যাহাই হউক, সদ্যোক্ত রূপান্তরের সূচনার মুখে অথবা ক্লাসিক্যাল আদর্শের অবসাদ-কালের (আনুমানিক সপ্তম শতক) কয়েকটি প্রতিমা বাঙলাদেশেও পাওয়া গিয়াছে। ইহাদের মধ্যে তিনটি ধাতব মূর্তি উল্লেখযোগ্য : একটি দেবখড়্গ-মহিষী প্ৰভাবতীর লিপি-উৎকীর্ণ অষ্টধাতুনির্মিত সর্বাণী-দেবীমূর্তি, প্রাপ্তিস্থান ত্রিপুরা জেলার দেউলবাড়ী গ্রাম। দ্বিতীয়টি স্বল্পায়তন, প্রায় পুতুলাকৃতি বলিলেই চলে; ইহারও প্রাপ্তিস্থান দেউলবাড়ী গ্রাম (ঢাকা-চিত্রশালা); শিল্পবিষয় রথােপরি উপবিষ্ট সপ্তাশ্ববাহিত সূর্য। তৃতীয়টি ব্রোঞ্জধাতুনির্মিত একটি দণ্ডায়মান শিবপ্রতিমা; প্রাপ্তিস্থান ২৪—পরগণা জেলার মণিরহাট গ্রাম (অজিত ঘোষ-সংগ্ৰহ, কলিকাতা)। পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকীয় গুপ্ত-তক্ষণশিল্পে প্রতিমারূপের যে রূপান্তর পরবর্তীকালে দেখা যায় তাহা এই তিনটি নিদর্শনেই সুস্পষ্ট। সর্বাণী মূর্তিটির পরিকল্পনার ও রূপায়ণ তো স্পষ্টই পরবর্তী পাল শিল্পের পূর্বধ্বনিমাত্র; ইহার ঋজু ও আড়ষ্ট দেহভঙ্গি এবং কাঠামোর বিন্যাস এ-সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহই রাখে না। স্বল্পায়তন সূর্য-প্রতিমাটি সম্বন্ধেও প্রায় একই কথা বলা চলে। শিবমূর্তির গড়ন ও ডোলে গুপ্ত-বৈশিষ্ট্য এখনও তাহার কিছু স্বাক্ষর রাখিয়াছে, কিন্তু সেই স্বচ্ছ ও সূক্ষ্ম দীপ্তি আর নাই, সেই যোগনিবদ্ধ দৃষ্টি বা ভাবের নৈর্ব্যক্তিক পরিচয়ও আর নাই। গুপ্ত-মূর্তিকলার সুবর্ণযুগ অস্তমিত; পরবর্তী পাল-আমলের নবতর রীতি ও রূপাদর্শের সূচনা যেন দেখা যাইতেছে।
প্রাচ্য-ভারতীয় মূর্তিকলার এই পর্যায়ের কয়েকটি নিদর্শন এবং তাহার প্রভাবযুক্ত কয়েকটি প্রতিমা পাহাড়পুর-মন্দিরের ভিত্তিগাত্রেও দেখা যায়। কিন্তু পাহাড়পুর-মন্দিরের শিল্পকলা আরও নানাদিক হইতে উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন বাঙলার অন্তত সুদীর্ঘ দুই শতাব্দীর সাংস্কৃতিক মানসের পূর্ণতর অভিব্যক্তি এই বিহার-মন্দিরের তক্ষণ-রূপায়ণে ভাষালাভ করিয়াছে। পাহাড়পুর-শিল্প এই কারণেই বিস্তৃততর আলোচনার দাবি রাখে।
পাহাড়পুরের বৌদ্ধ-বিহার মন্দির নির্মিত হইয়াছিল খ্ৰীষ্টীয় অষ্টম শতকের মধ্যভাগে নরপতি ধর্মপালের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু তাহান্ন আগেও এখানে বোধ হয় কোনও ব্রাহ্মণ্য-মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং তাহার কিছু কিছু প্রতিমা-নিদর্শনও পরবর্তী বিহার-মন্দিরের ভিত্তিগাত্ৰসজ্জায় ব্যবহৃত হইয়া থাকিবে। বিহার-মন্দিরটির বিভিন্ন স্তরের চারিদিকের প্রাচীরগাত্ৰ অগণিত মৃৎফলকে ঢাকা; তাহা ছাড়া ভিত্তিগাত্ৰসজ্জায় উৎকীর্ণ প্রস্তরফলক ও প্রচুর ব্যবহার করা হইয়াছে (বর্তমান সংখ্যা ৬৩)। মৃৎফলকগুলির কথা পরে বলিতেছি। প্রস্তরফলকগুলি সম্বন্ধে গোড়ায়ই বলা প্রয়োজন যে, এই ৬৩টি প্রস্তরফলক সবই যেমন এক যুগের নয় তেমনই নয় একই শিল্পীরীতি ও আদর্শের।
পাহাড়পুর মন্দিরের প্রস্তরশিল্পে তিন ধারা
