লোকায়ত শিল্পের আভাস
কিন্তু অষ্টম শতকীয় পাহাড়পুর বিহার-মন্দিরের বিশিষ্ট শিল্পরূপ সদ্যোক্ত এই ধরনের ফলকগুলির মধ্যে নাই। সংখ্যায়। ইহাদের চেয়ে বেশি এক ধরনের অনেকগুলি ফলক আছে যাহার বালি-পাথর সাদাটে ধূসর বর্ণের এবং দানাদার, দাগবহুল। এই ফলকগুলি সবই একই আয়তনের; ভিত্তি গাত্রের ছক বিশ্লেষণ করিলেই বুঝা যায়, ছকের আয়তনানুযায়ী ফলকগুলির আয়তনও নির্ণীত হইয়াছিল। এই ফলকগুলিতে নানা কাহিনীর রূপায়ণ। অনেকগুলিতে কৃষ্ণায়ণের বিচিত্ররূপ; কিন্তু এই কৃষ্ণ একান্তভাবে ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রানুমোদিত কৃষ্ণ নহেন; তাহার রূপ যেন একান্তই লোকায়ত জীবনের। কতকগুলিতে রামায়ণ-মহাভারতের নানা গল্পের রূপ এবং সেইসব গল্পের লোকায়ত জীবনে যাহাদের আবেদন প্রত্যক্ষ। তাহা ছাড়া, দৈনন্দিন লৌকিক জীবনের নানা রূপও অনেকগুলি ফলকে উৎকীর্ণ-নৃত্যপরা নারী, মিথুনাসক্তা নরনারী, যষ্ঠিতে হেলান দিয়া দাঁড়ান বিশ্রামরত দ্বারপাল ইত্যাদি। ইহাদের সকলেরই বসনভূষণ স্বল্প ও নিরাভরণ; প্রকাশভঙ্গিমায় অন্তর্লেকের কোনো গভীর চিন্তা বা ভাবের অভিব্যক্তি নাই, নাই কোনও মার্জিত রুচি বা বিদগ্ধ গরিমার ব্যঞ্জনা। ইহাদের চালচলন ও মুখাবয়ব স্কুল এবং ক্ষেত্রবিশেষে অমার্জিত; দণ্ডায়মান ভঙ্গি বলিষ্ঠ, কিন্তু আড়ষ্ট’। পরিপূর্ণ সুগোল মুখমণ্ডলে, অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি ওষ্ঠে এবং বৃহৎবিস্ফারিত নয়ন যুগলে সহজ সরল্যময় লোকায়ত জীবনের আনন্দােজুল হাসির স্বাক্ষর; এই হাসি যেন একান্তই তাঁহাদেৱ নিজস্ব। কোথাও কোনও সূক্ষ্ম আড়াল রচনা নাই, কোনও কার্পণ্য নাই, সামগ্রিক জীবন যেন ইহাদের রূপায়ণে পূর্ণ অভিব্যক্ত! প্রাণের প্রাচুর্য এবং স্বাভাবিক গতিময়ত, সহজ অথচ পরিপূর্ণ ও অপরূপ প্রকাশ-মহিমাই এই ফলকগুলির শিল্পবৈশিষ্ট্য। শিল্পশাস্ত্র এবং প্রতিমালক্ষণ শাস্ত্রের নিয়ম-বন্ধন হইতে মুক্ত এই শিল্পদূষ্টি গভীর বস্তুচেতনায় প্রত্যক্ষ বাস্তব জীবন হইতে সমস্ত রস আহরণ করিয়াছে, প্রাত্যহিক জীবনের সুখদুঃখ, হাসিকান্না, রঙ্গকোলাহলময় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং নিশ্চিছদ্র গতিময়তাই এই শিল্পে জীবন সঞ্চার করিয়াছে। সাধারণ মানুষের লৌকিক ঘটনাবলী এবং তাঁহাদের অভিজ্ঞতাই এই শিল্পের উপজীব্য। আঙ্গিকের দিক হইতে এই শিল্পরূপ স্কুল অমার্জিত ও অসম্পূর্ণ কিন্তু মানবিকবোধে গভীর, জীবনের অভিব্যক্তিতে বিস্তারিত এবং শিল্পরসে তাৎপর্যময়।
এই প্রস্তর ফলকগুলির সঙ্গে পূর্বোক্ত অন্য দুটি শিল্পরূপ ও দৃষ্টির কোথায় কোনও মিল নাই; কিন্তু প্রাচীরগাত্রের অসংখ্য ও বিচিত্র মৃৎফলকগুলির রূপ ও দৃষ্টির সঙ্গে ইহাদের আত্মীয়তা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সমসাময়িক শিল্পেতিহাসে পাহাড়পুর বিহার-মন্দিরের প্রাচীর গাত্রের এই ফলকগুলি এক অপরূপ বিস্ময়। শুধু পাহাড়পুরেই নয়, ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষ হইতেও ঠিক একই ধরনের অসংখ্য মৃৎফলক সম্প্রতি আবিষ্কৃত হইয়াছে। সন্দেহ নাই, অন্যান্য বৃহদায়তন ও সমসাময়িক প্রাচীন মন্দির-বিহারের প্রাচীরগাত্রও এইভাবে মূৎফলকের আস্তরণে শোভিত ও অলংকৃত ছিল।
