যাহাই হউক, বাঙলাদেশে এবং সমগ্র বঙ্গ-বিহারে, পাল-বংশকে আশ্রয় করিয়াই এই মধ্যযুগীয় লক্ষণগুলি সুস্পষ্ট হইয়া দেখা দিতে আরম্ভ করে এবং আদিপর্বের শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ মুসলমান অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে এই লক্ষণগুলি ক্রমশ প্রকট হইতে থাকে। কী কী কারণে এই গভীর রূপান্তর সাধিত হইয়াছিল। তাহার কিছু আভাস আগে ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি; আমাদের আলোচনা-গবেষণার বর্তমান অবস্থায় তাহার চেয়ে বেশি বলিবার উপায় নাই। তাহা ছাড়া, বর্তমান প্রসঙ্গে প্রয়োজনও নাই। এই কয়েক শতক (৭৫০-১২৫০) ধরিয়া বাঙলায় আচরিত শিল্পকলায় কী কী রূপান্তরের ফলে আসাম-বাঙলা-বিহারে অর্থাৎ প্রাচ্য-ভারতে এক নূতন শিল্পরূপ ও রীতির উদ্ভব ঘটিয়াছিল তাহাই বর্তমান প্রসঙ্গে আলোচ্য।
মধ্যযুগীয় পূর্বী শিল্পের সামাজিক পটভূমি
পাল-রাজবংশ বৌদ্ধ, কিন্তু রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতিও যথেষ্ট অনুরক্ত ছিলেন, এবং বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান দুইই তাঁহাদের পোষকতা লাভ করিত। জনসাধারণের অধিকাংশই যে ছিলেন ব্রাহ্মণ্য বা লোকায়ত ধর্মশ্রিয়ী তাহাতে কোনও সন্দেহ নাই। পাল-পর্বের শিল্পসাধনার পশ্চাতে রাজানুকুলা কতখানি ছিল বা না ছিল, বলা কঠিন; কিন্তু সমৃদ্ধ বিত্তশালী লোকদের পোষকতা যে ছিল এবং তাঁহাদেরও বিভিন্ন ধৰ্মসম্প্রদায়ের প্রয়োজনের প্রেরণাও যে সক্রিয় ছিল, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। সেন-আমলে রাজবংশ ও অভিজাত-চক্রের দৃষ্টিভঙ্গির কিছু পরিবর্তন ঘটে। সেন বংশ ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুরাগী এবং একান্তই ঐ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক; অভিজাত-চক্রও তাঁহাই। এই আমলের রাজসভাপুষ্ট সংস্কৃত সাহিত্যের দিকে তাকাইলে মনে হয়, রাজসভা এবং অভিজাত চক্রের সমাজে অলংকরণ ও বিলাস-ব্যসনের আতিশয্য, জাকজমক ও আড়ম্বরপ্রিয়তা অত্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছিল। সোনা-আমল্লুের তক্ষণ-শিল্পেও একই লক্ষণ দৃষ্টিগোচর; রচনাবিন্যাসে এবং দেহভঙ্গিতে অতিরিক্তমাত্রা সংবেদনশীলতার আবেদন, ডোলে ও গড়নে ইন্দ্ৰিয়পর ইহমুখীতার আকর্ষণ। সেইজন্যে মনে হয়, এই আমলের তক্ষণ-শিল্পে রাজপ্রাসাদ ও অভিজাত-চক্রের রুচি ও ভাবনাই ছিল একান্তভাবে সক্রিয়।
এই চার-পাচ-শ’ শতাব্দীর শিল্পের মূল প্রেরণা ছিল বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রানুমোদিত, উচ্চকোটির ধর্ম-কল্পনা ও ভাবনা, কোনও ব্যক্তি বিশেষের বোধ বা অভিজ্ঞতাসঞ্জাত কল্পনা-ভাবনা নয়, বিশেষ বিশেষ ধৰ্মসম্প্রদায়ের যৌথ সংহত বোধ ও অভিজ্ঞতা জাত ভাবনা-কল্পনা। এই পর্বের বৌদ্ধ, জৈন এবং ব্রাহ্মণ্য প্রত্যেক ধর্মেরই প্রতিমার স্বকীয় শাস্ত্ৰনির্দিষ্ট রূপ প্রত্যক্ষ, কিন্তু