ইন্দুত্থানং সমারভ্য যাবদ্দুর্গামহোৎসবম
প্রাতার্গেয়ন্তু দেশাখে ললিতঃ পটমঞ্জরী ॥
এই যে শুক্লপক্ষের (দেবীপক্ষে) সূচনা হইতে দুর্গামহোৎসব পর্যন্ত প্ৰাতঃকালে দেশাখ, ললিত ও পটমঞ্জরী রাগে গান গাওয়া, এ যেন একান্তই বাঙালীর দুর্গাপূজার আগের কয়েকদিনের আগমনী, গান এবং রাগগুলিও সেই দিক হইতে লক্ষ করিবার মতন। এই ভাবে দুর্গমহোৎসব তো আর কোথাও হয় না, বা হইত না! সেই জন্যই মনে হয়। গ্রন্থকার যিনিই হউন, তিনি প্রাচ্য দেশ, বিশেষভাবে গৌড়-বঙ্গের কথাই যেন বলিতেছেন। সংগীত সম্বন্ধে এই গ্রন্থে বলা হইয়াছে,
দেশভাষাবিভেদাশ্চ রাগসংখ্যা ন বিদ্যতে।
ন রাগাণাং ন তালানামান্তঃ কুত্ৰাপি দৃশ্যতে।।
দেশভাষা যেমন স্বল্প বিভেদে অনন্ত, তেমনই রাগের সংখ্যাও অনন্ত; রাগ ও তালের অন্ত কোথাও দেখা যায় না। ইহাই প্রাচ্যদেশীয় মত। রক্ষণশীল উৎকট মাৰ্গপন্থীরা আজও সে মত স্বীকার করেন না, আগেও করিতেন বলিয়া মনে হয় না। সংগীতের দিক হইতে তম্বুরু নাটক গ্রন্থের মতামত অন্য কারণেও উল্লেখযোগ্য। মার্গ-সংগীতের ধারায় বিশেষ বিশেষ রাগ-রাগিণীর জন্য বিশেষ বিশেষ কাল শাস্ত্রানুসারে নির্দিষ্ট। তুম্বুরুনটকের রচিয়তা কিন্তু এই মত স্বীকার করিতেন না; তাঁহার মতে, রাগের কাল স্থিরীকৃত হয়। স্বরবৈচিত্র্যের রঞ্জকতা অনুযায়ী।
যথাকলে সমারব্ধং গীতং ভবতি রংজকম।
অতঃ স্বরস্য নিয়মাদ রাগোহপি নিয়মঃ কৃত।
নাট্যরঙ্গমঞ্চে বা রাজসভায়ও কালদোষ থাকিতে পারে না (রঙ্গভূমৌ নৃপাতায়াং কালদোষো ন বিদ্যতে), কারণ, রঙ্গভূমিতে গান গাহিতে হয় নাটকের প্রকরণ বা কালানুযায়ী এবং রাজসভায় রাজার আজ্ঞায়।
বুদ্ধনাটকের নৃত্যগীত
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যাইতে পারে চর্যাগীতিতে বুদ্ধনাটকের কথা। কিন্তু এই নাটকের কী ছিল রূপ এবং নৃত্যগীতের কী ছিল স্থান, কী-ই বা ছিল তাহাদের প্রকৃতি, বলিবার কোনও উপায় নাই। কিন্তু প্রাচীনকালে নৃত্য বা নৃত্ত ছাড়া নাটক ছিল না; কাজেই বুদ্ধনাটকই হউক আর তুম্বুরুন্নাটাই হউক, নৃত্য ছিলই, বাদ্যও ছিল এই অনুমানে বাধা নাই। বিশেষত, আলোচ্য চর্যাগীতিটিতেই পাইতেছি, ‘নাচন্তি বাজিল গাঅন্তি দেবী, বৃদ্ধনাটক বিসমা হোই’।
লোচনের রাগীতরঙ্গিনী
প্রাচীন বাঙলায় সংগীত-শাস্ত্রোলোচনার একমাত্র নিদর্শন যাহা আমাদের কালে আসিয়া পৌঁছিয়াছে তাহা লোচনা-পণ্ডিতের রাগীতরঙ্গিনী। এই গ্রন্থেই উল্লিখিত আছে, লোচন রাগীতরঙ্গিনী ছাড়া আরও অন্তত একখানা সংগীত-গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন; তাহার নাম ছিল রাগসংগীতসংগ্রহ, কিন্তু সে-গ্রন্থ এ-পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই (এতেষাং প্রপঞ্চস্তু মৎকৃতরাগসংগীতসংগ্রহে অন্বেষ্টব্যঃ)। তাহার কালে অন্য পণ্ডিতদের রচিত আরও অনেক সংগীতশাস্ত্রের কথা লোচন ইঙ্গিত করিয়াছেন, কিন্তু সে-সব গ্রন্থের একটিও আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। বস্তুত, লোচনের রাগীতরঙ্গিনী এবং শার্স দেবের সংগীত-রত্নাকরের চেয়ে প্রাচীনতর কোনো সংগীত-গ্রন্থের কথাই আমরা জানি না।
