লোচনের জনক ও জন্য-রাগের প্রকরণটি পড়িলে পরিষ্কার বুঝা যায়, নানা রাগের মিশ্রণে নূতন নূতন রাগ সৃষ্ট হইত; আবার সেই সব মিশ্ররাগের মিশ্রণেও নূতন নূতন সংকর-রাগের উদ্ভব ঘটিত। লোচন তাহা জানিতেন এবং সেই জন্যই তাহার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকরণ হইল। সকল দেশে গুণীদের মধ্যে প্রসিদ্ধ যত মিশ্র ও সংকর-রাগ তাহদের নামোল্লেখ এবং তাহাদের জনক-রাগের নির্দেশ।
লোচনের সময়ই বিভিন্ন রাগের ঠাট-কাঠামো লইয়া কিছু কিছু মতভেদ দেখা দিয়াছিল। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, লোচন মনে করিতেন, ভৈরবীতে শুদ্ধ সপ্তস্বর ব্যবহার করাই সঙ্গত; কিন্তু তখনই কেহ কেহ ভৈরবী-রাগে কোমল ধৈবত ব্যবহার করিতেন। লোচন তাহা পছন্দ করিতেন না, কারণ তাহার মতে তাহা অশুদ্ধ এবং যথেষ্ট চিত্তরঞ্জকও নয়। কোন কোন রাগ কখন গাওয়া হইবে সে-সম্বন্ধেও কিছু কিছু মতভেদ দাঁড়াইয়া গিয়াছিল; লোচন তাহা আলোচনা করিতে গিয়া তুম্বুরু নাটক-গ্রন্থের মতামত উদ্ধার করিয়া তাঁহাই সমর্থনা করিয়াছেন।
শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তনের রাগ ও তাল
চর্যাগীতি-লোচন-জয়দেবের পর বহুদিন বাঙলাদেশে প্রচলিত মার্গবদ্ধ রাগ-রাগিণীগুলির পরিচয় আর পাইতেছি না। প্রায় আড়াইশ’ তিন-শ বৎসর পর বড়ু চণ্ডীদাস-বিরচিত শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তনের পদগুলি যে-সব রাগে ও তালে গাওয়া হইত তাহার সুবিস্তৃত উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপিতেই। তুলনার সুবিধা হইতে পারে ভাবিয়া রাগগুলির নামোল্লেখ এখানে করিতেছি : কোড়া, কোড়া-দেশাগ, বরাড়ী, দেশ-বরাড়ী, কাকু (কহু)-গুজরী (গুর্জরী) বিভাষ, বিভাষি-কক্, বঙ্গাল, বঙ্গাল-বরাড়ী, গুজরী (গুর্জরী), পাহাড়িয়া (নিঃসন্দেহে লোকায়ত রাগ), দেশাগ (দেশাখ), আহের (আহীরী, অর্থাৎ আভীর বা আহীর কোমের লোকায়াত সংগীতের রাগ?) রামগিরি (রামক্রী=রামকেলী), ধানুষী (ধানশ্ৰী), মালব (মালবস্ত্ৰী-মোলশ্রণী—মালসী), বেলাবলী, কেদার, মল্লার, ভাটিয়ালী (নিঃসন্দেহে লোকায়ত সংগীতের রাগ), ললিত, মাহারাঠা (মহারাষ্ট্র-প্রান্তের স্থানীয় লোকায়ত রাগ?), শৌরী (শৌরসেনী, অর্থাৎ শূরসেন অঞ্চলের স্থানীয় লোকায়ত রাগ?) বসন্ত, ভৈরবী, শ্ৰী, সিন্ধোড়া (পরবর্তী হিন্দোলা; গোড়ায় কি সিন্ধু-প্রান্তের স্থানীয় লোকায়ত রাগ?); পঠ (পট) মঞ্জরী। শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তনের পদগুলির তাল-মান-লয়ের পরিচয়ও সবিস্তারে পাইতেছি। তালের মধ্যে যতি, একতাল, অষ্টতাল, রূপক, আচুকিক, লঘুশেখর, ক্রীড়া প্রভৃতির সাক্ষাৎ পাওয়া