সমসাময়িক জীবনের কোনও বস্তুই এই মৃৎশিল্পীদের দৃষ্টি এড়ায় নাই। রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণকথার নানা গল্প, পঞ্চতন্ত্র ও বৃহৎকথার নানা কাহিনী যেমন এই ফলকগুলিতে দৃষ্টিগোচর, তেমনই দৃষ্টিগোচর প্রত্যন্ত বাঙলার নানা আদিবাসী নরনারীর নানা দেহরূপ নানা অভ্যাস, নানা সংস্কারের চিত্র, কাল্পনিক প্ৰাণীজগতের বিচিত্র নিদর্শন—গন্ধৰ্ব, কিন্নরী, অর্ধমানব-অর্ধপশুর লীলাময় কল্পনার ছন্দিত রূপ; সমৃদ্ধ পশুপক্ষী জগতের নানা বিচিত্র নিদর্শন—প্রত্যেকের নিজস্ব বিশিষ্ট ভঙ্গিমায় এবং বিষয়বস্তুর মর্যাদা ও বৈচিএানুযায়ী রূপায়িত; নানা ভঙ্গিমায় জননী ও শিশু; কুন্তীকসরত ও নানা শারীরক্রিয়ারত মল্লবীর; যষ্ঠিবৃত দ্বারপাল; কুপে জলাহরণরতা ও জলপাত্রবাহিনী নারী; গৃহপ্ৰবেশিরতা নারী; স্ত্রী ও পুরুষ যোদ্ধা, রথারোহী ধনুর্ধর; দীর্ঘশ্মশ্রু আনত পৃষ্ঠ ভ্ৰাম্যমাণ সন্ন্যাসী বা দরিদ্র ভিক্ষুক; লাঙ্গলবাহী কৃষক; মৎস্যবাহিনী ও মৎস্যকর্তনরতা নারী; নৃত্যপরা ও সংগীতরতা নারী; শিকারবাহী ব্যাধ; গীতবাদ্যরত পুরুষ; ধর্মাচরণরত ব্ৰাহ্মণ; অস্তিচর্মসার, ন্যাঙ্গোটিমাত্র পরিহিত, স্কন্ধাদেশে প্রলম্বিত যষ্ঠির দুইপ্রান্তে পুঁটুলি ঝুলানো পথিক সন্ন্যাসী বা দরিদ্র ভিক্ষুক; নানা কৌতুকময় ঘটনা, রূপ ও ভঙ্গিমা; মোেরাগের ও র্যাড়ের লড়াই প্রভৃতি জীবনের অসংখ্য বিচিত্ররূপ। দেবদেবী মূর্তিও একেবারে অপ্রতুল নয়; ব্ৰহ্মা, বিষ্ণু, গণেশের কয়েকটি মূর্তি আছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশি আছেন শিব, সেই শিব “যে-শিবের লোকায়ত রূপ ও ভঙ্গিমা মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যে এবং লোকায়ত শিল্পে কীর্তিত এবং আজও সুপরিচিত। বৌদ্ধ দেবদেবী, বিশেষ ভাবে মহাযান-বজযানবর্গের কয়েকটি দেবদেবীও আছেন, যেমন বোধিসত্ত্ব পদ্মপাণি, মঞ্জুশ্ৰী, তারা। কিন্তু শাস্ত্ৰ-ব্যাখ্যাত দেবদেবীর সংখ্যা প্রায় নগণ্য বলিলেও চলে।
আগেই বলিয়াছি, এই ফলকগুলির গড়নে মার্জিত স্পর্শের, সূক্ষ্ম রুচির বা গভীর ব্যঞ্জনার পরিচয় সামান্যই; কিন্তু লক্ষণীয় ইহাদের সাবলীল গতিচ্ছন্দ, ইহাদের স্বচ্ছন্দ প্রাণময়ত, জীব ও মানবদেহের গঠন, গতি ও প্রকৃতি সম্বন্ধে শিল্পীদের সচেতন দৃষ্টি, জড়াজগতের এবং দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি সম্বন্ধে তাঁহাদের প্রত্যক্ষাবোধ! এমন অপূর্ব বস্তুময়তাও দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়। সন্দেহ করিবার কারণ নাই যে, এই শিল্প একান্তই লৌকিক শিল্প প্রথাবদ্ধ প্রতিমা-শিল্পের সঙ্গে ইহাদের কোনও যোগ নাই। যে বিহার-মন্দির নৃপতি ও উচ্চতর অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রথাগত ধর্মের নিশ্চিত নিয়ন্ত্রণাধীনতায় রচিত, তাহার প্রাচীর-গাত্রে বিস্তার লাভ করিবার এমন প্রশস্ত সুযোগ সমসাময়িক লৌকিক শিল্প পাইল কী করিয়া, ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়। মৃৎশিল্প প্রাকৃত স্তরের শিল্প; প্রাচীন ভারতীয় ধারণায় এই শিল্প অপভ্রংশ পঙক্তির শিল্প; আভিজাত সংস্কৃত স্তরের শিল্পের সঙ্গে একাসনে ইহার স্থান কোথাও নাই— শিল্পশাস্ত্ৰেও নাই; সমগ্র প্রাচীন ভারতীয় মন্দির-বিহারেও তেমন সুপ্রচুর নিদর্শনও কোথাও নাই। জনসাধারণের প্রত্যক্ষ সৃজনক্রিয়ার এইসব নিদর্শন উচ্চকোটি ও সংস্কৃত শিল্পীসাধনার নিপুণতর নিদর্শনের পাশে কোথাও দাঁড়াইবার সুযোগ পায় নাই, সে স্পর্ধাও ছিল না।
