১৮. কলিকাতা রিয়্যাল]-এসিয়াটিক-সোসাইটির গ্রন্থাগারে রক্ষিত শিবপূজা ও শৈবধর্ম সম্বন্ধীয় একাধিক শৈব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি; এই পাণ্ডুলিপির কাঠের পটার ভিতরের দিকে আঁকা দশ-বারোটি ছবি। তারিখ অজ্ঞাত, তবে শৈলীসংক্ষ্যে পাল-পর্বের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
১৯. অক্সফোর্ড বড়লেয়ান গ্রন্থাগারে রক্ষিত একটি পাণ্ডুলিপি এই পাণ্ডুলিপিগুলি ছাড়া আরও দুই চারিখানা চিত্রিত পাণ্ডুলিপি ইতস্তত জ্ঞাত থাকা বিচিত্র নয়। তাহা ছাড়া, মাঝে মাঝে নূতন নূতন চিত্রিত পাণ্ডুলিপির খবরও পাওয়া যায়।।
এ-তথ্য পরিষ্কার যে, একটি মাত্ৰ পাণ্ডুলিপি ছাড়া উপরোও প্রত্যেকটি পাণ্ডুলিপি বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধীয় এবং প্রায় সকল চিত্ৰই মহাযান-বজযান-তন্ত্রযান ধর্মমতসম্মত দিবদেবীর প্রতিকৃতি। একটি মাত্র পাণ্ডুলিপি শৈবধর্ম সম্পর্কিত এবং উহার চিত্রগুলি লিঙ্গ ও ব্রাহ্মণ্যদেবদেবীর প্রতিরূপ। এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলি ছাড়া তাম্রপট্টে উৎকীর্ণ স্বল্পায়তন রেখাচিত্রের খবরও আমরা জানি; এই রেখাচিত্র তিনটিও একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় চিত্রশিল্পের নিদর্শন হিসাবে গণ্য করা যাইতে পারে। ইহাদের বিষয়বস্তু ব্ৰাহ্মণ্য দেবদেবী।
কয়েকটি সাধারণ মন্তব্য
বলিয়াছি, প্রায় সকল চিত্ৰই মহাযান-বজ্ৰযান-তন্ত্রযান ধৰ্মসম্মত দেবদেবীর প্রতিকৃতি। কায়সাধনের নির্দিষ্ট ধ্যানানুযায়ী বিশেয বিশেষ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দেবদেবী, যথা, লোকনাথ, তারা, মহাকাল, অমিতাভ, অবলোকিত, মৈত্ৰেয়, বজ্ৰপাণি, আকাশগর্ভ প্রভৃতি ও তাঁহাদের সহচর-সহচরীদের প্রতিমাই পাণ্ডুলিপি-পত্রের সীমার মধ্যে রঙে ও রেখায় রূপায়িত। এই চিত্রগুলির সাহায্যে বোজযান-তন্ত্রযান সাধনে বণিতেঁ দেবদেবীদের অনেকের পরিচয় সহজতর হয়; বিশেষত ইহাদের মধ্যে অনেকে আছেন সমসাময়িক ভাস্কর্যে র্যাহাঁদের পরিচয় পাওয়া যায় না। কয়েকটি ছবিতে দেখিতেছি, জাতকের কাহিনী বা বুদ্ধদেবের জীবনকাহিনীও চিত্ররূপ লাভ করিয়াছে। বলা বাহুল্য, সমসাময়িক অভিজাত নায়ক, ধর্মযাজক এবং বিত্তশালী শ্রেণীর লোকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই এই সব পাণ্ডুলিপি অনুলিখিত ও চিত্রগুলি রূপায়িত হইত। সুতরাং সুমকি ভাস্কর্য ও স্থাপত্যকলার যাহা সামাজিক প্রেরণা ও পরিবেশ, চিত্রকলার ক্ষেত্রেও তাহাই।