যাইতেছে। রাগের তালিকাটি একটু মনোযোগে বিশ্লেষণ করিলেই দেখা যাইবে, বাঙলাদেশের উচ্চস্তরের গান ভারতের নানা প্রান্তের লোকায়ত সংগীতের সুর ইত্যাদি যেমন স্থান লাভ করিতেছিল, তেমনই ভারতীয় মার্গ সংগীতের সঙ্গেও ক্রমশ লোকয়ত সংগীতে ঘনিষ্ঠতর আত্মীয়তা প্রতিষ্ঠিত হইতেছিল। প্রাচীন বাঙলাদেশেও এই সমন্বয়-ক্রিয়া হইতে বাদ পড়ে নাই, কিংবা উত্তর-ভারতীয় সংগীত-প্রবাহ হইতে কখনও বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকে নাই; অন্তত দশম হইতে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে-সব সাক্ষ্য বিদ্যমান তাহাতে এই তথ্য সুস্পষ্ট।
নৃত্য-গীত-বাদ্য
বাদ্যযন্ত্রাদির কথা আগে অন্য প্রসঙ্গে বলিয়াছি; এখানে আর তাহার পুনরুল্লেখ করিয়া লাভ নাই। তবে, নৃত্যগীতবাদ্য সম্বন্ধে চর্যাগীতিতে পটমঞ্জরী রাগে গেয় একটি গান আছে; সেটি উদ্ধার করিতেছি :
সৃজ লাউ সসি লাগেলী তান্তী
অণহা দান্তী চাকি কিঅত অবধূতী।
বাজই আলো সহি হেরুআ বীণা
সূন-তান্তি-ধ্বনি বিলসই রূণা। ধ্রূ।
আলি কালি বেণি সারি সুনিআ
গঅবর সমরাস সান্ধি গুণি আ।
জবে করাহ করাহকলে চাপিউ।।
নাচন্তি বাজিল গাঅন্তি দেবী
বুদ্ধনাটক বিসমা হোই।।
সূর্য লাউ, শশী লাগিল তন্ত্রী, অনাহত দান্তী, অবধূতী হইল চাকী। হে সখি! অনাহত বীণা বাজিতেছে, শূন্য তন্ত্রীর ধ্বনি বিলাসিত হইতেছে ক্ষীণ সুরে। অ-বর্গ ও ক-বৰ্গ দূও শোনা যাইতেছে। সারিকা (বা সপ্তস্বর)। গজবরের সমরাস সন্ধি গোনা হইল। যখন হাতে করভফল চাপা হইল তখন বত্ৰিশ তন্ত্রীর ধ্বনি সকল দিকে বিত হইল। বাজিল (হেবজ্র) নাচিতেছেন, দেবী গাহিতেছেন, বুদ্ধনাটক বিসম হইতেছে।
লাউ-এর খোলের সাহায্যে তারের বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন, সপ্তস্বর, সুরের বিলাস, বত্রিশটি তার, সনৃত্য গান সমস্তই এই গীতটিতে সুস্পষ্ট। জয়দেব-পত্নী পদ্মাবতীও তো স্বামীর গীতগোবিন্দ গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তালে তালে নাচিতেন, এমন জনশ্রুতি বিদ্যমান; সেই জনশ্রুতি ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে কোচবিহার-রাজা নরনারায়ণের ভ্রাতা শুক্লধ্বজের সভাকবি রাম-সরস্বতী তাহার জয়দেব-কাব্যে স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন।
জয়দেব মাধবীর স্তুতিক বৰ্ণাবে,
পদ্মাবতী আগত নাচন্তু ভঙ্গিভাবে।…
কৃষ্ণর গীতক জয়দেব নিগদতি,
রূপক তালির চেবে পদ্মাবতী।
নৃত্যের নানা লোকায়ত রূপের পরিচয় পাওয়া যায় পাহাড়পুর এবং ময়নামতীতে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলকগুলিতে; আর উচ্চকোটি-লোকসমাজে যে ধরনের নৃত্য প্রচলিত ছিল তাহার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় সমসাময়িক প্রস্তর-ফলকে উৎকীর্ণ নৃত্যপর ও নৃত্যপরা নানা দেবদেবী, অন্সরা গন্ধৰ্ব নারী, মন্দির-নর্তকী প্রভৃতিদের নৃত্যের গতিতে ও ভঙ্গিমায়।