পাহাড়পুর ও ময়নামতীর লোকায়ত মৃৎশিল্প
পাহাড়পুর ও ময়নামতীর মৃৎফলক-কলার মৌলিক বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ লৌকিক এবং সাধারণ লোকায়ত কৃষিজীবনের মানস কল্পনাই ইহাদের মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। ইহারা রস আহরণ করিয়াছে লোকায়ত দৈনন্দিন জীবন হইতে; স্থিতি ও গতির বিভিন্ন অবস্থায় বস্তু ও প্রাণী জগতের সকল জিনিসকে সহজ আবেগময় দৃষ্টিতে দেখা এবং বিচিত্রভাব ও ভঙ্গিতে সেই দেখাকে অপূর্ব স্বচ্ছন্দ গতিময়তায় এবং নিছক বস্তু-ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করা, ইহাই যেন ছিল এই মৃৎশিল্পীদের শিল্পদর্শ। এই অসংখ্য ফলকগুলিকে সারি সারি ভাবে সাজাইয়া দেখিলে মনে হয়, লোকায়ত জীবন যেন এক বিচিত্ৰ শোভাযাত্রায় চলিয়াছে, যেন এই মৃৎশিল্পীরা অনুভূতি ও সচেতন বস্তু-অভিজ্ঞতার একপ্রাস্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অবিরত আন্দোলিত হইয়াছে এবং সেই আন্দোলন ফলকগুলির উপর প্রত্যক্ষ। ধৰ্মগত, উচ্চকোটিস্তরের ঐতিহ্যগত শিল্পের কোনও স্তরে এমন সুবিস্তৃত সামাজিক পরিবেশ, মানবিক কল্পনা ও অনুভূতির এমন বৈচিত্র্য, প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব ঘটনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে এমন গভীর সংযোগ, এমন স্বতোচ্ছসিত ভঙ্গিমা ও চালচলন, প্রকাশের এমন সজীব ও পরিপাটি ছন্দের পরিচয় সুদূর্লভ! গ্রাম্য মৃৎশিল্পীরা সুলভ আটাল মাটি লইয়া আনন্দচ্ছলে যে রূপ সৃষ্টি করিয়াছেন তাহাতে ‘সভ্য’, ‘ভদ্র’, অবসরপুষ্ট জীবনের পরিমিত সৌষ্ঠব বা মার্জিত রুচির পরিচয় বা উচ্চস্তরের ভাবানুভূতি, গভীরতর অধ্যাত্ম-ব্যঞ্জনা বা জটিল মননক্রিয়ার পরিচয় আশা করা অন্যায়; কিন্তু মানুষ ও প্রকৃতির বিস্তৃত লীলাক্ষেত্রের ক্ষুদ্রতম বৈশিষ্ট্য সম্পর্কের্তাহাদের যে গভীর চেতনা এবং জীবন সম্পর্কে তাহাদের যে শ্রদ্ধাশীল অভিনিবেশ এই ফলকগুলিতে অত্যন্ত সুস্পষ্ট তাহা কিছুতেই অস্বীকার করা চলে না। উচ্চকোটির ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় শিল্পসাধনার যে কোনও শ্রেণী বা স্তরে এই ধরনের শিল্পদূষ্টি দুর্লভ। সমসাময়িক বাঙলার লোকায়ত সামাজিক জীবনের যথাৰ্থ বস্তুময় স্পদিত পরিচয় এই ফলকগুলিতে যতটা পাওয়া যায়, প্রস্তর-প্রতিমাশিল্পে ততটা কিছুতেই নয়। রাজপ্রাসাদ ও অভিজাত-চক্রের পরিধি হইতে দূরে সাধারণ মানুষের নিত্যকোলাহলময় জীবনধারা কিভাবে প্রবাহিত হইত, সমসাময়িক ব্যক্তি ও সামাজিক মানসের কী ছিল প্রকৃতি তাহার পরিপূর্ণ অভিজ্ঞান এই মৃৎফলকগুলি।