বর্তমানে বাঙলা ভাষাভাষী লোকদের যে ভৌগোলিক সীমা, সব পাণ্ডুলিপিই যে সেই সীমার মধ্যেই লিখিত ও চিত্রিত হইয়াছিল, এ-কথা জোর করিয়া বলা যায় না। কয়েকটি পাণ্ডুলিপি বিহারে এবং কয়েকটি আবিষ্কৃত হইয়াছে নেপালে; হয়তো লেখা ও আঁকার কাজটাও সেখানেই হইয়া থাকিবে; কিন্তু শৈলী-প্রমাণের দিক হইতে স্বীকার করিতেই হয়, ভৌগোলিক সীমাগত এই পার্থক্য চিত্রশৈলীতে কোনও পার্থক্য রচনা করে নাই। বস্তুত, বাঙলা-বিহার-নেপালের সমসাময়িক চিত্রশিল্প একই শিল্পধারার সৃষ্টি বলিলে অনৈতিহাসিক কিছু বলা হয় না। কয়েকটি পাণ্ডুলিপি তো নিঃসংশয়ে বাঙলাদেশেই লিখিত ও চিত্রিত হইয়াছিল, (যেমন, হরিবর্মার উনবিংশ রাজ্যাঙ্কের পাণ্ডুলিপিটি); ইহাদের চিত্রগুলির সঙ্গে বিহার বা নেপাল বা পূর্ব-ভারতে অন্যত্র আবিষ্কৃত পাণ্ডুলিপি-চিত্রের মূলগত পার্থক্য কোথাও কিছু নাই। এই চিত্রশিল্প একান্তই প্রাচ্য-ভারতীয় চিত্ৰশিল্পধারার সৃষ্টি এবং সে—ধারার কেন্দ্র ছিল পাল-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বাঙলাদেশ এবং কিয়দংশে বিহার।
বলিয়াছি, এই চিত্রগুলিতে পাণ্ডুলিপি-চিত্রণের বিশেষ স্বতন্ত্র কোনও ভঙ্গির পরিচয় নাই। চীন, ইরাণ, মধ্যযুগীয় যুরোপ বা মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে স্বল্পায়তন পুঁথিচিত্রের যে বিশেষ বিশেধ ভঙ্গির সঙ্গে আমাদের পরিচয়, তাহার সঙ্গে এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলির কোথাও কোনও মিল নাই। বস্তুত, এই চিত্রগুলি ক্ষুদ্রাকৃতি প্রাচীর-চিত্র; প্রাচীর চিত্রকেই যেন ধরা হইয়াছে পুঁথিচিত্রের সীমার মধ্যে। আর একটি তথ্যও একটু লক্ষণীয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তুর সঙ্গে চিত্রগুলির বিষয়বস্তুর বিশেষ কোনও যোগ নাই; চিত্রগুলির সাধারণত কোনও কোনও মন্দিরের অথবা দেবদেবীর অথবা উভয়েই প্রতিরূপ মাত্র। ইহাদের উদ্দেশ্য পুঁথির শোভাবর্ধন করা, বিষয়বস্তুকে উজ্জ্বল করা নয়।
ছবিগুলিতে যে-সব রং ব্যবহার করা হইয়াছে তাহার মধ্যে হরিতালের হলুদ, খড়িমাটির সাদা, গাঢ় নীল (অজস্তার পাথুরে নীল নয়), প্রদীপের শীষের কালো, সিঁদর লাল এবং সবুজ। এই সবুজ অজন্তা-চিত্রে ব্যবহৃত ঘন উজ্জ্বল সবুজ নয়; বোধ হয় হলুদ এবং নীলে মিশ্রিত সবুজ। প্রয়োজনানুযায়ী একই রঙের গাঢ়তার তারতম্য আছে, ভিন্ন রঙের ব্যবহারও আছে; সর্বোচ্চ স্তরে সাদা, সর্বনিন্সে কালো। কিন্তু যত বৈচিত্ৰ্যই থাকুক, দেবদেবীর রং সর্বত্রই সাধনসূত্রানুযায়ী নিয়মিত ও নির্ধারিত। সাধারণ ভাবে রঙের বিন্যাস অজপ্তা-চিত্রের রীতি ও আদর্শনুযায়ী। অজস্তার মতো এ-ক্ষেত্রেও রঙের ব্যবহারে ডোলের আশ্রয় লওয়া হইয়াছে; বস্তুত, মণ্ডনায়িত ডৌল এই চিত্রগুলির অন্যতম বৈশিষ্টা। তবে, অজস্তার রঙের পরিমিত সঙ্গতির কোনও পরিচয় এই চিত্রগুলিতে নাই! বহিরেখা সর্বদাই কালো অথবা লাল রঙে টানা এবং ভারতীয় চিত্রের সাধারণ রীতি অনুযায়ী সর্বত্রই বহিরেখাটি টানা হইয়াছে আগে সরু তুলিতে এবং পরে দেওয়া হইয়াছে ভিতরকার রঙের প্রলেপ স্থূলতার তুলির সাহায্যে।
