চর্যাগীতির ধ্রুবপদ
সমসাময়িক সংগীত-পদ্ধতির একটি সংকেত চর্যাগীতে খুব সুস্পষ্ট। এই গীতগুলির মূল পুঁথিতে এবং শাস্ত্রী-মহাশয়ের সংস্করণেও প্রতি পদের প্রত্যেক দুইলাইনের শেষে “ধু” এই শব্দটির উল্লেখ আছে। “ধু” যে ধ্রুবপদের সংকেত ইহাতে কোনো সন্দেহই থাকিতে পারে না। কয়েকটি পদের সংস্কৃত টীকাতেই ‘ধুবপদেন দৃঢ়ীকুৰ্বন’, ‘ধ্রুবপদেন চতুর্থনন্দমুদ্দীপয়ন্নাহ’ ইত্যাদি ব্যাখ্যা বর্তমান; কিন্তু মূল গীতে দ্বিতীয় পদটিকে বলা হইয়াছে ধ্রুবপদ, অথচ সংস্কৃত টীকায় ধ্রুবপদ বলা হইয়াছে। তৃতীয় পদটিকে এবং তাহাকেই দ্বিতীয় পদ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। বুঝিতে কিছু অসুবিধা নাই যে, প্রথম পদের পর যে পদ তাহাই ধ্রুবপদ বা বাঙলা ধুয়া। তিব্বতী টীকায়ও এই পদটিকে বলা হইয়াছে “ধু পদ”। ইহার অর্থই যে, প্রত্যেকটি পদ গাহিবার পরই ‘ধু বা ধ্রুবপদটি গাহিতে হইত। এই পদটিই বর্তমান উত্তর-ভারতীয় সংগীত-পদ্ধতির ‘স্থায়ী” পদ। চর্যাপদগুলির ভাব-বিশ্লেষণ করিলেও দেখা যায়। এই ধ্রুবপদটিতেই সহজ-সাধনের সূত্রটি ধরিয়া দেওয়া হইয়াছে এবং সাধককে সতর্ক করা হইয়াছে। সেইজনাই প্ৰত্যেক পদ গাহিবার পরে বারবার এই পদই গাহিবার নির্দেশ ছিল, গায়কের এবং শ্রোতার বুদ্ধি ও দৃষ্টিকে বারবার ঐ দিকে আকৃষ্ট করিবার জন্য। উত্তর-ভারতীয় সংগীত-পদ্ধতিতে ‘স্থায়ী’র কাজও একই; স্থায়ীতেই বিশিষ্ট রাগটির প্রধান স্বর-সন্নিবেশ এবং এই সন্নিবেশই রাগটির মানচিত্রের কেন্দ্ৰবিন্দু। কাজেই বারবার স্থায়ীতে ফিরিয়া আসা প্রয়োজন, শ্রোতার মন ও দৃষ্টিকে ঐদিকে আকৃষ্ট করিবার জন্য।
গীতগোবিন্দের রাগ ও তাল
জয়দেবের গীতগোবিন্দের পদগুলিও রাগে-তালে গাওয়া হইত, এ-তথ্য সুপরিজ্ঞাত। গ্রন্থটির সমস্ত পাণ্ডুলিপিতেই রাগ ও তালের উল্লেখ আছে। এই গানগুলিতে ব্যবহৃত রাগের ও তালের সংখ্যা যথাক্রমে ১১ ও ৫; মালঞ্চ-রাগা— রূপকতাল, যতিতাল; গুর্জরী-রাগ- নিঃসার তাল, ব্যতিতাল, একতালী; বসন্তু রাগ- যতিতাল; রামকিরী— যতিতাল; কর্ণাট রাগা— যতিতাল; দেশাগ-রাগ (দেশাখ)- একতালী; দেশ-বরাড়ী-রাগ— রূপকতাল, অষ্টতালী; বরাড়ী রাগ- রূপকতাল; গোণ্ডকিরী রাগ- রূপকতাল; ভৈরবী রাগ- যতিতাল; বিভায-রাগ—একতালী। মালব নিঃসন্দেহে মালবশ্রী-মালসী-মোলশ্রী এবং গোড়ায় ছিল স্থানীয় লোকায়ত গানের রাগ, পরবর্তী কালে মার্গ-সংগীতে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়। গুর্জরী-রাগের কথা চর্যাগীতি-প্রসঙ্গেই বলিয়াছি। বসন্ত-ভৈরবী-বিভাষ প্রভৃতি রাগ ত আজও সুপ্ৰসিদ্ধ ও সুঅভ্যস্ত। রামকিরী, রামক্ৰী, রামগিরির একই রাগের বিভিন্ন নোমরূপ। বরাড়ী ও দেশাখ (দেশাগ) বা দেশ-রাগের মিশ্রিত