তাহা ছাড়া, ঘরে বসিয়া বা চিত্রশালায় ঘুরিয়া আমরা ইহাদের যে-রােপ প্রত্যক্ষ করি তাহা ইহাদের উদ্দিষ্ট রূপও তো নয়। যে-মূর্তির পূজা হইত। তাহা থাকিত গর্ভগৃহের অন্ধকারে বেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত; তাহার উপর পাড়িত প্ৰদীপের ক্ষীণ আলো। সেই প্রায়ান্ধকারে স্তিমিত আলোর জ্যোতির মধ্যে ভক্ত ও পূজারীর সম্মুখে দেবতা ধীরে ধীরে জাগিয়া উঠিতেন— নিবাতনিষ্কম্প শিখার পেলাব আলোয় প্রস্তরীভূত দেহে ধীরে ধীরে প্রাণের স্পর্শ লাগিত, দেহের রেখা ও ভঙ্গি ধূপের ধোয়ার মধ্যে ধরা-অধরার দোলায় দূলিত। তাহারই ভিতর দেবতার মুখমণ্ডল থাকিত স্থির ও আচঞ্চল। শিল্পীর এই তথ্য অজানা ছিল না; এবং সেই অনুযায়ীই তিনি পূজাবেদীর উদ্দিষ্ট মূর্তির রূপ-কল্পনা করিতেন এবং কল্পনা ও ধ্যানানুযায়ী পাথরে বা ধাতুতে সেই রূপ ফুটাইয়া তুলিতেন, যে-রূপ কালজয়ী, যে-রূপ মানুষের মৌলিক ভাবনা-কামনার উপর প্রতিষ্ঠিত। আর, যে-সব মূর্তি ও অলংকরণ থাকিত মন্দিরের বাহিরে প্রাচীর-গাত্রে তাঁহাদের রূপ-কল্পনা অন্য প্রকারের, অন্য দৃষ্টির; কারণ, তাহাদের উপর পাড়িত সারাদিনের সূর্যের আলো, কখনো রক্তিমাভায়, কখনো ছায়ায়, কখনো প্ৰদীপ্ত কিরণবাণে। সেখানে নিত্য সংসারের অফুরন্ত লীলা; দেবতা-মানুষ – পশুপক্ষী-গাছপালা সকলে মিলিয়া অনন্তকাল ধরিয়া যে-জীবনলীলায় মাতিয়াছে তাহারই গতিময় ভঙ্গিমা, ছন্দিত ছবি। তাহার উপর কালাতীত জীবনের স্বাক্ষর যেমন সুস্পষ্ট তেমনই সুস্পষ্ট কালধূত জীবনের হস্তাবলোপ। কোনোটিই উপেক্ষার বস্তু নয়। অথচ, ঘরে বা চিত্ৰশালায় ইহাদের সেই উদ্দিষ্ট রূপ ধরা পড়িবার উপায় একেবারেই নাই, এমন কি সাম্প্রতিক কালের চেতনা-কল্পনার মধ্যেও তাহা নাই। ধৰ্মগত ও সামাজিক, স্থানগত ও কালগত, অর্থ ও উদ্দেশ্যগত সমস্ত পরিবেশ হইতে বিচ্যুত হইয়া আজ ইহাদের মূল্য শুধু আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, হয়। ইহাদের নন্দনত্ব গুণে, না হয় প্রতিমা-লক্ষণের অভিজ্ঞানে। অথচ, সেই নন্দনত্ব সবটুকু আমাদের চোখে ধরা পড়িতেছে না!
