দ্বাদশ শতকের প্রতিমাকলা প্রধানত সেনা-বর্মণ পর্বের শিল্পাদর্শের এবং সমাজাদর্শের অনুপ্রেরণায় রচিত ও লালিত। এই আমলের প্রতিমাগুলিতে যে, ইহগত, একান্ত পার্থিব সুখৈশ্বর্যের ব্যঞ্জনা, সেই একই ব্যঞ্জনা সেন-বৰ্মণ রাজসভার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ধর্মগত বিষয়বস্তু সত্ত্বেও শিল্প ও সাহিত্য উভয়ই পার্থিব ভোেগচেতনা এবং জৈব কামনা-বাসনা দ্বারা মণ্ডিত। জয়দেবের গীতগোবিন্দ বা গোবর্ধনের সপ্তশতী তো সমসাময়িক শিল্পেরই সাহিত্যিক প্রতিরূপ। সন্দেহু নাই, ইহার মূল ধর্মগত প্রেরণা কিছুটা ছিল, কিন্তু এ-বিষয়েও কোনও সন্দেহ করা চলে না যে যাহা মূলে ছিল অধ্যাত্মপ্রেরণা তাহা রাজসভার ইহগত ভোগবাসনার স্পর্শে একান্ত ইহগত ভাবনা, কল্পনার বিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল। সূক্ষ্ম কমনীয় ইন্দ্রিয়গ্রাহীতা বাঙলার শিল্পকলার প্রধান বলিয়া আগেও পরিগণিত হইত, কিন্তু সেনা-বর্মণ আমলে তাহা দেহগত কামনার মদিরমাধুর্যে পর্যবসিত হইল!
এই আমলের প্রতিমাকলার এই ঐহিক ভাবিদ্যুষ্টির মুলে ভিনাপ্রদেশী ভাবকল্পনার প্রভাব থাকা কিছু বিচিত্র নয়। সমসাময়িক দক্ষিণী প্রতিমা-শিল্পেও একই ঐহিক ভোগসমৃদ্ধির এবং গুরুভার অলংকরণের প্রাধান্য। অবশ্য, বাঙলার প্রতিমাকলায় যে কমনীয়তা, সজীবতা ও সংবেদনশীলতা প্ৰত্যক্ষ দক্ষিণী শিল্পে তাহা নাই; স্মরণ রাখা প্রয়োজন, বাঙলার এই কমনীয়, সজীব ও সংবেদনশীল শিল্পদর্শ পূর্বতন পাল-প্রতিমাকলার উত্তরাধিকার।
সাধারণ কয়েকটি মন্তব্য
নবম হইতে দ্বাদশ শতক এই চারিশত বৎসরে বাঙলাদেশে অসংখ্য প্রস্তর ও ধাতব প্রতিমা রচিত হইয়াছিল; তাহার স্বল্পাংশমাত্র আমাদের হাতে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। শিল্পশৈলীর যে ধারাবাহিক বিবর্তনের কথা বলিলাম, প্রত্যেকটি প্রতিমাই যে সেই ধারা অনুসরণ করিয়াছে এমন নয়; ব্যতিক্রমও প্রচুর। তবু, এই ধারাই সাধারণ প্রবহমান ধারা। কাল কালান্তরে প্রবেশ করে; কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরবর্তী কালের লক্ষণ আগের কালেই আত্মপ্রকাশ করে, আবার কোনও কোনও নিদর্শনে অতীতকালের বৈশিষ্ট্যও সমসাময়িক কালে আমলিন থাকিয়া যায়। বস্তুত, কোনও দুই কালপর্বের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভেদরেখা টানা সম্ভব নয়। তাহা ছাড়া, যে কলা গতিশীল তাহাতে একই ভাবাদর্শ বা ভঙ্গিমার পুনরাবৃত্তি আশা করা যায় না; সাধারণ শিল্পাদর্শেও ব্যতিক্রম দেখা যায়। একই যুগে, এমন কি একই রাজার স্বল্পস্থায়ী শাসনকালেও বিচিত্র মুখাবয়ব, বিভিন্ন নির্মােণরীতি, মণ্ডনকৌশল, এমন