এ-কথা অস্বীকার করা চলে না যে, এই লৌকিক মৃৎশিল্প পূর্বতন যুগেও সুঅভ্যস্ত ছিল, বাঙলাদেশে ছিল, সমগ্র গাঙ্গেয়ভূমি জুড়িয়াই ছিল। প্রাকৃত ভাবনা-কল্পনার তাৎক্ষণিক রূপের ভাষাই তো এই মৃৎশিল্প। কিন্তু, মনে হয়, এই শিল্প আজও যেমন তখনও তেমনই গ্রামে গ্রাম্য জনসাধারণের লোকায়ত জীবনের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল এবং তাহাই ছিল সাধারণ নিয়ম। পাহাড়পুর এবং ময়নামতীতে যে এই শিল্পকে দেখিতেছি পুরোভাগে এবং ইহারই নিদর্শন দেখিতেছি প্রচুরতম, তাহার প্রধান কারণ, বাঙলাদেশে পাথরের অভাব এবং প্রাকৃত সংস্কৃতির আপেক্ষিক প্রাবল্য। পাহাড়পুর বা ময়নামতীর মতন সুবৃহৎ বিহার-মন্দিরের সুবিস্তৃত প্রাচীরগাত্র ঢাকিয়া দিবার মতো এত পাথর এবং প্রস্তর-তক্ষক বাঙলাদেশে ছিল না। কাজেই ডাক পড়িয়াছিল প্রাকৃত শিল্পীরূপে অভ্যস্ত লোকায়ত শিল্পীকুলের এবং তাহারা অগণিত মৃৎফলকে সমস্ত প্রাচীর গাত্র ঢাকিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু এমন সুযোগ তাহারা সচরাচর পাইতেন বলিয়া মনে হয় না। বস্তুত, অষ্টম-নবম শতকের পর বহুদিন এই লোকায়ত শিল্পের নিদর্শন আর কোথাও দেখিতেছি না। বহু শতাব্দী পর, বাঙলাদেশে যখন কেন্দ্রীয় অন্যতম রাজশক্তি ধর্ম ও সংস্কৃতির পোষক, রাষ্ট্র ও রাজপ্রাসাদের সংস্কৃতিবন্ধন যখন শিথিল, প্রথাগত ও উচ্চকোটির সংস্কৃত ধর্মের শাসন যখন দুর্বল, লোকায়ত ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব যখন কিছুটা প্রসারিত তখন, অর্থাৎ খ্ৰীষ্টীয় সপ্তদশ শতক হইতে উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, এই লোকায়ত শিল্পের আপেক্ষিক প্রসার ও প্রতিপত্তি আবার আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এই সময় এবং ইহার কিছু আগে হইতেই গ্রাম্য কৃষিজীবী জনসাধারণের ভাব ও চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ দেশীয় অর্থাৎ বাঙলা সাহিত্যের বিকাশের পরিচয় পাওয়া যায় এবং মঙ্গলকাব্যে, বারমাস্যায়, মহাকাব্যের লৌকিক রূপায়ণে, নানা গাথাগীতিকায়, পদাবলীতে দেশ ও জাতির মর্মবাণী ব্যক্ত হয়। এই লোক-সাহিত্যের সমান্তরালে দেখিতেছি লৌকিক শিল্পেরও বিকাশ। ফরিদপুর, যশোহর, বর্ধমান, বীরভূম, চব্বিশ-পরগণা এবং বাঙলার অন্যান্য জেলার বহু ইটের তৈরি মন্দিরের বহিঃপ্রাচীরগাত্রে অগণিত মৃৎফলকের সমৃদ্ধ ঐশ্বর্য এই কালে আবার দৃষ্টিগোচর হইতেছে। ইহাদের শিল্পদূষ্টি ও আঙ্গিক কিছুটা ভিন্নতর, কিন্তু লোকায়ত শিল্পের যাহা প্রধান মৌলিক বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ সাবলীল গতিময়তা, স্বচ্ছন্দ প্রাণপ্রবাহ এবং প্রত্যক্ষ দৈনন্দিন জীবনের সমৃদ্ধ বস্তুময়ত তাহা এই দৃষ্টি এবং আঙ্গিকেও সমান প্রত্যক্ষ। রাজপ্রাসাদ, অভিজাতচক্র এবং পুরোহিতবর্গের শাস্ত্রানুগ শিল্পের স্পর্শবিমুক্ত এই লৌকিক শিল্পের ধারা বহুদিন পর্যন্ত স্বীয় বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
