পালপর্বের আগে প্রস্তর-ভাস্কর্যের নিদর্শন যে বাঙলাদেশে খুব বেশি নাই, তাহার প্রধান কারণ সুলভ মৃৎশিল্পের প্রসার। নমনীয় মাটির নিজস্ব একটা গুণ ও প্রকৃতি তো আছেই; সহজ দ্রুত অঙ্গুলি ও করতালু চালনার ফলে নানা বিচিত্র দ্রুত ভঙ্গ ও ভঙ্গি সহজেই রূপ গ্রহণ করে, ডোলের মার্জনা সহজ নয়। এই মাধ্যমে কাজ করার ফলে বাঙলার লোকায়ত শিল্পের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আপনি ধরা দিয়াছিল। তারপর যখন এই সব শিল্পীরা মধ্য-ভারতীয় প্রভাবে পড়িয়া পাথরের কাজে হাত দিলেন তখন প্রাথমিক বাধা কতকগুলি দেখা দিবে, তাহা বিচিত্র নয়। কিন্তু এই বাধা-সংঘাতের ভিতর দিয়াই সৃষ্টি লাভ করিল নূতন শিল্পীরীতি যে রীতিতে মৃৎশিল্পের গতিময়ত, প্ৰাণপ্ৰবাহ এবং মার্জিত ডোল একদিকে যেমন পাথরে রূপান্তরিত হইল তেমনই পাথরে কাজ করার দরুন দেহরূপে এবং ভঙ্গিতে দেখা দিল একটা দৃঢ় কাঠিন্য। এই রীতির পরিচয়ও পাহাড়পুরেরই কতকগুলি দেবদেবী মূর্তিতে (কৃষ্ণ-বলরাম, ইন্দ্ৰ, যম, কুবের, গণেশ ইত্যাদি) পাইতেছি; দুই-একটি নৃতাপরা নারীমূর্তিতেও তোহা সুস্পষ্ট। এই রীতি ও ধারাই এমপরিণতি লাভ করিয়া পাল-পর্বের মধ্যযুগীয় পূবী প্রতিমাশৈলীতে বিবর্তিত হইয়াছিল। বলা বাহুল্য। এর পশ্চাতে ছিল খহুযুগের অভ্যাস ও অনুশীলন।
বাঙলাদেশে পাথরে তৈরি নানা পর্বের যে-সব প্রতিমা বা মূর্তি নিদর্শন, পাওয়া গিয়াছে, তাহার কয়েকটি ছাড়া কোনোটিতেই কোনও সন-তারিখ উৎকীর্ণ নাই, এমন কি কোনও লেখাও যথেষ্ট উৎকীর্ণ নাই যাহার সাহায্যে ইহাদের কালনির্ণয় করা চলে। কাজেই গঠন ও রূপ-বিশ্লেষণ ছাড়া ইহাদের কাল নির্ণয়ের অন্য কোনও উপায় নাই। যেমন সাহিত্যে, শিল্পেও তেমনই নানা সামাজিক ও আদর্শগত কারণে, গঠনরীতিগত কারণে, বিবর্তনগত কারণে, এক এক যুগে এক এক দেশখণ্ডে কতকগুলি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য রূপ গ্রহণ করে। সেই জন্য সেই বৈশিষ্ট্যগুলি আশ্রয় করিয়া মূর্তিগুলির কাল-নিরূপণ সহজ হয়।
সপ্তম-অষ্টম শতকীয় মূর্তি
বাঙলার নানা জায়গায় প্রাপ্ত সপ্তম-অষ্টম শতকীয় মূর্তিগুলি বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায় যে, ইহাদের প্রায় সবই পূজাৰ্চনার জন্য তৈরি দেবদেবী মূর্তি এবং ইহাদের নির্মাণ ও রচনাবিন্যাস একান্তই প্রতিমালক্ষণ-শাস্ত্র দ্বারা মোটামুটি নিয়মিত। পাহাড়পুরে যে দেবদেবীর মূর্তিগুলি দেখিতেছি, এ গুলি ঠিক অৰ্চনার জন্য তৈরি দেবদেবী প্রতিমা নয়, বোধ হয় প্রাচীর বা ভিত্তিগাত্র সজ্জার জন্যই ইহাদের রচনা; কিন্তু তৎসত্ত্বেও প্রতিমাশাস্ত্রের নির্দেশ একেবারে অস্বীকৃত হয় নাই। তবে, প্রাচীর বা ভিত্তিগাত্ৰ সজ্জার জন্য যে মূর্তি রচিত হইত। তাহার আর কোনো পৃষ্ঠপট প্রয়োজন হইত না, কিংবা সাধারণত তাহার শিরোভাগের পশ্চাতে কোনো শিরশিচক্র বা প্রভামণ্ডল থাকিত না। কিন্তু গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠা করিয়া নিয়মিত অৰ্চনার জন্য যে-সব দেবদেবীর প্রতিমা রচিত হইত। তাহাদের পৃষ্ঠপট ও শিরশ্চিক্র দুইই প্রয়োজন হইত, কিছুটা শিল্পের। প্রয়োজনে, সৌন্দর্যবোধের প্রেরণায়, কিছুটা শাস্ত্রনির্দেশে।
০৪. তক্ষণ-শিল্পের দ্বিতীয় পর্ব। পূর্ব-ভারতীয় শিল্পের ধারা। মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির সূচনা
তক্ষণ-শিল্পের দ্বিতীয় পর্ব। পূর্ব-ভারতীয় শিল্পের ধারা। মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির সূচনা
সপ্তম-অষ্টম-নবম শতকে ভারতেতিহাস ও সংস্কৃতির দিক পরিবর্তন বা রূপান্তরের কথা আগে একবার একটু বলিয়াছি; কি ভাবে ক্ল্যাসিক্যাল পর্বের অবসান ঘটিয়া মধ্যযুগের আভাস ক্রমশ সুস্পষ্ট হইতে আরম্ভ করিল, তাহারও ইঙ্গিত করিয়াছি। পাল ও সেন আমলের (আ ৭৫০—১২৫০ খ্রী) তক্ষণশিল্পের কথা বলিবার আগে সেই ইঙ্গিতাটিই অন্যদিক হইতে আরও একটু ফুটাইয়া তুলিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে।
তক্ষণ-শিল্পের দ্বিতীয় পর্ব। পূর্ব-ভারতীয় শিল্পের ধারা। মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির সূচনা।
মোটামুটি ভাবে বলিতে গেলে খ্ৰীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক হইতে আরম্ভ করিয়া খ্ৰীষ্টোত্তর ষষ্ঠ-সপ্তম শতক পর্যন্ত ভারতীয় শিল্পসাধনার বিভিন্ন স্তরে ও পর্যয়ে একটি মৌলিক ঐক্য সুস্পষ্ট। একটি সর্বভারতীয় সার্বভৌমত্বের আদর্শও এই কয়েক শত বৎসরের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পরিমণ্ডলে পরিব্যাপ্ত ছিল। এ-কথা অবশ্য স্বীকার্য, স্থানীয় এবং আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যও থাকিয়া থাকিয়া সার্বভৌম রাষ্ট্ৰীয় এবং সাংস্কৃতিক আদর্শকে কখনও ব্যাহত কখনও সমৃদ্ধ করিয়াছে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও এই কয়েক বৎসর ধরিয়া ভারতীয় বোধ, বুদ্ধি এবং আত্মিক সাধনার কেন্দ্রে একটি সর্বভারতীয় ঐক্য ও মানের, কল্পনা ও মননের, ভাব ও আদর্শের প্রভাব ছিল সচেতন ও সক্রিয়। গুপ্ত-পর্বে কালিদাসের কাব্য, সারনাথের ভাস্কর্য, অজস্তা-গুহার চিত্রাবলী সেই চেতনার চরম অভিব্যক্তি; তাহাই সৰ্বভারতীয় মানদণ্ড। কিন্তু সপ্তম শতকের শেষার্ধ হইতেই ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নূতন বাঁেক নিতে আরম্ভ করে, শুধু রাষ্ট্ৰক্ষেত্রেই নয়, সংস্কৃতির ক্ষেত্ৰেও। সর্বভারতীয় আদর্শের চেতনা পরেও আরও কিছুদিন সক্রিয় ছিল, সন্দেহ নাই, কিন্তু আঞ্চলিক আদর্শ ও কল্পনা ভারতীয় জীবনের নানাদিকে ক্রমশ সুস্পষ্ট আকার ধারণ করিতে আরম্ভ করিল। রাষ্ট্ৰীয় পরিমণ্ডলে স্থানীয় ছোট ছোট রাজ্য ও সামন্তরাষ্ট্র মানুষের চেতনাকে অধিকার করিল এবং এই আঞ্চলিক মনোবৃত্তি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনুভূত হইতে দেরি হইল না। উত্তর-ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে যে-সব বিভিন্ন প্ৰান্তীয় ভাষা ও অক্ষর প্রচলিত তাহার প্রত্যেকটিরই জন্মকাল খ্রীষ্টোত্তর নবম-দশম-একাদশ শতকের মধ্যে; সর্বভারতীয় সংস্কৃত বা প্রাকৃত এবং ব্রাহ্মীলিপি এই শতাব্দীগুলির ভিতরই প্রান্তীয় ভাষা ও অক্ষরে রূপান্তর লাভ করে। এই সময়েই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আঞ্চলিক স্মৃতিশাস্ত্র রচনার সূত্রপাতও দেখা দেয়; এ- ক্ষেত্ৰেও সমাজবিন্যাসে আঞ্চলিক মানস প্রত্যক্ষ। শিল্পীসাধনার ক্ষেত্রেও এই সময় সর্বভারতীয় মানদণ্ড ছাড়িয়া অথচ সেই মান হইতেই বিবর্তিত হইয়া আঞ্চলিক রূপ ও রীতিকে আশ্রয় করিয়া এক একটি আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্র গড়িয়া ওঠে। রাষ্ট্রে আঞ্চলিক সামস্তাদর্শ, সমাজে আঞ্চলিক স্মৃত্যাদর্শ ও স্তরভেদ, ভাষা ও অক্ষরে আঞ্চলিক রূপ ও রীতি, শিল্পেও : আঞ্চলিক রূপ ও রীতি। সর্বভারতাদর্শ ও বোধের ক্ষেত্রে এই সর্বব্যাপী আঞ্চলিক আদর্শ এবং বোধই ভারতবর্ষের ইতিহাসে মধ্যযুগের সূচক।