সে-রূপ সাধারণত কোনও ব্যক্তিগত বোধ বা অভিজ্ঞতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। তাহা ছাড়া, প্রতিমা-শাস্ত্রের দিক হইতে বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য প্রতিমায় যত পার্থক্যই থাকুক না। কেন, শিল্পের দিক হইতে ইহাদের মধ্যে কোনো পার্থক্যই নাই; শিল্পীরীতি ও আদর্শ প্রতোক ক্ষেত্রেই এক। এর পর আবার, প্রতিমাশাস্ত্রের নির্দেশ কোনও কোনও ব্যক্তিগত সৌন্দর্য বা অধ্যাত্মবোধ বা অভিজ্ঞতা দ্বারা রূপান্তরিত নয়। সমগ্র ভারতীয় প্রতিমাশিল্প সম্বন্ধেই এ-কথা প্রযোজ্য, এবং সেই হেতুই এই শিল্প অনামী।
মন্দির নির্মাণ ও প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া ধৰ্মগত পুণ্যার্জনের সৌভাগ্য সকলের ছিল না। যাহারা এই ব্যয়ভার বহন করিতে পারিতেন তাহারাই কেবল সেই সুযোগ-সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন। কাজেই এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, সমসাময়িক কালে জনসাধারণের মধ্যে একটি বিত্তশালী সম্প্রদায় ছিল যাঁহারা তাহদের নিজ নিজ ধর্মের অনুশাসন মানিয়া চলিতেন, ধর্মগত পুণ্যার্জনে বিশ্বাস করিতেন।
যাঁহারা প্রতিমা দান ও প্রতিষ্ঠা করিতেন, তাঁহারা পুণ্যার্জনের তৃপ্তি ও আনন্দ উপভোগেই সন্তুষ্ট থাকিতেন। প্রতিমা-নির্মাণের রীতি-নিয়ম সম্বন্ধে তাহাদের কোনও ব্যক্তিগত মতামত বা নির্দেশ বা রুচি কিছু ছিল না। শিল্পী চলিত প্রথা ও আদর্শ, শাস্ত্রীয় অনুশাসন এবং শিল্পীরীতির সাধারণ ঐতিহ্য অনুসরণ করিয়া মূর্তি গঠন করিতেন। তাঁহারই চতুঃসীমার মধ্যে শিল্পী ও তাহার সহকর্মীদের যাহা কিছু ভাবাদৃষ্টি ও শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয়। শাস্ত্রীয় ধ্যানগত কল্পনার সঙ্গে শিল্পীর দৃষ্টি ও ভাবনা, ধ্যান ও কল্পনা সব সময় একাত্ম হইত। তাহা নয়; যখন হইত, তখন যথার্থ শিল্পবস্তু রচিত হইত, যখন তাহা হইত না তখন শুধু প্রতিমাই হইত, শিল্পীসৃষ্টি হইত না, মূর্তি হইত না।
শিল্পীরা ছিলেন সমাজের নিম্নতর স্তরের লোক এবং সাধারণত সকলেই ছিলেন পেশাগত শ্রেণী, গণ বা নিগমভূক্ত। তাঁহাদের পেশা বা বৃত্তিও সাধারণত নিম্নস্তরের বলিয়াই গণ্য হইত। প্রায়শ্চিত্ত প্রকরণ-গ্রন্থে ভবদেব-ভট্ট একটি উক্তি উদ্ধৃত করিয়া যে সব নিম্নবর্ণ ও শ্রেণীর স্পষ্ট খাদ্য ব্রাহ্মণদের পক্ষে নিষিদ্ধ এবং যাঁহাদের বৃত্তি ব্ৰাহ্মণদের পক্ষে গ্রহণীয় নয় তাহার একটি তালিকা প্রকাশ করিয়াছেন। এই তালিকায় অন্যান্যদের মধ্যে নাট, নর্তক, তক্ষক, চিত্রোপজীবী, শিল্পী, রাঙ্গোপঞ্জাবী, স্বর্ণকার এবং কর্মকারের নাম উল্লিখিত আছে। অবশ্য, বিজয়সেনের দেওপাড়া-লিপিতে বরেন্দ্ৰভূমির শিল্পীগোষ্ঠীচুড়ামণি এক রািণক শূলপাণির উল্লেখ আছে। মনে হয়, কখনও কখনও শিল্পীদের মধ্যে কেহ কেহ হয়তো রাজদরবারে সম্মানিত পদ অধিকার করিতেন, তবে এ-ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল।
