বলিয়াছি, শারীর বিজ্ঞানের বাস্তবতার প্রতি শিল্পীদের দৃষ্টি কখনো আকৃষ্ট হইত না, কিন্তু বিশিষ্ট মানবদেহের যে বিশেষ ধর্ম, তাহার অন্তলীন অভিজ্ঞতার যাহা ব্যঞ্জনা, তাহার সুষ্ঠু সুমিত প্রকাশে কোথাও কোনও ব্যত্যয় ঘটে নাই। সে-প্রকাশ প্রতিমাগুলির বিশিষ্ট ভঙ্গ ও ভঙ্গিতে, বিশেষ চালচলনে, অর্থবহ স্থিতি বা গতিতে। কিন্তু এ-ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সাধকের ধ্যানদৃষ্টিই সক্রিয় এবং সেই দৃষ্টি প্রায় গাণিতিক সূত্রাকারে গ্রথিত। পাল ও সেনা-পর্বের মূর্তিকলায় যে ভঙ্গ, ভঙ্গি এবং মুদ্রার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তাহার বীজ উপ্ত হইয়াছিল। গুপ্তপর্বের শিল্পকলায়; কিন্তু প্ৰাচ্য-ভারতের এই চারি-পাচশত বৎসরের শিল্প সেই বীজের সমস্ত ফল-সম্ভাবনাকে একটি একটি করিয়া নিঃশেষ সার্থকতায় পরিপূর্ণতা দান করিয়াছে। দুইটি স্থিতভঙ্গির উল্লেখ করিতেছি, একটি সমপদস্থান, অপরটি বাজপর্যাঙ্কাসন। দুইটি ভঙ্গিই উচ্চস্তরের অধ্যাত্ম যোগসাধনা দ্বারা নিয়মিত। বিষম ক্ৰোধ, চরম প্রলোভন, গভীর দুঃখ ও বিষাদ, পরিপূর্ণ সুখ ও আনন্দ, পরম শান্তি ও অস্থির চাঞ্চল্য সব কিছুর সম্মুখে দাঁড়াইয়া; সব কিছুর কেন্দ্রে বাস করিয়াও যে অবিচল দৃঢ়তা এবং নিয়ত পরিবর্তনশীল বস্তুজগতের মধ্যে যে শাশ্বত অপরিবর্তনীয়তা তাহা এই দুই ভঙ্গির মধ্যে ব্যক্তি। অথচ, মূল কেন্দ্র প্রতিমা যেখানে সমপদস্থানক ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান বা বজপর্যাঙ্কাসনে আসীন, সেইখানে তাহার আনুষঙ্গিক পার্শ্বদেবতা ও অনুচর রূপে নানা লাসাভঙ্গিমায় যে-সব দেবদেবীমূর্তি খচিত, নৃত্যশীল ভঙ্গিমায় লীলাচ্ছলে নভোমার্গে যে-সব কিন্নৱী সঞ্চবমান, পৃষ্ঠাপটে রেখা কল্পনার যে ছন্দিত লীলায়িত ভঙ্গি, তাহদের মধ্যে সংসারের নিত্যচঞ্চল চলমান রূপ প্রত্যক্ষ। এই নিতাসিঞ্চরমান লীলায়িত রূপের কেন্দ্ৰে স্থানক বা আসীন যে কোনো অবস্থায় মূল প্রতিমার মুখমণ্ডল ও দেহব্যঞ্জনা স্মিতহাসো বিকশিত, স্থির, প্রশান্ত, গম্ভীর, আচঞ্চল, সমাহিত এবং রূপাস্তরের অতীত। বারবার বলিতে বাধা নাই, এই ভাবাদৃষ্টি যৌগিক দৃষ্টি। যাহা হউক, নবম-দশম-একাদশ শতকে পাশ্বদেবতা ও অলংকরণের সঙ্গে মূল মূর্তির একটা ভারসাম্য এবং একটা যুক্তিগত সামঞ্জস্য বর্তমান ছিল। দ্বাদশ শতকে পাশ্বদেবতাদের অস্থির চাঞ্চল এবং অলংকরণ-রেখার অশান্ত আবেগ মূল মূর্তির প্রশাস্তিকে, তাহার সমাধিকে অতিক্রম ও বিপর্যস্ত করিয়াছে।
অন্যান্য দণ্ডায়মান ভঙ্গির মধ্যে ঈষৎ আভঙ্গ ও ত্ৰিভঙ্গ এবং উপবিষ্ট ভঙ্গির মধ্যে ললিতাসন বা মহারাজিলীলাসন উল্লেখযোগ্য। এই সব ভঙ্গ ও ভঙ্গিমায় সহজ আত্মসমাহিত লালিত) পরিস্ফুট। তাহা ছাড়া, গতিশীল সক্রিয়তা গন্ধৰ্ব্বকিন্নরদের নৃত্যময় ও উড্ডীয়মান ভঙ্গিতে প্রত্যক্ষ এবং বীর্য ও দৃঢ়তা সমান প্রত্যক্ষ বরাহ-বিষ্ণুর এবং অন্যান্য দেবদেবীর আলীঢ় ও প্রত্যালীঢ় ভঙ্গিমায়। এই সব প্রত্যেকটি ভঙ্গ ও ভঙ্গিই শান্ত সমাহিত অভিজ্ঞতা ও ধানযোগ হইতে সঞ্জাত। শিল্পীর মানসে বরাহ-বিষ্ণু বা সঞ্চরণশীল গন্ধর্বের যে রূপ ধরা দিয়েছে, রেখায় ও ভোলে খচিত প্রাণবন্ত ভঙ্গি তাহার একদিক মাত্র; যাহা ক্ষণিকের একটি ভঙ্গি প্রকৃতপক্ষে তাহা গভীর