও এসিয়াটিক সোসাইটির এ-১৫ নং পাণ্ডুলিপির চিত্রগুলির সঙ্গে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ।
