দশম শতক বাঙলা প্রতিমাশিল্পের সুবর্ণযুগ। অষ্টম শতকে প্রতিমাশৈলী কেন্দ্রবিচ্যুত, কর্দমশিথিল। নবম শতকেও মাংসল শৈথিলা বিদ্যমান। কিন্তু তাহাকে রেখার সীমানায় বঁধিবার একটা চেষ্টা প্রত্যক্ষ। দশম শতকে কেন্দ্ৰচেতনায় সমগ্র দৃষ্টি জাগ্ৰত; শিথিল মাংসল দেহে শক্তির আবির্ভাব, চারিত্রিক দৃঢ়তা বাঞ্জিত।
একাদশ শতক
একাদশ শতকে দৃঢ় শক্তিগৰ্ভ দেহে লাগিল রসমাধুর্যের স্পর্শ, কিছু সৌষ্ঠবের চেতনা। দেহরূপের ক্ষীণতর দিকেও প্রবণতা গেল বাড়িয়া। প্রথম-মহীপালের রাজ্যাঙ্কের তৃতীয় বৎসরে যে বিষ্ণুমূর্তিটি বাঘাউড়ায় পাওয়া গিয়াছে তাহাতে এই সব লক্ষণ বিদ্যমান। এই মূর্তিটিকে পরবর্তী দুই তিন পুরুষের তক্ষণকলার মানদণ্ড হিসাবে গণ্য করা যাইতে পারে। দশম শতকে যে গভীর ও প্রশস্ত গঠন-নৈপুণ্যের পরিচয় পাওয়া যায়, এই শতকে তাহা ক্রমশ সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ হইতে চলিয়াছে এবং ক্ষীণদেহে কোমল পেলাব গড়নের রীতি প্রাধান্য লাভ করিতেছে। পদযুগলের ঋজু কাঠিন্য ক্রমবর্ধমান; সাধারণ ভাবে দেহরেখার নমনীয়তাও ক্রমহ্রস্বায়মান। জানুর গড়ন ও মণ্ডনে নবম ও দশম শতকীয় মার্জিত নৈপুণ্য অন্তহিঁত; শুধু একটি গভীর বক্ররেখায় জানু চিহ্নিত। বস্তুত, দেহের উধ্বভাগের মনোরম মাধুর্যময় গড়ন এবং প্রশান্ত উদার স্মিত মুখমণ্ডলের সঙ্গে দেহের নিম্নভাগের ঋজু, কঠিন অনমনীয় গড়নের কেমন যেন কোনও মিল নেট।
অন্যদিকে পৃষ্ঠপটের বৈচিত্র্য ও অলংকার ক্রমবর্ধমান। প্ৰতিমার অলংকরণ, সহচর দেবদেবীদের অলংকার-বৈচিত্ৰ্য, বিচরমান গন্ধৰ্ব্ব-কিন্নর, পটের অলংকায় ও কারুকার্য ইত্যাদি ক্রমশ প্রতিমাকে অতিক্ৰম করিয়া অতিমাত্রায় স্বাতন্ত্র্যপরায়ণ। তবু, একাদশ শতকের প্রথমার্ধে প্রতিমা ও পার্শ্বদেবতা, প্রতিমা ও পৃষ্ঠপটের মধ্যে একটা ভারসাম্য বিদ্যমান; শেষার্ধের দিকে মূল প্রতিমার সৌষ্ঠব ও সৌন্দর্য ক্রমবর্ধমান অলংকার প্রাচুর্যে প্রায় ভারগ্রস্ত। শিল্পীর আনন্দ যেন এই প্রাচুর্যের মধ্যেই উদ্দীপ্ত। দ্বাদশ শতকে কিন্তু এই উদ্দীপ্ত প্রাচুর্যই ক্রমে হইয়া উঠিল। শিল্পের বন্ধনরজ্জু।