সাধারণ ভাবে এই কয়েকটি কথা মনে রাখিয়া প্ৰাচীন বাঙলার তক্ষণ-শিল্পালোচনা আরম্ভ করা যাইতে পারে। এই উষ্ণ, জলীয়, বৃষ্টিস্নাত, নদীবিধৌত বাঙলাদেশে সুপ্রাচীন নিদর্শন যে পাওয়া যাইতেছে না, তাহা কিছু অস্বাভাবিক নয়; অন্যান্য কারণের ইঙ্গিত আগেই দিয়াছি। খ্রীষ্টোত্তর ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের আগেকার নিদর্শন যাহা পাওয়া গিয়াছে, সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন, এ-ক্ষেত্রেও তাহা স্বল্পই। স্বল্পতার প্রধান কারণ, দেশের মাটি ও জলবায়ু, পাথরের অপ্রাচুর্য, যথাযথ খননবিষ্কারের অভাব, কিন্তু সর্বোপরি যে-কারণ ছিল সক্রিয় তাহা ঐতিহাসিক। প্রাচীন বাঙলাদেশে আর্য-সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ স্পৰ্শ খ্রীষ্টোত্তর পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকের আগে ভালো করিয়া লাগেই নাই এবং সেই সংস্কৃতির কেন্দ্ৰস্থল। মধ্যদেশের সঙ্গে যোগাযোগও খুব ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠে নাই। তাহার আগে আদিম কোম-সন্নিবিষ্ট রাঢ়-পূণ্ড-সুহ্ম-বঙ্গ প্রভৃতি জনপদ নিজেদের সমাজ-সংস্থা, নিজেদের শিল্প ও সংস্কৃতি, নিজেদের জীবনযাত্রা লইয়া ভারতবর্ষের এক ধারে পড়িয়াছিল আৰ্য্যমনের অবজ্ঞা ও অজ্ঞতায়। মাঝে মাঝে আর্যীকরণের এবং ভারতবর্ষের সামগ্রিক জীবনধারার স্রোতের মধ্যে টানিয়া আনিবার চেষ্টা যে হয় নাই, এমন নয়; কিন্তু আদিম কৌম মনের স্বাভাবিক প্রবণতাই ছিল সে-স্রোতকে যতটা সম্ভব ঠেকাইয়া রাখা। এই সব কৌম নরনারীর নিজেদের শিল্প কিছু ছিল না। এমন নয়; কিন্তু আগেই বলিয়াছি, সে-সব শিল্পের উপাদান-উপকরণ ছিল ক্ষীণজীবী- মাটি, খড়, বাশ, বড় জোর কাঠ। কাজেই সে-সব নিদর্শন কালের ও প্রকৃতির হাত এড়াইয়া আমাদের কালে আসিয়া পৌছায় নাই, যদিও তাহাদের ঐতিহা ও প্রাণশক্তির প্রাচুর্য আজও অব্যাহত। ভারতবর্ষে আমরা পাথর কুঁদিতে শিখিয়াছি মাত্র মৌৰ্য-আমলে বা হয়তো তাহার কিছু আগে; কিন্তু সেই শিক্ষা বাঙলাদেশে আসিয়া পৌঁছতে এবং বহুল প্রচলিত হইতে আরও কয়েক শত বৎসর লাগিয়াছিল। ধাতু। গলাইয়া মূর্তি গড়িবার কৌশল বোধ হয় শিখিয়াছি খ্ৰীষ্টোত্তর দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে। গুপ্ত-পর্বের আগে কিছু কিছু নিদর্শন বাঙলাদেশের নানা জায়গায় পাওয়া গিয়াছে, সন্দেহ নাই; কিন্তু তাহার বেশির ভাগই পোড়ামাটির অথবা ছোট ছোট টুকরো পাথরের এবং সেই হেতু এক জায়গা হইতে অন্য জায়গায় সহজেই বহন করিয়া লইয়া যাইবার মতো। কাজেই জোর করিয়া বলিবার উপায় নাই যে, এই নিদর্শনগুলি বাঙলার বাহির হইতে— মধ্যদেশ হইতে-সমসাময়িক শিল্পী-ব্যবসায়ী-বণিক প্রভৃতিরা বহন করিয়া আনেন নাই! অন্তত, ইহাদের মধ্যে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য কিছু নাই, বরং সমসাময়িক কালের মধ্য-ভারতীয় শিল্পশৈলীর প্রভাব অত্যন্ত প্রত্যক্ষ। বস্তুত, সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রে, যেমন, এ ক্ষেত্ৰেও তেমনই, এই নিদর্শনগুলিই বাঙলাদেশে মধ্য-ভারতীয় আর্য-সভ্যতা বিস্তৃতির প্রথম পদচিহ্ন।