ধ্যানের একটি রূপ। এই রূপকে শিল্পে গতিচ্ছন্দে প্রাণপ্রবাহে প্রকাশ করা হইয়াছে মাত্র! সেই জনাই, যে-ভঙ্গিতে বীরত্বের ব্যঞ্জনা সুস্পষ্ট, যেমন মহিষমৰ্দিনী প্রতিমায় বা বরাহ-বিষ্ণু প্রতিমায়, সে-ভঙ্গিতেও মুখাবয়লে কোনও সমতুল বীরত্বের ব্যঞ্জনা নাই, সে মুখ প্রশান্ত, আনন্দ-দীপ্ত; বীরত্বের এবং উজজীবনের ব্যঞ্জনা শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিন্যাসে, দেহভঙ্গিতে। কোনও দেব বা দেবীর ভাব ও ভঙ্গি কিরূপ হইবে তাহা যে নিয়মিত ছিল ঐতিহ্যগত অভিজ্ঞতা এবং ধ্যানসূত্রদ্বারা তাঁহাই শুধু নয়, সেই দেব বা দেবীর বিশেষ ভঙ্গি ও বিন্যাসের অধ্যাত্ম ব্যাখ্যা যে কী তাহাও সাধনসূত্রেই নিণীত। সুতরাং বিগ্রহ ও সাধনসূত্র উভয়ই উভয়ের ব্যাখ্যার সহায়ক।
নির্মাণকালার বিবর্তন ৭৫০-১২৫০
ডৌল ও গড়নের বিবর্তনের দিক হইতে অষ্টম শতকীয় বলিয়া মনে করা যাইতে পারে এমন প্রতিমার সংখ্যা খুব বেশি নয়। বর্ধমান-বরাকরে প্রাপ্ত দুইটি দেবী প্রতিমা, মানভূম-বোরামে প্রাপ্ত একটি প্রতিমা এবং দিনাজপুর-কাকদীঘিতে প্রাপ্ত একটি বিষ্ণুপ্রতিমা, অন্যান্য অনেক প্রতিমার সঙ্গে এই চারিটি মূর্তি অম্বুম শতকে রচিত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয়। হ্রস্ব গুরুভার দেহে এবং মুখাবয়বের ভঙ্গিতে সমকালীন মাগধী তক্ষণশৈলীর লক্ষণ সুস্পষ্ট। এই বিরলালংকার দেহসজ্জা এবং ডোলের কমনীয়তাও পাল-পর্বের প্রথম পর্যায়ের শিল্পাদর্শের। এই শতকের ধাতব প্রতিমাগুলিতেও একই লক্ষণ দৃষ্টিগোচর।
লিপি প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া বাঙলার যে-ক’টি প্রতিমাকে নিঃসংশয়ে পাল ও সেন-পর্বের বলিয়া চিহ্নিত করা যায় তাহাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। (প্রথম ) মহীপালের রাজ্যাঙ্কের তৃতীয় বৎসরে প্রতিষ্ঠিত এবং ত্রিপুরা জেলার ল’স্কাউরা গ্রামে প্রাপ্ত একটি বিষ্ণুমূর্তি। এই রাজারই চতুর্থ সম্বৎসরে স্থাপিত একটি গণেশ মূর্তি; চন্দ্ৰবংশীয় রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের রাজত্বকালে রচিত একটি বিষ্ণু ও একটি সূর্য-প্রতিমা। তৃতীয় গোপালের রাজত্বকালে নির্মিত একটি সদাশিব মূর্তি এবং লক্ষ্মণসেনের তৃতীয় রাজ্যাঙ্কে রচিত এবং ঢাকার ডালবাজারে প্রাপ্ত একটি চণ্ডী-মূর্তি, এই কয়েকটি লিপি ও তারিখ চিহ্নিত প্রতিমাই শৈলী-নির্দেশ ব্যাপারে আমাদের নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য বা দিগদৰ্শন-সহায়ক। ইহাদের সাহায্যে অল্পবিস্তুর নিশ্চয়তায় বাঙলার সমসাময়িক শিল্পের গতি নির্দেশ করা সম্ভব; বিহারে আবিষ্কৃত প্রতিষ্ঠা-তারিখযুক্ত প্রতিমার সাহায্যেও তাহার সমর্থন পাওয়া যায়। তবে, মনে রাখা দরকার, বিহার ও বাঙলার সমসাময়িক নির্মাণশৈলী ঠিক একই ধারা অনুসরণ করে নাই; গুপ্তধারা ও ঐতিহ্য বাঙলা অপেক্ষা বিহারে অধিকদিন সক্রিয় ছিল; পূর্ব-ভারতের আঞ্চলিক শৈলীর বিকাশ বাঙলায় দেখা দিয়েছিল বিহারের আগে। বস্তুত, অষ্টম শতকের শেষ নবম-শতকের সূচনা হইতেই পূবী শিল্পকলা বাঙলাদেশে তাহার স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছিল; পরবর্তী তিন শতক ধরিয়া এই শৈলীই বিবর্তনের সাধারণ সূত্র ধরিয়া স্তরে স্তরে বিকশিত হইয়াছে।
