বাঙলার চিত্রকলার প্রাচীনতম যে-সব নিদর্শন এ-পর্যন্ত জানা গিয়াছে তাহা প্রায় সমস্তই একাদশ ও দ্বাদশ শতকের এবং প্রত্যেকটিই পাণ্ডুলিপি-চিত্র, অর্থাৎ তালপাতায় বা কাগজে হাতের লেখা পুঁথি অলংকরণোদ্দেশ্যে আঁকা ছবি। স্বভাবতই ছবিগুলি স্বল্পায়তন, কিন্তু তৎসত্ত্বেও স্বল্পায়তন পাণ্ডুলিপি-চিত্রের যাহা বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ সূক্ষ্ম রেখার ধীর অথচ তীক্ষ্ণগতি, সূক্ষ্ম ও ঘন কারুকার্য, বিন্যাসের ঘনত্ব ও গভীর ভাবনা-কল্পনার অনুপস্থিতি প্রভৃতি এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলিতে নাই। সেই জনাই ইংরাজিতে miniature বলিতে যাহা আমরা বুঝি এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলি সেই বস্তু নয়। আয়তন ক্ষুদ্র হওয়া সত্ত্বেও এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলির ভাবনা-কল্পনার আকাশ বিস্তৃত ও গভীর, পরিকল্পনা বৃহৎ রেখার ডৌল ও বিস্তার দীর্ঘািয়ত, রঙের বিন্যাস মণ্ডন প্রশস্তায়িত। এই দীর্ঘ, প্রশস্ত ও বৃহৎ বিস্তার একান্তই বৃহদায়তন প্রাচীর-চিত্রের। রাস্তুত, প্রাচীর-চিত্রে লক্ষণই এই পাণ্ডুলিপি-চিত্রগুলিরও লক্ষণ; প্রাচীর-চিত্রই যেন পাণ্ডুলিপি-পত্রের সংকীর্ণ সীমার মধ্যে স্বল্পায়তনে অঙ্কিত। সমসাময়িক বাঙলার, এক কথায় পূর্ব-ভারতের পাণ্ডুলিপি-চিত্রের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্মরণ-রাখা প্রয়োজন। ইহারা আকারে ক্ষুদ্র, চরিত্রে বৃহদায়তন; ক্ষুদ্র চিত্রের বৈশিষ্ট্য ইহাদের মধ্যে অনুপস্থিত।
এ-পর্যন্ত চিত্র-সম্বলিত পাণ্ডুলিপি প্রায় কুড়ি-বাইশখন পাওয়া গিয়াছে; ইহাদের মধ্যে মাত্র একখানা কাগজের পাতায় লেখা (আশুতোষ-চিত্রশালা) এবং ছবিও কাগজের পাতায় আঁকা— লেখার মাঝখানে সমান্তরালে; অন্য সব ক’টিই তালপাতার পুঁথি। কাগজের পাতার পুঁথিটি বাঙলাদেশে কাগজ ব্যবহারের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। এই পাণ্ডুলিপিগুলির অধিকাংশই পাওয়া গিয়াছে নেপালে, কয়েকটি বাঙলাদেশে এবং কয়েকটি বাঙলার বাহিরে অন্যত্র (যেমন, কুলু-উপত্যকা-প্রবাসী স্বেতোস্লাভ রোয়েরিক মহাশয়ের সংগ্রহের একটি সুবৃহৎ পাণ্ডুলিপি)। তবে ইহাদের প্রায় প্রত্যেকটিই যে দশম হইতে দ্বাদশ শতকের মধ্যে পূর্ব-ভারতে, বিশেষ ভাবে বাঙলাদেশে লিখিত ও চিত্রিত হইয়াছিল, চিত্ৰশৈলী এবং তারিখ-সম্বলিত কয়েকটি পাণ্ডুলিপিই তাহার প্রমাণ। এ-পর্যন্ত যে ক’টি চিত্র-সম্বলিত পাণ্ডুলিপির খবর আমরা জানি সেগুলি এখানে তালিকাগত করা যাইতে পারে।
চিত্ৰ-সম্বলিত পাণ্ডুলিপির তালিকা
১-২. পালরাজ মহীপালদেবের রাজত্বের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বৎসরে অনুলিখিত ও চিত্রিত অষ্টসাহস্ত্ৰিক প্রজ্ঞাপারমিতার দুইটি পাণ্ডুলিপি (কেমব্রিজ-বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ১৪৬৪ নং এবং কলিকাতা-রয়্যাল-এসিয়াটিক-সোসাইটির ৪৭১৩ নং পাণ্ডুলিপি)।