কি ভিন্নতর সৌন্দর্যবোধের সাক্ষাৎও পাওয়া যায়। কিছুটা কারণ ভৌগোলিক সন্দেহ নাই; স্থানভেদে রুচির ভেদ, রীতির ভেদ এবং সেই হেতু উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পর্ববঙ্গের প্রতিমাকলায় কিছুটা রূপ-পার্থক্য অনিবার্য। কিন্তু মোটামুটি মানদণ্ড এক এবং অভিন্ন, সমস্তই একই শিল্পাদর্শের সৃষ্টি। এই চারি শতকের বাঙলাদেশে নানা বিভিন্ন জাতি ও জনের বাস, নানা ভিন প্রদেশী লোকের; কোনও কোনও প্রতিমার মুখাকৃতি ও গঠনে বিশিষ্ট জন-বৈশিষ্ট্যও সেই হেতু প্রত্যক্ষ। কোনও কোনও নিদর্শনে তীক্ষা মঙ্গোলীয় প্রভাব সুস্পষ্ট; এই ভোট ব্ৰহ্ম বা মঙ্গোলীয় মুখবৈশিষ্ট্যের পশ্চাতে সমসাময়িক ইতিহাসের প্রেরণা সক্রিয় বলিয়া মনে হয়। শিল্পীর ব্যক্তিগত রুচি এবং গঠনরীতিও কিছুটা এই পার্থক্যের মূলে, সন্দেহ নাই। বাঙলার সমসাময়িক লোকায়ত শিল্পও পাশাপাশি বর্তমান ছিল; তোহার সঙ্গে উচ্চকোটি শিল্পাদর্শ ও রীতির একটা যোগাযোগ ছিল, এমনও অসম্ভব নয় এবং দুইই একে অন্যের দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়তো হইয়াছিল। তবু মোটামুটি বলা যায়, উচ্চস্তরে প্রতিমাশিল্প শাস্ত্ৰবন্ধন হইতে কখনও একেবারে মুক্তিলাভ করিতে পারে নাই। ১৫৭৯ শাকে উৎকীর্ণ একটি পার্বতী-মুর্তি (রাজশাহী-চিত্রশালা) এবং বরিশালে প্রাপ্ত আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের চতুর্ভূজা একটি জগদ্ধাত্রী-প্রতিমায় (আশুতোষ-চিত্রশালা) সমসাময়িক শিল্পের নিজীবী, আনুষ্ঠানিক, প্রতিমালক্ষণ-শাস্ত্রশাসিত শিল্পাদর্শের লক্ষণ সুস্পষ্ট। এই সুদীর্ঘ চারিশত বৎসরের শিল্পীরূপের প্রবাহ গভীর বিরোধী ভাবতরঙ্গে আবর্তিত্ব। এই প্রবাহের গতি কখনও সুস্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ ইন্দ্ৰিয়স্পর্শালু মাংসলতার দিকে, কখনও পরোক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিক ইন্দ্ৰিয়ব্যঞ্জনার দিকে; কিন্তু দুইটি গতিই একই শাস্ত্রশাসনদ্বারা নিয়মিত। একটি অপরূপ মানসম্বন্দ্বের ভিতর দিয়া এই শিল্পকলার বিকাশ; এই মানসম্বন্দ্বজনিত বৈশিষ্ট্য ও মাধুর্যই এই চারিশত বৎসর শিল্পকলার প্রধান লক্ষণ। একদিকে ইহুগীত, দৈহিক, ইন্দ্রিয়গত কামনা-বাসনার সন্তা, অন্যদিকে নৈব্যক্তিক কামনা-বাসনার উপলব্ধির সন্তা একদিকে তান্ত্রিক সাধনার দেহবাদ, যে সাধনা এই রক্তমাংসের দেহকেই মরমার্থিত ঐশ্বর্যের আকর বলিয়া ধ্যান করে, অন্যদিকে আত্মসন্ধানী ব্ৰাহ্মণ্য সাধনা যে সাধনা মানুষের রক্তমাংসে গড়া দেহের অন্তর্নিহিত অপরূপ দেবত্বকে রূপমণ্ডিত করিবার স্পর্ধ রাখে- এই দুই বিরোধী