কেশবিন্যাসে এবং উত্তরায়ের রেখায় তরঙ্গায়িত ছন্দ, গভীর ত্রিভুজায়িত ডোলে ও তির্যক বা আলম্ব গভীর রেখায়, আলোছায়ায় স্পন্দিত লীলা! দেহভঙ্গি যেন ছাচে ঢালাই করা, কিন্তু মুখভঙ্গি সংবেদনশীল এবং গড়ন কোমল, সুকুমার। মুখাকৃতি যাহাই হউক, চিবুকের রেখাটি সজীব, ওষ্ঠীদ্বয় প্রায় গোলাকৃতি, চক্ষুদ্বয় গভীর ও প্রশস্ত। বসন দেহের রেখার ও ডোলের সঙ্গে একেবারে একাঙ্গীভূত, বস্ত্ৰাঞ্চল মনোরম তরঙ্গায়িত্ত রেখায় খচিত। ভ্র-চিত্রণে কোনও কোনও নিদর্শনে বঙ্কিম রেখাটিকে দুইবার তরঙ্গায়িত করা হইয়াছে, অর্থাৎ ভূ-র প্রান্তসীমায় আবার উপর দিকে একটু ঢেউ খেলানো হইয়াছে; উদ্দেশ্য যে মাধুর্য ও সংবেদনশীলতার প্রকাশ তাহাতে আর সন্দেহ কি! এই সংবেদনশীল মাধুর্য এবং দীর্ঘািয়ত ক্ষীণ, সৌষ্ঠবময় দেহই একাদশ শতকীয় মূর্তিকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অগ্রদিগুণে প্রাপ্ত উমা-মহেশ্বর প্রতিমা, সুন্দরবনের কঙ্কনদীধির নবগ্রহ। ফলক, সুন্দরবনে প্রাপ্ত বীণাবাদিনী সরস্বতী এই বৈশিষ্টোর স্বাক্ষর।
দ্বাদশ শতক
এই ক্ষীণ দীর্ঘায়ত সৌষ্ঠবমাধুর্যময় দেহের মার্জিত শ্ৰী দ্বাদশ শতকে অলংকার ও পৃষ্ঠপটের অলংকরণের প্রাচুর্যে শুধু যে ভারগ্রস্তই হইয়া পড়িল তাঁহাই নয়, নবম-শতকীয় মাংসল শৈথিল্যও পুনরাবর্তিত হইয়া দেহরূপকে ক্রমশ নিজীবী ভারগ্রস্ত জড়তায় মণ্ডিত করিয়া দিল। দেহট্টেীলের কোমল সজীবতা ও পেলাব মাধুর্য ক্রমে বিদায় লইল। এই শতকের মূর্তিনির্মাণ-কলার স্বাক্ষর দেখিতেছি। তৃতীয় গোপালের রাজত্বকালে খচিত রাজীবপুরে প্রাপ্ত সদাশিব-মূর্তিতে এবং লক্ষ্মণসেনের তৃতীয় রাজাঙ্কে প্রতিষ্ঠিত ঢাকার ভালবাজারে প্রাপ্ত চণ্ডী-প্রতিমায়!
প্রতিমা, পাঠ্যপীঠ, কাঠামো ও পৃষ্ঠপটের বিন্যাস এই শতকে অপরিবর্তিত; দেহকাণ্ডের ক্ষীণ দীর্ঘায়ত ধারাও গোড়ার দিকে অব্যাহত। কিন্তু মুখাবয়বের স্মিত সংবেদনশীলতা আর নাই; তাহার জায়গায় দেখা দিয়াছে অকারণ গান্তীর্যের ভাব। অলংকরণ ছাড়া মার্জিত ভ্ৰ-যুগলের আর যে কোনও উদ্দেশ্য আছে এমন মনে হয় না; পদযুগল তাহার সমস্ত কমনীয়তা হারাইয়া যেন দুইটি স্তম্ভে পরিণত হইয়াছে। পৃষ্ঠপটের ত্রিকল্প বা চতুর্কল্প বিভাগে অসংখ্য গুরুভার পার্থদেবতা, সুপ্রচুর অলংকরণ অথচ সেই অলংকরণ সমগ্র মূর্তির রূপকল্পনার সঙ্গে কোনও অচ্ছেদ্য সম্বন্ধে যুক্ত নয়; সর্বত্র অকারণ ঘনবিন্যস্ত বাহুল্য। সব মিলিয়া সমগ্র প্রতিমা-পটটিকেই যেন ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়াছে।
