পোড়ামাটির এই ফলকগুলি ছাড়া কতকটা কুষাণ শিল্পশৈলীর স্বল্পায়তন কয়েকটি পাথরের মূর্তিও বাঙলাদেশে পাওয়া গিয়াছে। লক্ষণীয় এই যে, সব ক’টিই উত্তরবঙ্গীয় এবং কুষাণ শিল্পশৈলীর কেন্দ্ৰ মথুরার স্থানীয় লাল বালি-পাথরে তৈরি নয়। সেই জন্যই এ-অনুমান স্বাভাবিক যে, মূর্তিগুলি রচিত হইয়াছিল সমসাময়িক বাঙলাদেশেই। ইহাদের মধ্যে দুইটি সূর্যমূর্তি পাওয়া গিয়াছে রাজশাহী জেলার নিয়মতপুর গ্রামে; একটি বিষ্ণুমূর্তি, প্রাপ্তিস্থান মালদহ জেলার হাকরাইল গ্রাম। তিনটি মূর্তিরই অঙ্গরচনা ও বিন্যাস, রেখা ও ডোল, গতি ও গড়ন একই প্রকার। রচনার ও শিল্পদূষ্টির আপেক্ষিক স্থূলতা সত্ত্বেও মথুরার কুষাণ ও শক(?)-রাজাদের মর্মর প্রতিকৃতিগুলির সঙ্গে ইহাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। সে-আত্মীয়তা মূর্তি তিনটির অঙ্গরেখার আকৃতি-প্রকৃতি এবং গড়নেও সুস্পষ্ট। অথচ, ইহারা শক-কুষাণ শিল্পীদের রচনা এ-কথা কিছুতেই বলা চলে না; বরং ইহাদের অঙ্গভঙ্গির আড়ষ্টতা এবং গ্রাম্য অনাড়ম্বর প্রকাশ একান্তই আঞ্চলিক। আসল কথা, মধ্যদেশে উচ্চকোটি স্তরে যখন যে শিল্পশৈলীর প্রসার ও প্রচলন তাহার অন্তত কিছুটা তরঙ্গাভিঘাত স্তিমিত বেগে বাঙলাদেশেও আসিয়া লাগিয়াছে; এই মূর্তিগুলিতে তাহারই স্বাক্ষর কতকটা স্থানীয় রূপ ও রুচিদ্বারা প্রভাবিত হইয়া দেখা দিতেছে। বাঙলাদেশে কিছু কিছু কুষাণমুদ্রা পাওয়া গিয়াছে; এবং মুরুগু কোমের লোকেরা বোধ হয় প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের বাঙলাদেশে এক্লেবারে অজ্ঞাত ছিলেন না। কাজেই বাঙলার শিল্পের এই পর্বে শক-কুষাণ শিল্পীরীতির কিছুটা প্রভাব দেখা যাইবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়।
দিনাজপুর জেলার বাণগড়ের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে প্রাপ্ত এবং বর্তমানে কলিকাতা আশুতোষ-চিত্রশালায় সংরক্ষিত কয়েকটি ক্ষুদ্রাকৃতি পোড়ামাটির ফলকে গুপ্তপূর্ব মথুরার, সাধারণভাবে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকার শিল্পশৈলীর লক্ষণও সুপরিস্ফুট। মথুরার নারী-মূর্তিগুলির দেহবিলাসের সচেতনতা ও অভিজাত সংবেদন বাণগড় ফলকের নারীমূর্তিগুলিতে নাই, কিন্তু প্রশস্তমেখলা, পীনপয়োধরা এবং অলংকারবহুলা এই নারীদের অঙ্গবিন্যাস একান্তই সেই মধ্যদেশীয় ধারাই অনুসরণ করিয়াছে, বিশেষভাবে মথুরা অঞ্চলের এবং এই হিসাবে ইহারা পূর্বোক্ত মহাস্থান-পোখরুণা-তাম্রলিপ্তির ফলক-চিত্রিত নারীদেরই বংশধর। তবে বাণগড়ের এই স্বল্পাকৃতি নারীমূর্তিগুলিতে সমসাময়িক ও ভাবীকালের ইঙ্গিতও সমান প্রত্যক্ষ। সে-ইঙ্গিত প্রকাশ পাইয়াছে ইহাদের ঈষাদানত পয়োধরের মসৃণ ডোলে, সুডৌল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, গড়নের আপেক্ষিক মসৃণতায় এবং সৌকুমার্যে। ইহাদের মধ্যে যেন গুপ্ত আমলের রুচি ও রূপাদর্শের দূরাগত ক্ষীণ পদধ্বনি শোনা যাইতেছে।