এই প্রস্তর-ফলকগুলির মধ্যে এক ধরনের ফলক দেখিতেছি। যাহাদের ভঙ্গি, বিষয়বস্তু ও শিল্পদূষ্টি একান্তই প্রতিমালক্ষণ শাস্ত্রদ্বারা নিয়মিত; ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর রূপায়ণই তাঁহাদের উদ্দেশ্য। ভঙ্গি-মর্যাদায়, সৌষ্ঠবে এবং রুচিবোধে। ইহার যে-পরিচয় বহন করে তাহা অবসরপুষ্ট ব্ৰাহ্মণ্যধর্মশ্রিত সমাজের উচ্চতর বর্ণ ও শ্রেণী:স্তরের। এই দৃষ্টি ও রীতির স্বাক্ষর পড়িয়াছে কয়েকটি ফলকেই, বিশেষভাবে রাধাকৃষ্ণ (?)-মিথুনমূর্তি, যমুনা, শিব এবং বলরামের অনুকৃতিতে। ইহাদের মধ্যে ষষ্ঠ-সপ্তম শতকীয় পূবী গুপ্ত-শিল্পদ্ধৃষ্টি ও রীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। সেই সুকুমার দেহভঙ্গি , সূক্ষ্ম পেলাব গড়ন এবং নমনীয় ডোলের ঐতিহ্য এখনও বিস্মৃতিতে ঢাকা পড়ে নাই। নির্মাণকলার কোমল সংবেদনশীল রূপায়ণ তো আছেই; তাহা ছাড়া, ইহাদের বসনভূষণের সৌষ্ঠব, গড়ন এবং বিন্যাসেও গুপ্তাদর্শের মার্জিত রুচি ও সূক্ষ্মবোধ প্রত্যক্ষ। কিন্তু তাহার চেয়েও বেশি প্রত্যক্ষ মধ্য-গাঙ্গেয়ভূমির গুপ্তযুগীয় শিল্পদূষ্টির স্বচ্ছ দীপ্তি এবং তাঁহারই পূর্বাঞ্চলিক ঐতিহ্যের ভাবালুতা এবং ইন্দ্রিয়পরতা। বস্তুত, রাজগীর-মণিয়ার মঠের মূর্তিগুলির সঙ্গে এবং মহাস্থানে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জধাতুনির্মিত মঞ্জুশ্ৰীমূর্তির শিল্পপৃষ্টি ও রীতির সঙ্গে এই ফলকগুলির আত্মীয়তা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আমার বিশ্বাস, এই ফলকগুলি ষষ্ঠ শতকীয় এবং সমসাময়িক কোনও মন্দির সজ্জায় ইহারা ব্যবহৃত হইয়াছিল; পরবর্তীকালে পূর্বতন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ হইতে আহরণ করিয়া অষ্টম শতকীয় পাহাড়পুর বিহার-মন্দিরের ভিত্তিগাত্ৰসজায় আবার ইহাদের ব্যবহার করা হইয়াছে।
এই দৃষ্টিরই স্কুল, রূঢ়, শিথিল, গুরুভার, প্রাকৃত রূপায়ণ দেখিতেছি প্রায় ১৫/১৬টি ফলকে। ইহাদেরও বিষয়বস্তু ব্ৰাহ্মণ্য দেবদেবী এবং ইহাদের শিল্পরূপও প্রতিমালক্ষণ শাস্ত্রদ্বারা নিয়মিত। স্থূল, গুরুভার গড়নই ইহাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দুই একটি মূর্তিতে একটু গতিময়তার আভাস থাকিলেও একটা রূঢ় আড়ষ্টতা কিছুতেই দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়। হ্রস্বদেহ, দণ্ডায়মান মূর্তিগুলির দেহভঙ্গির অনমনীয়তার ফলে মনে হয়, স্কুল পদযুগল যেন দুইটি স্তম্ভের মতো একটি গুরুভার দেহকে কোনও মতে পতন হইতে রক্ষা করিয়াছে। গুপ্ত-শৈলীর অপরূপ সূক্ষ্ম রেখাপ্রবাহের এবং স্বচ্ছ নমনীয় ডোলের কোনও চিহ্ন আর অবশিষ্ট নাই। অর্ধচন্দ্ৰাকৃতি, প্রশস্ত ও গুরুভার মুখমণ্ডলে দীপ্তি ও ভাব-লাবণ্যযোজনার বিশেষ কোনও লক্ষণ প্রায় অনুপস্থিত। সন্দেহ নাই, এই ফলকগুলি এমন সব শিল্পীর রচনা যাঁহারা প্রতিমা-লক্ষণ জানিতেন, ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুশাসন মানিতেন, কিন্তু যাহাদের অন্তর্নিহিত ভাব ও রসের যথার্থ কোনও বোধ ও বুদ্ধি ছিল না, যাহারা গুপ্ত-শৈলীর মূর্তিকলার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তাহার রূপ-ভাবনা এবং আঙ্গিকের উপর কোনও অধিকারই যাঁহাদের ছিল না। খুব সম্ভব, এই ফলকগুলির শিল্পীদের পাথর কুঁদার অভিজ্ঞতাও বিশেষ ছিল না, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকদের আদেশে ও প্রয়োজনানুরোধে এই কার্যে তাঁহাদের ব্ৰতী হইতে হইয়াছিল। রূপসৃষ্টির আনন্দের কোনও চিহ্নই যেন ফলকগুলিতে নাই। কালের দিক হইতে ইহারাও ষষ্ঠ-সপ্তম শতকীয় এবং লক্ষণীয় এই যে, এই ফলকগুলিতে পরবর্তী পাল-আমলের ফলক রচনা-বিন্যাসের পূর্বাভাস সুস্পষ্ট; কিন্তু ষষ্ঠ-সপ্তম শতকীয় পূর্ব শিল্পীরীতির সুচারু ডোল, সুষ্ঠ গড়ন, বা ভঙ্গির ব্যঞ্জনা ইহাদের মধ্যে নাই। গুপ্ত-শৈলীর মার্জিত সংস্কৃত রূপের সঙ্গে ইহাদের দূরত্ব অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