শুঙ্গ ও কুষাণ শিল্পের ধারা
খ্ৰীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক হইতে আরম্ভ করিয়া খ্ৰীষ্টোত্তর দ্বিতীয়-তৃতীয় শতক পর্যন্ত সমগ্র গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা ও মধ্য-ভারত জুড়িয়া পোড়ামাটির এক ধরনের শিল্পশৈলী প্রচলিত ছিল। পাটলীপুত্ৰ হইতে আরম্ভ করিয়া মথুরা পর্যন্ত নানা জায়গায়— বসার, রাজঘাট, কৌশাম্বী বা কোসাম, এলাহাবাদ, ভিটা, বকসার, পটলীপুত্র ও তাহার উপকণ্ঠ, মথুরা প্রভৃতি স্থানে অল্পবিস্তর পরিমাণে এই শিল্পশৈলীর নিদর্শন আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে অধিকাংশই যৌবনসমৃদ্ধ নরনারীর মূর্তি, বিশেষভাবে নারীমূর্তি, কিছু কিছু শিশুমূর্তিও আছে, কিছু কিছু আছে শুধু শিশু ও নরনারীমুণ্ড। অনেকগুলি মুণ্ডের আকৃতি ও মুখাবয়বে, কেশবিন্যাসে এবং মস্তকাভারণে সমসাময়িক যাবনিক বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। কোনও কোনোটিতে যে ব্যক্তিগত অর্থাৎ প্রতিকৃতিক বৈশিষ্ট্যও নাই, এমন নয়। সন্দেহ নাই যে, সমসাময়িক কালে শিল্পীদের চোখের সম্মুখে এই সব বিদেশীদের যাতায়াত এবং বসবাস ছিল। তাহা ছাড়া, মাটি দ্বারা প্রতিকৃতি রচনার প্রচলনও নিঃসন্দেহে ছিল। এই ধরনের নরনারী মূর্তি ছাড়া নানা চলিত কথা ও কাহিনী রূপায়ণ অজ্ঞাত ছিল না। কৌশাম্বী, মথুরা এবং অন্যান্য স্থানের ধ্বংসাবশেষ হইতে এই ধরনের কাহিনী-বর্ণনাগত ফলকও অনেক পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু বাঙলাদেশে পোখারণা (বাঁকুড়া জেলা), তমলুক, মহাস্থান প্রভৃতি প্রত্নভূমি হইতে যে কয়েকটি পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গিয়াছে তাহা ঠিক এই জাতীয় বর্ণনাগত ফলক নহে, বরং তাঁহাদের আত্মীয়তা পূর্বোক্ত যৌবনাগবিতা, অলংকারভারগ্রস্তা, আত্মসচেতনা নারীমূর্তিগুলির সঙ্গে। ইহাদের সর্বাঙ্গে স্কুল অথচ বিচিত্র আয়তন ও আকৃতির অলংকার; কেশভার সুপ্রচুর এবং নানা আকারে ও ভঙ্গিতে সেই কেশের বিন্যাস; যৌন ও যৌবনলক্ষণ আয়ত ও উচ্চারিত; স্থিতি ও গতিভঙ্গি সচেতন, বসন স্কুল অথচ সমৃদ্ধ এবং সমসাময়িক রুচি অনুযায়ী সুবিন্যস্ত। এই নারীমূর্তিগুলি উত্তর-ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিশেষ একটা স্তরের প্রতীক। রুচি, সংস্কৃতি ও অভ্যাসের দিক হইতে আদিম-কৌম-মানসের স্কুলত্ব ইহাদের এখনও ঘুচে নাই, অথচ ইহার যে-সমাজের প্রতিনিধি সেই সমাজের আর্থিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক পরিবেশ ইহাদিগকে দেহগত যৌবন ও সৌন্দর্য, আলংকারিক ঐশ্বর্য এবং যৌন আবেদন সম্বন্ধে সচেতন করিয়া দিয়াছে। এই দুই-এর, অর্থাৎ, একদিকে রুচির ও অভ্যাসের স্থূলত্ব, অন্যদিকে দেহ ও অর্থগত সমৃদ্ধির সচেতনতার সহজ সংঘাত