৩. পালরাজ রামপালের শাসনকালের ৩৯তম বৎসরে অনুলিখিত ও চিত্ৰিত অষ্টসাহিত্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার একটি পাণ্ডুলিপি (এক সময়ে এই পুঁথিটি ব্ৰেণ্ডেনবুর্গ সাহেবের সংগ্রহে ছিল)।
৪-৫. দুইটি অষ্টসাহস্ত্ৰিকা প্রজ্ঞাপারমিতার পাণ্ডুলিপি (রাজশাহী-বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতির সংগ্ৰহ); ইহার একটি পাণ্ডুলিপি লিখিত ও চিত্রিত হইয়াছিল। বৰ্মণরাজ হরিবর্মার রাজত্বের ১৯তম বৎসরে। অন্যটিতে কোনও তারিখ নাই, তবে চিত্ৰশৈলী-সাক্ষ্যে মনে হয় দ্বাদশ শতকের কোনও সময়ে এই পাণ্ডুলিপিটি লিখিত ও চিত্রিত হইয়াছিল।
৬. কলিকাতা [রয়াল]-এসিয়াটিক-সোসাইটি — গ্রন্থাগারের একটি অষ্টসাহস্ত্ৰিকা প্রজ্ঞাপারমিতার পাণ্ডুলিপি (এ-১৫ নং); খ্রীষ্টোত্তর ১০৭১ অব্দে লিখিত ও চিত্ৰিত।
৭-৮. রাজশাহী-বরেন্দ্ৰ – অনুসন্ধান-সমিতির গ্রন্থাগারে রক্ষিত কারণ্ডবৃহ এবং বোধিচর্যবিতারের দুইটি-পাণ্ডুলিপি। একটিতেও তারিখ নাই, তবে শৈলী-সক্ষ্যে মনে হয় দ্বাদশ শতক।
৯. বোস্টন-চিত্রশালার ২০৫৮৯ নং পাণ্ডুলিপি; পালরাজ (তৃতীয়?) গোপালদেবের চতুর্থ রাজ্যাঙ্কে লিখিত ও চিত্ৰিত।
১০. জাপানের সোয়ামুরা পাণ্ডুলিপি। তারিখ নাই, তবে পালশিল্পের এবং সমসাময়িক নাগরী অক্ষরের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
১১. লণ্ডন-ব্রিটিশ-মুজিয়ুমের একটি অষ্টসাহফ্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার পাণ্ডুলিপি পালরাজ (তৃতীয়?) গোপালদেবের পঞ্চদশ রাজ্যাঙ্কে লিখিত ও চিত্রিত (OR 6902)।
১২-১৩. কেমব্রিজ-বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত পঞ্চরক্ষার একটি পাণ্ডুলিপি; এই পাণ্ডুলিপিটি পাল-রাজ নরপালের চতুর্দশ রাজ্যাঙ্কে লিখিত ও চিত্রিত। আরও একটি অজ্ঞাতনামা-গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি (Add No. 1643)। লিখন ও চিত্রণের তারিখ ১০১৫ খ্রী।
১৪. কলিকাতা রিয়্যাল]-এসিয়াটিক-সোসাইটি গ্রন্থাগারে রক্ষিত ও অষ্টসাহিত্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতার একটি পাণ্ডুলিপি (৪২০৩ নং) ২ লিখন ও চিত্রণের তারিখ নেপালী সম্বৎ ২৬৮=১১৪৮ খ্রী।।
১৫. কলিকাতা [রয়্যাল]-এসিয়াটিক-সোসাইটি গ্রন্থাগারে রক্ষিত ৯৭৮৯ নং পাণ্ডুলিপি; পাল-রাজ গোবিন্দপালের অষ্টাদশ রাজ্যাঙ্কে লিখিত ও চিত্ৰিত।
১৬. কলিকাতা অজিত ঘোষ-সংগ্রহের একটি পাণ্ডুলিপি; নাম ও তারিখ অজ্ঞাত; চিত্ৰশৈলীতে পাল-আমলের পূর্ব-ভারতীয় স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
১৭. কুলু-উপত্যকা-প্রবাসী স্বেতোস্লাভ রোয়েরিক মহাশয়ের সংগ্রহে একশত ছাব্বিশটি চিত্রসহ গণ্ডৰূহের একটি সুদীর্ঘ পাণ্ডুলিপি। তারিখ অজ্ঞাত; কিন্তু চিত্রশৈলীতে পোল আমলের পূর্ব ভারতীয় স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
