সুলতানগঞ্জের ব্রোঞ্জ বুদ্ধ-মূর্তিতে অথবা রাজগীর মণিয়ার-মঠের প্রতিমাগুলিতে সারনাথ শৈলীর যে পূর্বাঞ্চলিক ভাষা প্রত্যক্ষ, সেই ভাষারূপ কতকটা ধরা পড়িয়াছে। বগুড়া জেলার দেওয়া গ্রামে প্রাপ্ত সূর্যমূর্তিটিতে। আনুমানিক ষষ্ঠ শতকীয় এই প্রতিমাটির বলিষ্ঠ ত্ৰিবলীচিহ্ন, অলংকার-বিরলতা, কাঠামোর দৃঢ় সংযত সারল্য, চক্রাকার প্রভামণ্ডল এবং আঙ্কন্ধবিলম্বিত তরঙ্গায়িত কেশগুচ্ছ নিঃসন্দেহে মধ্য-গাঙ্গেয় গুপ্ত-ঐতিহ্য ও লক্ষণের দ্যোতক, কিন্তু ইহার মাংসল দেহের কাবোঞ্চ সংবেদনের মধ্যে এবং চক্ষুর নিম্নতটে ও নিম্নোণ্ঠের তীব্ৰ গাঢ় ছায়ার মধ্যে পূর্বাঞ্চলিক দেহমাধুর্যবেদনও সমান প্রত্যক্ষ।
সুন্দরবন-কাশীপুরে প্রাপ্ত সূর্য প্রতিমাটিতেও (আশুতোষ-চিত্রশালা) মার্জিত রসবোধ ও অধ্যাত্ম-চেতনার আভাস দৃষ্টিগোচর। এই প্রতিমাটিতে গুপ্ত শৈলীর সদ্যোক্ত পূর্বাঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য যতটা ধরা পড়িয়াছে, বাঙলায় প্রাপ্ত আর কোনও প্রতিমাতেই এমন সুস্পষ্ট হইয়া তাহা ধরা পড়ে নাই। কালবিচারে কাশীপুরের প্রতিমাটি হয়তো দেওড়ার প্রতিমাপেক্ষা প্রাচীনতর, কিন্তু গঠন সৌষ্ঠবে কাশীপুর-সূর্য অনেক বেশি মার্জিত, দৃষ্টি ও কল্পনার গভীরতর এবং অনুভবে বেশি পেলাব ও সংযত। আকৃতি এবং প্রকাশভঙ্গির দিক হইতেও সাদৃশ্য এবং প্রমাণবোধ অধিকতর সাঁচ’তৰুণ।
বলাইধাপ স্তূপের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে প্রাপ্ত ব্রোঞ্জধাতু-নির্মিত স্বর্ণপত্ৰমণ্ডিত মঞ্জুশ্ৰী-প্রতিমাটিতেও পূর্বাঞ্চলিক আবেগময়তা এবং ডৌল ও গঠনরীতির উষ্ণ সংবেদনশীলতা সমান প্রত্যক্ষ। সুপূর্ণ মাংসল মুখমণ্ডল, স্থূল নিম্নোষ্ঠ, বঙ্কিমায়িত করাঙ্গুলির ক্রমহ্রস্বায়মান সূক্ষ্মাগ্র এবং সুকুমার দেহ-কাঠামোর মধ্যে সমস্ত অঙ্গের পেলাব সচেতনতা যেন দানা বাধিয়াছে; দেহ-ডৌলের সঙ্গে বসনের ঘনিষ্ঠতা, অলংকার-বিরলতা, সহজ ও অনাড়ম্বর প্রকাশভঙ্গি সমস্তই পূর্বাঞ্চলিক গুপ্ত শৈলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তায় আবদ্ধ।
মুর্শিদাবাদ-মালার গ্রামে প্রাপ্ত চক্ৰপুরুষের একটি মূর্তিও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য (বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ-চিত্রশালা)। এই মূর্তিটির ডোলে, গড়নে এবং রচনাবিন্যাসে গুপ্ত শৈলীর পূর্বাঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। তবে, বালিপাথরে গড়া এই প্রতিমাটির গড়নে দেহ-ডৌলের সেই সূক্ষ্মতা ও ভাবব্যঞ্জনা ততটা ধরা পড়ে নাই।