ও সমন্বয় দুইই এই মূর্তিগুলির মধ্যে সুস্পষ্ট। সন্দেহ নাই যে, এই বৈশিষ্ট্য গ্রাম্য কোম-সমাজের কখনও হইতে পারে না; সে-সমাজের সহজ। সারল্য ও নিরলংকার সৌন্দর্য ইহাদের মধ্যে কোথাও নাই। এমন কি, বরহুতের প্রস্তর স্তূপবেষ্টনীর ফলকগুলির নারীমূর্তির মধ্যে বসনভূষণের প্রাচুর্য এবং সমৃদ্ধ কেশবিন্যাস সত্ত্বেও যে সলজ আড়ষ্টতা, যে নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব, যে ভীত মন্থরতার আভাস বর্তমান, এই নারীমূর্তিগুলি সেই স্তর বহুদিন পার হইয়া আসিয়াছে; সেই মানস আর ইহাদের মধ্যে বর্তমান নাই। সেই জন্যই, বহিরাবয়ব বা বসনভূষণ-ভঙ্গিমার দিক হইতে শুঙ্গ আমলের বলিয়া মনে হইলেও বস্তুত ইহারা আরও কিছু পরবর্তী কালের, যে-কালে সমাজের, অন্তত সমাজের একটি বিশিষ্ট স্তরের অর্থসমৃদ্ধি বাড়িয়াছে, প্রাথমিক লজা-ভয়-আড়ষ্টতা কাটিয়া গিয়াছে, সচেতন নগর-সভ্যতা বেশ কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে, সেই বিশেষ স্তরের দেহগত ভাবনা সম্বন্ধে সচেতন হইয়াছে, এবং বৃহত্তর সমাজের নানা দেশি-বিদেশি আদান-প্রদানের সম্মুখীন হইয়াছে বা হইতেছে। অথচ, কি রুচি, কি শিল্পীরীতি বা ভঙ্গি কোনও দিক হইতেই ইহাদের স্থূলত্ব তখনও ঘুচে নাই। বাৎস্যায়নের কামসূত্রে যে নাগর-জীবনের আভাস আমরা পাইতেছি। সেই সূক্ষ্ম, সুরুচিসম্পন্ন, সচেতন ও বাণিজ্য সমৃদ্ধ অভিজাত নাগর-সমাজ এখনও গড়িয়া উঠে নাই, কিন্তু তাহার সূচনা কেবল দেখা দিতেছে, অর্থাৎ স্কুল কৌম সমাজ ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ ও সচেতন নাগর-সমাজে বিবর্তিত হইতেছে মাত্র। এই অবস্থার, সমাজ-বিবর্তনের এই স্তরের ছবিই ধরা পড়িতেছে পোড়ামাটির এই অসংখ্য ফলকগুলিতে, বিশেষভাবে নারীমূর্তিগুলিতে। বাণিজ্য-সমৃদ্ধির প্রেরণায় ক্রমবর্ধমান নগরগুলির গৃহ-সজ্জায় এই সব মৃৎফলকগুলি ব্যবহৃত হইত, সন্দেহ কি! এই সামাজিক অবস্থার কিছু কিছু স্বাক্ষর পড়িয়াছে সাচী স্তূপের প্রস্তুর-তোরণের ফলকগুলিতে, স্বল্পাংশে বুদ্ধগয়াৱ বেষ্টনীর উপর, কিন্তু আরও উচ্চারিত রূপে মথুরার কয়েকটি প্রস্তর-বেষ্টনীর গাত্রে। কিন্তু, এই প্ৰত্যেকটি ক্ষেত্রে রুচিবোধ, আরও একটু সূক্ষ্ম ও অভিজাত, মন ও দৃষ্টি আরও সচেতন এবং কারুকলার আঙ্গিক আরও সুনিপুণ। তবে, সামাজিক বিবর্তনের প্রাথমিক স্তরের স্থূলতার প্রমাণ হিসাবে মৃৎফলকগুলির সাক্ষ্য অধিকতর প্রাসঙ্গিক। বাঙলাদেশে যত এ ধরনের-নিদর্শন মৃৎকলা পাওয়া গিয়াছে তাহার সঙ্গে কৌশাস্বী-পাটলীপুত্ৰ-বসার প্রভৃতি স্থানে প্রাপ্ত খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রথম ও খ্ৰীষ্টাওর প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের ফলকগুলির আত্মীয়তা ঘনিষ্ঠ। কিন্তু সংখ্যায় এত স্বল্প যে, ইহাদের উপর নির্ভর করিয়া বলা কঠিন, সমাজ-বিবর্তনের সদ্যোক্ত তরঙ্গ এই সময় বাঙলাদেশেও আসিয়া লাগিয়াছিল। কিনা। কিছুটা স্পর্শ হয়তো লাগিয়া থাকিতেও পারে।
