তারনাথ এই আমলের দুই জন শিল্পী, ধীমান এবং তাঁহার পুত্র বিটপালের নাম করিয়াছেন এবং বলিতেছেন, এই পিতা ও পুত্র দুইজনে তক্ষণশিল্প, ধাতব মূর্তিশিল্প এবং চিত্রকলার একটি বিশিষ্ট শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন; রাজকীয় দলিলপত্রে এবং ঐতিহ্যে আর কোনও শিল্পীর নাম বা স্মৃতিমাত্রও রক্ষিত হয় নাই। পাথরের ফলকে ও তাম্রপটুে লিপি উৎকীর্ণ করিয়াছেন এমন বহু তুক্ষকের নাম জানা যায়; তাহদের কেহ কেহ শিল্পী বলিয়াও অভিহিত হইয়াছেন; কোনও কোনও ক্ষেত্রে পিতা-পিতামহের নামও উল্লিখিত হইয়াছে। মনে হয়, ইহারা শুধু লিপিই উৎকীর্ণ করিতেন না, মূর্তি নির্মাণও করিতেন! সিলিমপুর-লিপির শেষ পঙক্তিতে লিপি-লেখক ভাস্কর সম্বন্ধে যে-ইঙ্গিত আছে তাহাও এই অনুমানের সমর্থক। “প্রেমিক যেমন গভীর মনোনিবেশে তাঁহার প্রিয়ার প্রতিকৃতি চিত্রিত করেন, তেমনিই মাগধ-শিল্পী সোমেশ্বরও গভীর অভিনিবেশে এই প্রশস্তি উৎকীর্ণ করিয়াছেন।” এখানে কবি সংক্ষেপে এবং প্রায় অননুকরণীয় ভাষায় সোমেশ্বরের শিল্পাদর্শের সংজ্ঞা নির্দেশ করিয়াছেন; মনে হয়, সোমেশ্বর সত্যই কৃতী শিল্পশ্রষ্টা ছিলেন, শুধু কারুবিদ মাত্র ছিলেন না। বাঙলার এই আমলের লিপিগুলিতে আর যে-সব শিল্পীর নামোল্লেখ দেখিতেছি, তাহদের এখানে একত্র করা যাইতে পারে। ভোগটের পৌত্র শুভােটর পুত্ৰ তাতািট; সৎ-সমতট নিবাসী শুভদাসের পুত্র মাংকদাস; বিমলদাস; সূত্ৰধার বিষ্ণুভদ্র; বিক্ৰমাদিতোর পুত্র শিল্পী মহীধর; মহীধর বা মহীধর-দেবের পুত্ৰ শিল্পী শশীদেব; শিল্পী কর্ণভদ্র; শিল্পী তথাগতসার; এবং ধর্মপ্রপৌত্র মনদাসপৌত্র বৃহস্পতিপুত্ৰ ‘বরেন্দ্রকশিল্পী গোষ্ঠীচূড়ামণি’ রাণক শূলপাণি।
এই চারি পাঁচ শতাব্দীর বঙ্গীয় শিল্পধারার সামাজিক পোষকতা কাহারা করিতেন এবং প্রেরণা আসিত সমাজের কোন স্তর হইতে তাহা বুঝিতে পারা কঠিন নয়। এই প্রেরণা ও পোষকতার স্তর তালিকা।গত করিলে এইরূপ দাঁড়ায়, ১৯ রাজপ্রাসাদ, রাজদরবার, সামন্ত-চক্র ও অভিজাত-চক্র; ২৭ বিশিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ এবং তাঁহাদের ধ্যান-ধারণা, ভাব-কল্পনা; ৩. বিশিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের অনুশাসনাধীন শ্রেণী ও বর্ণস্তর; এবং ৪. শ্রেণী, গণ বা নিগমভুক্ত শিল্পীকুল। ১নং স্তর সম্বন্ধে বলিবার কিছু নাই। ২নং স্তর স্পষ্টতই ব্রাহ্মণ্য, বৌদ্ধ বা জৈন পরোহিত্য-শাসনের নীতি-নিয়ম, ধ্যান-ধারণা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত! ৩নং স্তর সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য, তবে, মূর্তি, মন্দির প্রভৃতির পোষকতা যখন ইহারা করিতেন তখন ইহারা স্বভাবতই এমন শ্রেণী:স্তরের লোক ছিলেন যে-স্তর বিত্তশালী এবং অপেক্ষাকৃত হ্রস্ববিত্ত বৃহত্তর জনসাধারণেরই একাংশ, কিন্তু সমাজে তোহারা বিশেষ সম্মানের