০৩. তক্ষণ-শিল্প প্রাথমিক বিকাশ ও ক্ল্যাসিক্যালপর্ব
পোড়ামাটি, পাথর ও মিশ্রধাতুর, কচ্চিৎ কখনও কাঠের তৈরি ভাস্কর বা অঙ্কণশিল্পের যে-সব শিল্প-নিদর্শন বিগত প্ৰায় শতবর্ষ যাবৎ নানা ব্যক্তিগত, প্রতিষ্ঠানিক ও সরকারী চিত্রশালায় সংগৃহীত হইয়াছে, আজও হইতেছে, আজও যত নিদর্শন বাঙলার মাঠে-ঘাটে, ঝাড়ে-জঙ্গলে পড়িয়া আছে— ‘অজ্ঞতায়, অনাদরে, অবহেলায় তাহার প্রায় সমস্তই এক সময় ছিল কোনও না কোনও মন্দির বা বিহারের অংশ— গর্ভগৃহের দেবদেবী, প্রাচীর-ণোত্র কুলুঙ্গি বা দরজার অলংকরণ। এ-ধরনের বিহার ও মন্দিরের কথা যে পরিমাণে সমসাময়িক ভ্রমণ-বৃত্তান্ত, সাহিত্য ও লিপিপাঠ করা যায়। সেই পরিমাণে ইহাদের সাক্ষাৎ আজ আর পাওয়া যায় না; পাথর বা পোড়ামাটি বলিয়া তক্ষণ-শিল্পের নিদর্শনগুলি ইতস্তত পড়িয়া আছে মাত্র, ভগা বা অল্পবিস্তর অক্ষত অবস্থায়। ধাতব নিদর্শনগুলির অধিকাংশই মানুষ লোভের বশে গলাইয়া ফেলিয়াছে। কাজেই, স্বাভাবিক ও মৌলিক উদ্দিষ্ট পরিবেশের মধ্যে আজ আর ইহাদের সাক্ষাৎ পাইবার উপায় নাই এবং সেই হেতু ইহাদের যথার্থ শিল্পরূপও আর আমাদের দৃষ্টিগোচর নয়। ব্যক্তিগত সংগ্রহে বা সাধারণ চিত্রশালায় ইহাদের পরিপূর্ণ রসোপলব্ধি, এমন কি রূপবোধও কিছুতেই সম্ভব নয়; এ-ভাবে এ-পরিবেশে দেখিবার জন্য বা আমাদের জ্ঞানের কৌতুহল বা চিত্তের রূপতৃষ্ণ চরিতার্থ করিবার জন্য ইহাদের সৃষ্টি হয় নাই, হইয়াছিল একটা বিশেষ প্রেরণায়, বিশেষ পরিবেশে, বিশিষ্ট একটা উদ্দেশ্যসাধনের জন্য। সে-প্রেরণা ধর্মবোধগত— আমাদের প্রচলিত অর্থে নন্দনবোধগত নয়; সে-পরিবেশ বিশিষ্ট সমাজের ও সম্প্রদায়ের সামগ্রিক ঐক্য ও মিলনবোধগত, কারণ, পূজামন্দির বা তীর্থস্থানগুলিই ছিল সেই ঐক্য ও মিলনের কেন্দ্র এবং সেই উদ্দেশ্য হইতেছে সমাজ ও সম্প্রদায়গত ধর্ম ও ঐক্যবোধে ব্যক্তি ও সমাজকে উদ্ধৃদ্ধ করা, সচেতন করা। এই প্রেরণা, পরিবেশ বা উদ্দেশ্য কিছুই আজ আর উপস্থিত নাই; কাজেই সাম্প্রতিক মানুষের পক্ষে ইহাদের যথার্থ মূল্য ও আবেদনের পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন। তবু, সবিনয়ে একথা স্বীকার করা ভালো যে, যে-শৈলী ও রীতি-বিবর্তনের দিক হইতে বা নন্দনবোধের দিক হইতে আমরা সাধারণত ইহাদের মূল্যবিচার করিয়া থাকি তাহাই ইহাদের সর্বাঙ্গীন পরিচয় নয়, এমন কি প্রধান পরিচয়ও নয়। শিল্প সম্বন্ধে এই একান্ত রূপগত ও ইন্দ্রিয়গত দৃষ্টি একেবারেই সাম্প্রতিক কালের।
