নবম শতক
দেবপাল, শূরপাল, নারায়ণপাল এবং গুর্জরপ্ৰতীহাররাজ মহেন্দ্ৰপালের রাজত্বকালে রচিত কয়েকটি প্রস্তর ও ধাতব প্রতিমা বিহারে পাওয়া গিয়াছে। ইহাদের মাংসল দেহরূপ গুপ্ত-ঐতিহ্যের আপেক্ষিক কমনীয় ডৌল সুস্পষ্ট নৈর্ব্যক্তিকতায় প্রকাশিত; মুখের ভাব প্রশান্ত, কিন্তু দেহের মাংসল গড়নে ইন্দ্ৰিয়স্পর্শালুতার স্বাক্ষর। দেহভঙ্গি কোথাও কোথাও আড়ষ্ট; দেহের বহিরেখা দৃঢ়; এই দৃঢ়রেখাই উদ্বেলিত শক্তিকে সীমার বন্ধনে শক্ত করিয়া বাধিয়াছে; রূপায়ণে যে শক্তিমত্তার পরিচয় তাহা এইখানেই। দৃঢ় বহিরেখার মধ্যে কোমল, মাংসলতার আভাস ফুটাইয়া তোলাই নবম শতকীয় শিল্পদর্শ। খুব কম নিদর্শনেই উন্নত ও গভীর মানস কল্পনার কোনও স্বাক্ষর আছে। ধ্যানের ও উপলব্ধির যাহা কিছু আভাস তাহা শুধু অর্ধনিমীলিত চক্ষু দু’টিতে এবং প্রশান্ত মুখমণ্ডলে; কিন্তু তাহাও প্রায় সবটাই প্রথাগত।
পৃষ্ঠপটটি সাধারণত শিরোদেশে প্রায় অর্ধগোলাকৃতি; কিন্তু দু’একটি ক্ষেত্রে তীক্ষ কোণাযিত অগ্রভােগও দৃষ্টিগোচর। সিক্তবসনের মতো পরিধেয় ভাজ দেহডোলের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে এবং ভাজগুলি সমান্তরাল তরঙ্গায়িত রেখায় চিহ্নিত। দাঁড়াইবার ভঙ্গি হয় সমপদস্থানক না হয় আভঙ্গ বা ত্ৰিভঙ্গ; কিন্তু বসিবার ভঙ্গি প্রায় সর্বত্রই ললিতাসন। ভঙ্গিটি আরামের ব্যঞ্জনা বহন করে সত্য, কিন্তু মূর্তির রূপায়ণে আরামের ব্যঞ্জনা স্বল্পই ব্যক্ত হইয়াছে। হস্ত, পদ, অঙ্গলি ইত্যাদির বিন্যাস একান্তই শাস্ত্ৰনির্দিষ্ট; কিন্তু ইহাদের দেহের অলংকরণ, অঙ্গপ্ৰত্যঙ্গের ক্ষীণতা অথবা মাংসলতা ব্যক্তিগত রুচিনির্ভর, আর রেখার গতি ও মণ্ডণের দৃঢ়তা বা কমনীয়তা যৌথশিল্পপৃষ্টি ও রীতিনির্ভর। জানুদ্বয় সযত্নে খচিত এবং পদদ্বয়ের গড়নে ডোলের নমনীয়তাও প্রত্যক্ষ। তরঙ্গায়িত কুঞ্চিত কেশদাম স্বন্ধের দুই পার্শ্বে নিয়মিত ছন্দে দুল্যমান; দুল্যমান উত্তরীয়ও দৃঢ় নিয়মিত ছন্দে বাধা; উভয়ক্ষেত্রেই স্বচ্ছন্দ লীলার আভাস অনুপস্থিত। অলংকারগুলি ভারী এবং কারুকার্যবিহীন; পৃষ্ঠপটে আলংকারিক সাজসজ্জাও অপেক্ষাকৃত স্বল্প; সর্বত্র তাহা মণ্ডিতও নয়, শুধু রেখার আঁচড়ে চিহ্নিত।
দশম শতক
দৃঢ়, সুনির্দিষ্ট বহিরেখার মধ্যে মাংসল কমনীয়তার আদর্শ অতিক্ৰম করিয়া দশম শতকে দৃঢ় শক্তিগৰ্ভ স্কুল দেহ নির্মাণের আদর্শ আত্মপ্রকাশ করিল। এই শতকের মানবদেহ কল্পনায় আত্মসচেতন, অর্থাৎ তাহা সংযত শক্তিমত্তার ব্যঞ্জনা ডৌল ও গড়নের মধ্যে সুস্পষ্ট সচেতন শক্তির দৃঢ় সংযত প্রবাহ যেন ভিতর হইতে ঠেলিয়া সমগ্র দেহটিকে উচ্ছসিত করিয়া তুলিয়াছে। কোনও কোনও নিদর্শনে কঠোর সংযমে এই প্রবাহোচ্ছাসকে নিয়ন্ত্রণ করা হইয়াছে এবং সে-সংযম এতই কঠোর যে, মনে হয়, দেহের সজীব মাংস যেন পাথরে পরিণত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টি ও রীতি ঠিক তাহা নয়; বরং দৃঢ় সংযত ডোলে ও মণ্ডণে সুকুমার মসৃণতার একটি উজ্জ্বল দীপ্তি ও প্রবাহ প্রত্যক্ষ, সমগ্র প্রতিমামণ্ডল ও পৃষ্ঠপটটির উপর যেন প্রাণের আনন্দ বিচক্ষুরিত, মুখমণ্ডল হইতে আরম্ভ করিয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সীমান্ত পর্যন্ত শক্তিগৰ্ভদেহের প্রাণপ্রাচুর্য পরিব্যাপ্ত; এই উদার বিরাট প্রাণময়তাই নবম শতকের কোমল মাংসলতাকে দশম শতকে অপরিমেয় শক্তিমত্তায় রূপান্তরিত করিয়াছে। সমগ্র দশম শতক জুড়িয়া বাঙলার তক্ষণশিল্পে এই বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন, বিশেষভাবে প্রস্তরশিল্পে। দিনাজপুর জেলার সুরোেহর গ্রামে প্রাপ্ত ঋষভনাথ-প্রতিমা, ফরিদপুর জেলার উজানী গ্রামে প্রাপ্ত বুদ্ধ-মূর্তি, বগুড়া জেলার সিলিমপুরে প্রাপ্ত বরাহবিতার-মূর্তি এই উক্তির সাক্ষ্য। ক্ষেত্রবিশেষে কোথাও কোথাও দেহের উচ্ছসিত শক্তি কোমল কমনীয় রূপাদর্শের অন্তরালে কিছু ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে এবং রূপায়ণে ইন্দ্ৰিয়গ্ৰাহীতার আভাসও স্পষ্ট; কিন্তু কোমল কমনীয়তাই হোক বা ইন্দ্ৰিয়গ্রাহীতাই হোক, দুইই দৃঢ় সংযত রেখাপ্রবাহ দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত।
অন্যান্য বিষয়ে দশম শতক মোটামুটি নবম-শতকের রূপ ও রীতিকেই বহন করিয়া লইয়া চলিয়াছে। পরিপূর্ণ মুখমণ্ডলের আকৃতি অবিকল এক; দেহ সামান্য দীর্ঘািয়ত, কিছু ক্ষীণায়তও বটে, এবং দেহের নমনীয়তা কিছুটা বর্ধমান। তাহার ফলে, দেহের রূপায়ণে রেখার প্রয়োগ বাড়িয়াছে। এ-পর্বে ললিতাসন ও অর্ধপর্যাঙ্কাসন ভঙ্গি প্রিয়তরা। পদযুগলের মণ্ডন কঠিনতর, ঋজুত এবং অপেক্ষাকৃত অনমনীয়। পটের বিন্যাস মোটামুটি এক, কিন্তু পটভূমির অলংকরণ সূক্ষ্মতর হইয়াছে এবং অলংকারের কারুকার্যেও পারিপাট্য বাড়িয়াছে। ওষ্ঠ ও নাসিকার, ভ্ৰ ও চক্ষুদ্বয়ের, বসন ও অলংকারের রেখায় নবম-শতকীয় তীক্ষতা অন্তৰ্হিত; রেখা সুমার্জিত এবং ডোলের সঙ্গে এক সুরে বাধা; পৃষ্ঠপটের উপরিভাগ সূক্ষ্মাগ্র এবং ঠিক তাহার নীচেই কীর্তিমুখী অলংকার।
কলিকাতার আশুতোষ-চিত্রশালায় দশম শতকীয় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মূর্তি আছে। হুগলী জেলায় প্রাপ্ত লোকেশ্বর-প্রতিমা, অগ্রদি গুণে প্রাপ্ত একটি নারীর মুখমণ্ডল, সুন্দরবনে প্রাপ্ত একটি বিষ্ণুপ্রতিমা এবং মহাপরিনির্বাণ বুদ্ধের একটি ফলক। এই প্রতিমাগুলিতে, অল্পবিস্তর ব্যতিক্রম সত্ত্বেও, একই দশম-শতকীয় আদর্শ প্রতিফলিত।