পাত্ৰ বলিয়া গণ্য নহেন। এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, এই চরি৷ পাচ শতাব্দীর শিল্পে বৃহৎ জনসাধারণের বিশেষ কোনও স্থান নাই; যাঁহাদের আছে তাহারা পুরোহিত শ্রেণীর এবং অল্পবিস্তর বিত্তশালী সমৃদ্ধ সংকীর্ণয়তন গোষ্ঠীর লোক; তাঁহাদেরই সংহত সমন্বিত ঐতিহ্য ভাবকল্পনা এবং চিত্তাদর্শ এই শিল্পে প্ৰতিফলিত। এই মূর্তিকলা ভাব কল্পনায় সংস্কৃত ও অভিজাত উচ্চাকোটির শিল্পকলা, সমসাময়িক সামাজিক-অর্থনৈতিক বিন্যাসের প্রতিপত্তিশীল শ্রেণীর শিল্পকলা। এই কয় শতাব্দীর লোকায়ত শিল্পের স্বাক্ষর যে কী ছিল, কেমন ছিল তাহার রূপ তাহা বলিবার মতন কোনও অভিজ্ঞান আমাদের জানা নাই।
পাল ও সেনা-পর্বের তক্ষণ-কলার সাধারণ বৈশিষ্ট্য
সাধারণভাবে বলিতে গেলে পাল ও সেনা-পর্বের সমস্ত মূর্তিই সূক্ষ্ম অথবা অপেক্ষাকৃত মোটা দানূর কষ্টিপাথরে তৈরি; ধাতব মূর্তিগুলি পিতল ‘? গড়া। সোনা এবং রূপার তৈরি দু’একটি মূর্তিও পাওয়া গিয়াছে। কাঠের মূর্তি এবং অলংকরণ রচনাও একেবারে অজ্ঞাত ছিল না : ঢাকা-চিত্রশালায় তেমন নিদর্শনও দুই চারিটি সংগৃহীত আছে। কিন্তু পাথরই হোক আর কাঠ বা ধাতুই হোক, গঠনরীতির যত পার্থক্যই থাকুক, ভািবকল্পনা ও শিল্পপৃষ্টির, ডৌল ও মণ্ডনের, কাঠামো ও বিন্যাসের কোনও পার্থক্যই এ-যুগে দৃষ্টিগোচর নয়।
এই যুগের প্রায় সমস্ত প্রস্তর ও ধাতব মূর্তিই পৃষ্ঠপটযুক্ত ফলকে উৎকীর্ণ। দুই চারিটি ক্ষেত্রে মাত্র ব্যতিক্রম দেখা যায়। পাহাড়পুরের প্রস্তর ফলকগুলিতে এবং দেউলবাড়ীর সর্বণীমূর্তিতে ইতিপূর্বেই পৃষ্ঠপট ব্যবহারের প্রচলন দেখা গিয়াছিল; অষ্টম-শতকে তাহা পূর্ণ রূপ গ্রহণ করে। কালপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে ফলকোৎকীর্ণ মূর্তি ক্রমশ পৃষ্ঠপট-নিরপেক্ষ হইতে থাকে; কিন্তু তৎসত্ত্বেও মূর্তিগুলিও কখনও একান্তভাবে সমতলবদ্ধ দৃষ্টি হইতে মুক্ত হইতে পারে নাই। একেবারে দ্বাদশ শতকের দুই চারিটি প্রতিমায় পূর্ণ ত্রিভুজায়িত রূপ যেন কিছুটা প্রত্যক্ষ। ফলকের উপর উৎকীর্ণ মূল প্রতিমার শিরোদেশের পশ্চাতে প্রভামণ্ডল; গোড়ার দিকে এই মণ্ডলটি অগ্নিশিখার রূপে সীমাঙ্কিত মাত্র; ক্রমশ তাহা অলংকরণবহুল হইতে হইতে পরিণামে প্রভামণ্ডলের অলংকরণসজ্জার ও বিন্যাসের পারিপটা মণ্ডলের অর্থ হরণ করিয়া লয়। এই প্ৰতিমাগুলিতে দেবদেবীদের যে নরনারীদেহ রূপায়িত, তাহতে একাধারে পার্থিব এবং দৈবী উভয় ভাব-কল্পনারই অপরূপ সমন্বয়। ইহাই শাস্ত্রীয় বিধান। সাধনমালাল বা প্রতিমালক্ষণশাস্ত্রের যে কোনও ধ্যান বা সাধন আলোচনা ও বিশ্লেষণ করিলেই দেখা যাইবে, অধ্যাত্ম নৈর্ব্যক্তিকতা এবং প্রায় ইন্দ্ৰিয়স্পর্শক্ষম দৈহিক সৌকুমার্য ও সৌন্দর্য দুইই একই সঙ্গে এবং সমভাবে স্বীকৃত। অৰ্চনার উদ্দেশ্যে যখনই কোনও দেবদেবীর মূর্তি রচিত হইত, তখনই রূপাদর্শ থাকিস্ত রূপযৌবনময় সুকুমার