গুপ্ত-পর্বের বৈশিষ্ট্য
মথুরার শক-কুষাণ তক্ষণ শেলীর কালগত স্বাভাবিক পরিণতি৯ গুপ্তপর্বের তক্ষণশৈলীতে। গুপ্ত-শিল্পকলার প্রধান কেন্দ্র ছিল সারনাথ, কিন্তু প্রভাবের ও ঐতিহ্যের বিস্তৃতি ছিল পূর্বপ্রান্তে তেজপুর হইতে পশ্চিমে গুজরাট-মহারাষ্ট্র পর্যন্ত এবং কাশ্মীর হইতে আরম্ভ করিয়া দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত। মথুরার ভারী, দৃঢ়, স্থূল, একান্ত ইহগত এবং সূক্ষ্মানুভূতিবিহীন বুদ্ধ-বোধিসত্ত্বই ক্রমশ গুপ্ত আমলের সূক্ষ্ম, মার্জিত, পেলাব, ধানকেন্দ্রিক, যোগগৰ্ভ বুদ্ধবোধিসত্ত্ব মূর্তিতে, বিষ্ণুমূর্তিতে রূপান্তর লাভ করে। এই রূপান্তরের মধ্যে সমগ্র ভারতীয় বুদ্ধি ও কল্পনার, মনন ও সাধনার সুগভীর ও সুবিস্তৃত ইতিহাস বিধৃত; কিন্তু তাহার আলোচনা এ-প্রসঙ্গে অবাস্তর। মথুরার বৃহদায়তন মূর্তিগুলি প্রভূত মানবিক দৈহিক শক্তির দ্যোতক; গুপ্ত—আমলের অর্থাৎ পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকীয় সারনাথের বুদ্ধবোধিসত্ত্বের মূর্তিগুলির আপেক্ষিক আয়তন হ্রস্ব, কিন্তু ইহাদের মানবিক রূপ ও ভঙ্গি ধ্যানযোগের এবং স্বচ্ছতর মনন-কল্পনার স্পর্শে এক অতি সূক্ষ্ম সংবেদনময় অপরূপ অধ্যাত্মভাব ও অলৌকিক ব্লসের দোতক হইয়া উঠিয়াছে।
সারনাথের প্রভাব পূর্বাঞ্চলে আসামের তেজপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, এ-কথা আগেই বলিয়াছি। এই প্রভাবের ধারাস্ৰোত বাঙলাদেশের উপর দিয়াই বহিয়া গিয়াছে, সন্দেহ নাই; কিন্তু বাঙলাদেশে প্রাপ্ত সমসাময়িক মূর্তির সংখ্যা খুব বেশি নয়। বিহারৈল গ্রামে প্রাপ্ত চুনারের বালি-পাথরে রচিত একটি বুদ্ধ-প্রতিমায় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকীয় সারনাথের প্রতিধ্বনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এই মূর্তিটির মসৃণ, মার্জিত রমণীয় ডোল, সুকুমার অঙ্গ-বিন্যাস ও সৌষ্ঠব, শাস্ত সৌম্য ধ্যানগম্ভীর দৃষ্টি এবং রেখা-প্রবাহের ধীর সংযত গতি একান্তই সমসাময়িক মধ্য-গাঙ্গেয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির দান। গভীর ধ্যানলব্ধ আনন্দের চরম জ্ঞান ও উপলব্ধির, পরম পরিতৃপ্তির সহজ, সংযত ও মার্জিত প্ৰকাশই সারনাথশৈলীর বৈশিষ্ট্য; এবং এই বৈশিষ্ট্যই সারনাথের বুদ্ধ-প্রতিমাকে বিহারের সুলতানগঞ্জের বুদ্ধ-মূর্তি অপেক্ষা অথবা রাজগীরের মণিয়ার-মঠে দেহ-সচেতন, সুন্দর, পেলাব মূর্তিগুলি অপেক্ষা অধিকতর কৌলীন্য দান করিয়াছে। বিহাৱৈল প্রতিমাটি এই হিসাবে যেন সারনাথ-শৈলীরই একটি স্থানীয় রূপ, একটু কম সূক্ষ্ম, একটু কম পেলাব।