লোচনের রাগীতরঙ্গিনী-গ্রন্থে দেশী ভাষার গানের নমুনা হিসাবে মৈথিলী অপভ্রংশে রচিত শ্ৰীবিদ্যাপতির মৈথিলগীতি উদ্ধার করা হইয়াছে। তাহা ছাড়া, এই গ্রন্থে আমীর খুসরু (ত্ৰয়োদশ শতকের শেষ, চতুর্দশ শতকের গোড়ায়) বা তাহার কিছু পরে প্রচলিত ইমন, ফিরদৌস্তু প্রভৃতি রাগের নাম আছে। সেই হেতু পণ্ডিতেরা অনেকে মনে করেন, লোচনা চতুর্দশ শতকের আগের লোক হইতে পারেন না। কিন্তু আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয় প্রমাণ করিয়াছেন, লোচনা-পণ্ডিত বল্লালসেনের আমলের লোক ছিলেন এবং ১০৮২ শকাব্দী = ১১৬০ খ্ৰীষ্ট বৎসরে বল্লালসেনের রাজত্বের প্রথম বৎসরে লোচনা-পণ্ডিত রাগীতরঙ্গিনী-গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন; বিদ্যাপতির গান বা ইমন ও ফিরদোস্ত-রাগের কথা প্রভৃতি পরবর্তী কালে এই গ্রন্থে প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে। গ্রন্থের পপিক শ্লোকটি সুস্পষ্ট;
ভূজবসুদশমিতশাকে শ্ৰীমদ বল্লালসেনারাজাদৌ।
বর্ষৈকষষ্টিভোগে মুনয়ন্ত্ৰাসন বিশাখায়াম ॥
এই হিসাবে বল্লালসেনের রাজারম্ভে ১০৮২ শকে এই গ্রন্থ সমাপ্ত হইয়াছিল। ১০৮২ শক= ১১৬০ খ্ৰীষ্টাব্দে যে বল্লালসেনের রাজ্যারম্ভের কাল তাহা অন্য স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সাক্ষ্য দ্বারাও সমর্থিত। আচার্য ক্ষিতিমোহন সেই সব সংক্ষোরও বিশ্লেষণ করিয়াছেন।
স্বর ও স্বরসংস্থান
গ্রন্থারম্ভেই লোচন স্বরসংস্থান সংজ্ঞার আলোচনা করিয়াছেন। তাহার মতে শুদ্ধ স্বর সাতটি এবং তাহা বাইশটি শ্রীতির মধ্যে যথাস্থনে অধিষ্ঠিত; বিকৃত স্বর হইল শুদ্ধ স্বরের তীব্র বা কোমল রূপ মাত্র; কাজেই শুদ্ধ স্বপ্নেরই দাবি মান্য এবং সাতটি শুদ্ধ স্বরই তিনি ব্যবহার করিয়াছেন। তাহার ব্যবহৃত বিকৃত স্বর হইতেছে কোমল ঋষভ, তীব্রতর গান্ধার, তীব্রতর মধ্যম, কোমল ধৈবত এবং তীব্রতর নিষাধ; বিকৃত স্বরকে তিনি বলিতেছেন কাকলী। পুরবা বা পূরবীতে লোচন নিজে তীব্র ধৈবত ব্যবহার করিয়াছেন। যে সব তালের (চঞ্চৎপুট, চাচপুট ইত্যাদি) কথা তিনি বলিয়াছেন তাহার উল্লেখ বা অভ্যাস পরবর্তীকালে দেখা যাইতেছে না।
জনক ও জন্য-রাগ
লোচনের মতে প্রাচ্যদেশে প্রচলিত রাগ বারোটি মাত্র; ইহাদের প্রত্যেকটিরই নাম ও লক্ষণও তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। এই বারোটি রাগই (ভৈরবী, গৌরী (গৌড়ী?), কর্ণাট, কেদার, ইমন, সারঙ্গ, মেঘ, ধানশ্ৰী বা ধনশ্ৰী, টোড়ী, পূর্বা, মুখারী ও দীপক ) জনক-রাগ এবং এই জনক-রাগ কয়টি হইতেই অন্যান্য অনেক রাগের উৎপত্তি— সেগুলি হইতেছে। জন্য-রাগ, যেমন ভৈরবী হইতে দুইটি, কর্ণািট হইতে কুড়িটি, গৌবী হইতে সাতাশটি, ইমন হইতে চারিটি, কেদার হইতে তেরোটি, সারঙ্গ হইতে পাচটি, মেঘ হইতে দশটি, ধনশ্ৰী বা ধানশ্ৰী হইত দুইটি এবং টোড়ী, পূর্ব, মুখারী ও দীপক এই চারিটির প্রত্যেকটি হইতে এক একটি, এই মোট ৮৬টি জন্য-রাগ। পূরবা বা পূর্ব-পূরবী, সন্দেহ নাই; কিন্তু মুখারী রাগ আজ অপ্রচলিত। এই জন্য রাগগুলির লক্ষণ অর্থাৎ আরোহ-অবরোহ সম্বন্ধে লোচন কিছু আলোচনা করেন নাই, অন্যত্র দেখিয়া লইতে বলিয়াছেন।