নর বা নারী। নারীদেহের নারীত্বকে ইন্দ্ৰিয়স্পর্শালু করিবার জন্য যেমন দেবী-প্রতিমার স্তন-যুগল সুডৌল মাংসল এবং মেখলা ও নিতম্ব দেশকে গুরুভার ও লীলায়িত রূপ দেওয়া হইয়াছে তেমনই দেবমূর্তিতে নরদেহের প্রশস্ত স্কন্ধের রেখাকে ক্রমশ ক্ষীণায়মান করিয়া সিংহকটিতে রূপায়িত করিয়া পৌরুষের ব্যঞ্জনা প্ৰকাশ করা হইয়াছে। এ-ক্ষেত্রেও প্রতিমার যৌবনপুষ্ট দেহ, দেহভঙ্গি এবং ভাবাভিব্যক্তিতে ইন্দ্ৰিয়গ্ৰাহীতার সুউচ্চারিত আভাস কিছুতেই দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়। বিশুদ্ধ অধ্যাত্ম ভাব-কল্পনা ও অভিব্যক্তির সঙ্গে সুস্পষ্ট ইন্দ্ৰিয়গ্রাহীতার এইরূপ অপরূপ সমন্বয় শিল্পের ক্ষেত্রে সূদুর্লভ। বলা বাহুল্য, ইহার মূলে সক্রিয় ছিল ইন্দ্ৰিয়ভোগের প্রত্যক্ষ “অভিজ্ঞতা ও আনন্দ এবং এই আনন্দ ও অভিজ্ঞতার প্রশস্ত অঙ্গন ছিল কামযোগ ও তান্ত্রিক সাধনার জগৎ। কিন্তু, এই প্রত্যক্ষ আনন্দ ও অভিজ্ঞতাকে যখন ধ্যানসূত্রানুযায়ী নৈর্ব্যক্তিক অধ্যাত্ম ভাবনা-কল্পনায় রূপাপ্তরিত করা হয়, তখন প্রত্যক্ষ ইন্দ্ৰিয়ভোগের ইঙ্গিত বা তাৎপর্য আর থাকে না, শুধু তাহার দূরাগত ধ্বনিটুকু থাকে মাত্র। সাধারণত, ধ্যানের সূত্র এবং দূরাগত এই ধ্বনি এই দুয়ের উপরই ছিল শিল্পীদের নির্ভর। প্রত্যক্ষ ইন্দ্ৰিয়াভিজ্ঞতাকে যৌগিক প্রক্রিয়ার সাহায্যে নৈর্ব্যক্তিক অধ্যাত্মা-ভাবনায় রূপান্তরের বিভিন্ন প্রয়াসকে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের সাধকগণ বিভিন্ন ধ্যানে ও সাধনে প্রায় কতকগুলি গাণিতিক সূত্রে পরিণত কবিয়ছিলেন। এই এক একটি ধান বা সাধন এক একটি দেবদেবীর বিশিষ্ট রূপকল্পনা; তাহাতে সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে বিশিষ্ট দেবদেবীর ও তাহার, মণ্ডলের, তাহদের রচনা ও বিন্যাসের, তাহাদের বিভিন্ন অংশের পরিমিতির, ভঙ্গির ও রূপের মাপ ও মানের। শিল্পীরা সাধারণত সকলেই এই স’ নির্দেশ নিষ্ঠার সহিত মানিয়া চলিতেন; কিন্তু এই সুবিস্তৃত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুশাসনের সীমায় আবদ্ধ থাকিয়াও প্রতিভাবান শিল্পী কোনও কোনও ক্ষেত্রে গভীর অস্তদৃষ্টির পরিচয় দিয়াছেন এবং তাহদের রূপসৃষ্টির আদশে প্রবুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত হইয়া অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রশক্তি শিল্পীরাও কেহ কেহ পরে নূতনতর দৃষ্টির কিছু কিছু দিশা লাভও করিয়াছেন। সাধারণত, বাস্তব শাবীৱ-বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা, ভারতীয় শিল্পের অন্যান্য পর্বে যেমন, এ-পর্বেও তেমনই কোথাও উৎকট হইয়া দেখা দেয় নাই; কিন্তু অন্যদিকে একই সঙ্গে প্রতিমাগুলির অলংকার ও অলংকরণে যে বাস্তব নিষ্ঠা ও কারুকার্থের যে অপরিমেয় সূক্ষ্মতা দৃষ্টিগোচর, তাহা বিস্ময়কর।