ভাবাদর্শের সংঘাতবর্তে এই চারি শতকের শিল্পপ্রবাহ আন্দোলিত। এই দুই ভাবাদশের সংঘাতের ভিতর দিয়াই এই চারি-শতকের প্রতিমাকলা ধীরে ধীরে অগ্রসর হইয়াছে। প্রথম পর্বে দেহের সহজ সরস কমনীয়তা এবং ভঙ্গি, বিরল সাজসজ্জা, অলংকার ও আড়ম্বর। কিন্তু সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দৈহিক কমনীয়তা ও ভঙ্গি অস্থির ও চঞ্চল হইতে আরম্ভ করে, সাজসজা ও অলংকরণ ক্রমশ বাহুল্যমণ্ডিত হইতে থাকে। সরল ও প্রশান্ত দেহভঙ্গি হইতে আরম্ভ করিয়া ক্রমশ চঞ্চল ও লাস্যময় দেহভঙ্গিতে রূপান্তর দৃঢ় সরল রেখায় অগ্রসরমান। পরিণামে মাত্রাহীন আতিশয্য সমস্ত শিল্পাদর্শকে অবশ্য নির্জীব মদিরতায় পল্লবিত আলংকারাড়ম্বরে একেবারে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। সমসাময়িক সাহিতে কামনা-বাসনার আতিশয্য, উচ্ছসিত পল্লবিত বাক্য ও ব্যঞ্জনবিহীন লাস্যভঙ্গি সমসাময়িক শিল্পেরই প্রতিরূপ এবং দুই-ই ধ্বংসোন্মুখ ক্ষীয়মাণ সংস্কৃতির সুস্পষ্ট ঘোষণা। এই ক্ষীয়মান সংস্কৃতির উপর যবনিকা টানিয়া দিল ইসলামাভিযান। কিন্তু যবনিক পতনের পূর্ব মুহুর্তে যে প্রাণ এই শিল্পীদেহে স্পািদত হইতেছিল। সে প্রাণ দুর্বল, তাহার শক্তি আর কিছু ছিল না!
০৫. চিত্ৰকলা : আনুমানিক ১০০০—১২৫০ খ্ৰীষ্ট শতক
প্রাচীন বাঙলার কোনও স্থানেই এ-যাবৎ প্রাক-পালযুগের চিত্রকলার কোনও নিদর্শন আবিষ্কৃত হয় নাই। কিন্তু ফা-হিয়েনের বিবরণীতে একটি ইঙ্গিত আছে যাহাতে মনে হয় খ্রীষ্টোত্তর চতুর্থ শতকে তাম্রলিপ্তিতে (এবং বোধ হয় বাঙলার অন্যত্রও) চিত্রশিল্পরচনার অভ্যাস পরিচিত ও প্রচলিত ছিল। তাহা ছাড়া, সমসাময়িক ভারতবর্ষে অন্যত্র যেমন, বাঙলাদেশেও বোধ হয় তেমনই লোকায়ত সংস্কৃতিতে পটচিত্র, ধুলিচিত্র প্রভৃতি অজ্ঞাত ছিল না। তাহারই ধারা প্রবাহমান দেখিতে পাওয়া যায় অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের বাঙলাদেশের জড়ানো পটের ছবিতে, আলপনায়, ফরিদপুর-যশোহর বীরভূম-বাঁকুড়া মেদিনীপুর-কালীঘাটের বিচ্ছিন্ন পটের নানা চিত্রে। যাহাই হউক, প্রাচীন শিল্পশাস্ত্র ও সাহিত্য-গ্ৰস্থাদি হইতে জানা যায়, বিহার-মন্দিরের প্রাচীরগাত্ৰ চিত্ৰশোভিত করার শাস্ত্রীয় নির্দেশ একটা ছিল; কাজেই অনুমান করা কঠিন নয় যে, ভারতের অন্যান্য প্রান্তের মতো প্রাচীন বাঙলার অনেক বিহার-মন্দিরের প্রাচীরগাত্ৰই চিত্রদ্বারা শোভিত ছিল। কিন্তু বিহার-মন্দিরই যেখানে ধ্বংসের হাত এড়াইতে পারে নাই। সেখানে প্রাচীর-চিত্রেরা-নিদর্শন আমাদের কালে আসিয়া পৌঁছিবার কথা নয়। প্রাচীন পটচিত্র বা ধুলিচিত্রের কোনও নিদর্শনও এ-যাবৎ আমরা জানি না।