স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকীয় বাঙলার তক্ষণ-শিল্পের সাধারণ লক্ষণ ও প্রকৃতি সমসাময়িক উত্তর-গাঙ্গেয় ভারতের শিল্প-লক্ষণ ও প্রকৃতির সঙ্গে ঐক্যসূত্রে গাঁথা। সারনাথ-শৈলীর প্রভাব সুস্পষ্ট ও অনস্বীকার্য, কিন্তু তাহার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাঞ্চলিক আবেগ-প্রাধান্য এবং স্থানীয় বৈশিষ্ট্যও সমান প্রত্যক্ষ। এ-তথ্য লক্ষণীয় যে, এই পর্বে গুপ্ত-শৈলীর যে-কটি নিদর্শন বাঙলাদেশে পাওয়া গিয়াছে তাহার অধিকাংশই উত্তরবঙ্গে বা প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন হইতে। কিন্তু উত্তরবঙ্গই হউক আর সুন্দরবনই হউক, তেজপুরই হউক আর বাঁকুড়াই হউক, সর্বত্রই মূলগত একটি ধারা প্রত্যক্ষ এবং সে—ধারা প্রধানত মধ্য-গাঙ্গেয় গুপ্ত শৈলীর ধারারই স্থানীয় রূপ।
বিবর্তন
তৃতীয়-চতুর্থ শতকে উত্তর-ভারতীয় মনন ও কল্পনা মথুরা-বুদ্ধগয়ার যে রূপ-প্ৰচেষ্টায় স্বপ্রকাশ পঞ্চম শতকে সারনাথ-উদয়গিরি-মথুরাতে তাহার পূর্ণ পরিণতি। সূক্ষ্মতম বোধ, গভীরতম ধ্যান ও চরমতম জ্ঞানের এমন সুনিপুণ অঙ্গসৌষ্ঠবময় সুকৌশলী প্রকাশ শুধু ভারতীয় শিল্পে কেন, পৃথিবীর তক্ষণ শিল্পেই বিরল। সমসাময়িক সারনাথ ক্লাসিক্যাল শিল্পের শিখরচুড়ায় আসীন; ইহার পর এই শিল্পদর্শ ও রীতিতে অলব্ধ, অনাবিষ্কৃত আর কিছু ছিল না। সব সন্ধান যখন নিরস্ত ও নিঃশেষিত, সুচিরচেষ্টত সাফল্য যখন আয়ত্ত তখন কিছুকাল কাটে সাফল্যের দীপ্তি ও গরিমার মধ্যে; তারপর দেখা দেয় ক্লাপ্তি ও অবসাদ এবং তাহার পরের স্তরেই নিদ্ৰালু বিবশতা। ষষ্ঠ শতকের শেষার্ধ হইতেই উত্তর-ভারতীয় তক্ষণ-শিল্পে এই বিবশতা দেখা দিতে আরম্ভ করে এবং সমগ্র সপ্তম শতক জুড়িয়া তাহার আভাস সুস্পষ্ট। অন্যদিকে এই সময়েই আবার নবতর শিল্প-প্রেরণাও ধীরে ধীরে রূপ গ্ৰহণ করে। এই নবতর রীতি বা আদর্শের প্রেরণা কোন মূল, কোন উপাদান হইতে সঞ্চারিত হইয়াছিল বলা কঠিন। শতাব্দী-সঞ্চারিত ইতিহাসের নানা আবর্তে, নানা ঘটনা ও আদর্শের সংঘাতে, নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিলন-বিরোধের ফলে শিল্পে ও সাহিত্যে নূতন নূতন রীতি ও আদর্শের উদ্ভব ঘটে। এই সব আবর্ত ও সংঘাত মিলন ও বিরোধের পুঙ্খানুপুঙ্খ সকল কথা আজও আমরা জানি না এবং তাহার ফলে আমাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিতে কী কী রূপান্তর খটিয়াছিল তাহাও সুনশ্চয় করিয়া বুলিবার উপায় নাই।
খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতক হইতেই মধ্য-এশিয়ার নানা যাযাবর জাতি ভারতবর্ষের বুকে আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিতে আরম্ভ করে : প্রথম তরঙ্গে যুয়ে-চি-শক-কুষাণ, দ্বিতীয় ও তরঙ্গে আভীর (দ্বিতীয় তৃতীয় শতক), তৃতীয় তরঙ্গে তুণ (পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতক)। এবং চতুর্থ তরঙ্গে গুজর-গুর্জর ও তুরুষ্কবা (সপ্তম-নবম শতক)। ইহারা প্রত্যেকেই এক একটি বিশেষ সংস্কৃতির বাহক ছিলেন, সন্দেহ নাই; কিন্তু বহু দিন সেই সংস্কৃতির কোনও সুস্পষ্ট সুগভীর স্বাক্ষর ভারতবর্ষে দেখা যায় নাই; বলবত্তর স্থানীয় রীতি ও আদর্শকে অতিক্ৰম করিয়া তাহা নিজকে ব্যক্ত করিবার সুযোগও বিশেষ পায় নাই, শক্তিও হয়তো ততটা ছিল না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাহা যে পুরাতন ভারতীয় রীতি ও আদর্শকে রূপান্তরিত করিতেছিল, অন্তত শিল্পাদর্শের ক্ষেত্রে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়, তাহার প্রমাণ ইতস্তুত বিক্ষিপ্ত। অষ্টম শতক হইতে ভারতীয় ভাস্কর্যে, প্রাচীরচিত্রে ও অন্যান্য শিল্পে তাহার স্বাক্ষরও ক্রমশ সুস্পষ্ট হইয়া দেখা দিতে আরম্ভ করে। কিন্তু এ-সব কথা আলোচনার অবসর এ-গ্ৰন্থ নয়। তাহা ছাড়া, সপ্তম শতক হইতে নেপাল ও ভোটদেশ বা তিব্বতের সঙ্গেও মধ্য ও প্রাচ্য ভারতের একটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপিত হয় এবং প্রাচীন কিরাত বা বোডো সংস্কৃতির কিছু কিছু প্রভাবও অষ্টম শতক হইতেই ক্ল্যাসিক্যাল সংস্কৃতির অবসাদের ফলে স্থানীয় লোকায়ত সংস্কৃতি উচ্চকোটির সংস্কৃতি ছাপাইয়া ব্যক্ত করিবার সুযোগ লাভ করে। এই সব রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রবাহের সম্মিলিত প্রভাব ভারতীয় জীবন, মনন ও কল্পনাকে, রাষ্ট্র ও সমাজবিন্যাসকে কিভাবে কতদূর রূপান্তরিত করিয়াছিল তাহা লইয়া আলোচনা-গবেষণা আজও বিশেষ হয় নাই। তবে, সপ্তম-অষ্টম-নবম শতকে উত্তর-ভারতীয় ইতিহাসের যে দিক পরিবর্তন এবং সর্বতোভদ্র রূপান্তর সকল ঐতিহাসিকই লক্ষ্য করিয়াছেন তাহার মূলে এই সব প্রভাব কিছুটা সক্রিয় ছিল তাহাতে আর সন্দেহ কী! এই রূপান্তরেরই আর এক অর্থ, ক্ল্যাসিকাল যুগের অবসান ও মধ্যযুগের সূচনা। কোনও বিশেষ রাষ্ট্ৰীয় ঘটনা মধ্যযুগের সূচনা করে নাই; কোনও নির্দিষ্ট সন-তারিখও নয়। সভ্যতা ও সংস্কৃতির, রাষ্ট্র ও সমাজের যে প্রকৃতি ও আদর্শ দ্বারা মধ্যযুগ চিহ্নিত, জন-সংঘাতের ফলে সেই প্রকৃতি ও আদর্শ কয়েক শতাব্দী ধরিয়াই ভারতীয় জীবনের নানা ক্ষেত্রে দেখা দিতেছিল এবং জৈব নিয়মের বশেই তাহা ধীরে ধীরে লালিত ও বধিত হইতেছিল। উত্তর-ভারতের ইতিহাসে অষ্টম-নবম-দশম শতক সেই লালন-বর্ধনের যুগ।