প্রতিমার দৈহিক গঠনে কমনীয়তার কোনও অভাব নাই, কিন্তু সে-কমনীয়তা যেন মন্দির, অবশ, নিজীব। বঙ্কিমায়িত ভঙ্গির সাক্ষ্য সুপ্রচুর, কিন্তু সে ভঙ্গিতে লীলায়িত গতির ব্যঞ্জনা নাই। বসন প্ৰান্ত ও অঞ্চল তরঙ্গায়িত, গন্ধৰ্ব্ব ও কোনও কোনও পার্শ্ব দেবতার দেহভঙ্গিতে ক্রীড়ালীলার প্রকাশও গোচর; বসনের বহুল রেখাবিন্যাস, পরিধেয় ও কেশ-বিন্যাসের অলংকরণ প্রাচুর্য, গভীর আলোছায়ার বৈচিত্ৰ্যখচিত অলংকার ও পাটদুশ্য প্রভৃতি সত্ত্বেও জীবনের স্বতোদৃপ্ত ও সুস্পষ্ট উজ্জ্বল স্বাক্ষর এ-পর্বের মূর্তিরচনায় অনুপস্থিত। ভোগব্যায়ত সুপূর্ণ ওষ্ঠাধর, ধনুকাকৃতিভ্রুযুগল এবং সুস্মিত মুখমণ্ডল সত্ত্বেও মুখাবয়ব তীক্ষ, প্রায় ত্রিকোণাকৃতি ও কঠিন; সমস্ত মুখমণ্ডলে কোনও গভীর আত্মিক ব্যঞ্জনার চিহ্নমাত্র নাই। দশম-একাদশ শতকের মূর্তিকলায় যে ধ্যানগম্ভীর প্রশান্ত শ্ৰীযুক্ত মুখমণ্ডলের সঙ্গে আমাদের পরিচয়, সে মুখ বিগত; ধ্যানগম্ভীর প্রশাস্তির স্থান লইয়াছে গভীর আনন্দ সম্ভোগের মন্দির পরিতৃপ্তি। এই সম্ভোগের মন্দির পরিতৃপ্তির মাধুর্যই লক্ষ্মণসেনের রাজ্যাঙ্কের তৃতীয় বৎসরে রচিত চণ্ডীর মুখমণ্ডলে। বস্তুত, এই পর্বের প্রতিম।কলায় সর্বত্র একান্ত ইহগত ভোগবাসনার মন্দির মাধুর্যের ব্যাপ্তি দুর্বল কামনার মোহময় বিলাস। তাহা সত্ত্বেও এখানে সেখানে নবতর শিল্পপ্রেরণা ও শিল্পাদর্শের পরিচয় একেবারে নাই, এমন নয়। দুই একটি নিদর্শনে পরিপূর্ণ মগুলায়িত কাঠামোর মধ্যে অমার্জিত অথচ শক্তিগৰ্ভ শিল্পক্রিয়ার প্রয়াস সুস্পষ্ট, এবং অলংকারাবাহুল্য এবং নিখুঁত বিন্যাস সত্ত্বেও এই শিল্পক্রিয়ার মধ্যে একটা সচেতন শক্তি ও মর্যাদা এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সজীবতা স্বপ্রকাশ। এই শক্তি, মর্যাদা ও সজীবতা বাঙলার প্রতিমাকলাকে চূড়ান্ত ধ্বংসের হাত হইতে হয়তো বাচাইতে পারিত। কিন্তু তাহা হইল না; সমসাময়িক সামাজিক বাতাবরণে এই শক্তি, মর্যাদা ও সজীবতা কোথাও ছিল না। তাহা থাকিলে এবং অবকাশ পাইলে হয়তো এই শিল্পকলা নব নব অভিজ্ঞতার ও চেতনার আশ্রয়ে নূতন পথ ও আদর্শের সন্ধানলাভ করিতে পারিত। কিন্তু ইসলামের দ্রুত অভিযান সমস্ত আশা-ভরসার পথ মরুঝড়ে ঢাকিয়া দিল।