রূপ দেশ-বরাড়ী, এরূপ অনুমানে বাধা দেখিতেছি না। রামকিরী রাগের নামানুসরণে গোণ্ডকিরী খুব সম্ভব প্রাচীনতর গোণ্ডক্রী নামের অপভ্রংশ, এবং মনে হয়, আদিম গোন্দ বা গোণ্ডজনদের স্থানীয় লোকায়ত গানের রাগ। বাঙলাদেশে কর্ণাট-রাগের ব্যবহারের ইঙ্গিত। জয়দেবের মতো লোচনা-পণ্ডিতও দিতেছেন; ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই। জয়দেব ছিলেন, লক্ষ্মণসেনের অন্যতম সভাকবি, আর লোচনা-পণ্ডিতের রাগীতরঙ্গিনী রচিত হইয়াছিল। বল্লালসেনের রাজারম্ভকালে, বোধ হয় সেন-রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতায়। আর, সেনা-বংশীয় রাজারা তো আদিতে কর্ণাটদেশবাসীই ছিলেন। দক্ষিণী কর্ণাটী সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি ক্ষীণধারার পরিচয় প্রাচীন বাংলাদেশে আছে, এ-কথা অস্বীকার করা যায় না। গীতগোবিন্দের গানের তালগুলির মধ্যে অন্তত নিঃসারিতালের কথা পরবর্তী কালে কোথাও শুনিতেছি না। ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয় বলিতেছেন,
‘যে-সব ঘরানাতে জয়দেবের গান সংরক্ষিত আছে, সেখানে গীতগোবিন্দের গান শিখিতে গিয়া বিশ্বভারতীর ভূতপূর্ব সংগীতাধ্যাপক মহারাষ্ট্রদেশীয় পণ্ডিত ভীমরাওশাস্ত্রী তাহার স্বরলিপি ও তলের বাঁট লইয়া আসেন। সেই বাট দেখিয়া আচার্য ভাতখণ্ডে বলেন, “এ কি! এ-সব যে মালাবারের জিনিস!’
বস্তুত, সমসাময়িক বাঙলার সংগীত-সাধনায় দক্ষিণী প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। লোচনের রাগীতরঙ্গিনী-গ্রন্থেও সে-প্রভাব অনস্বীকার্য। সে-কথা পরে বলিতেছি। হয়তো নৃত্যেও সে-প্রভাব ছিল, বিশেষত দেবদাসী নৃত্যে; সমসাময়িক কালে বাঙলাদেশের রাজসভায় ও অভিজাত স্তরে এই নৃত্য, কাররামাদের নৃত্য প্রভৃতি বহুল প্রচলিত ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যাইতে পারে, শিখদের শ্ৰীগুরু-গ্রন্থে জয়দেবের যে গান দুইটি উদ্ধার করা আছে সে দুটি যথাক্রমে গুজরী বা গুর্জর বা মারূ (মরুবাসী মাড়বারীদের স্থানীয় লৌকিক) রাগে গাওয়া হইত।
তক্ষুরুন্নাটক গ্ৰন্থ ও প্রাচ্যরীতি
চর্যাগীতির রাগিতালিকা এবং গীতগোবিন্দের রাগ ও তাল-তালিকা বিশ্লেষণ করিলে সহজেই মনে হয়, সমসাময়িক বাঙলাদেশে সংগীতচর্চার অপ্রাচুর্য ছিল না এবং সর্বভারতীয় মার্গ সংগীত-প্রবাহের সঙ্গে বাঙলাদেশের যোগও ছিল ঘনিষ্ঠ। সেইজন্যই মনে হয়, সংগীতশাস্ত্ৰ লইয়াও কিছু না কিছু আলোচনা নিশ্চয়ই হইয়া থাকিবে। লোচনা-পণ্ডিত রাগ-তরঙ্গিনী গ্রন্থে প্রাচীনতর তুম্বুরুন্নাটক-গ্রন্থের উল্লেখ করিয়াছেন। এই গ্রন্থের কোনও পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নাই; তবে মনে হয়, কোনও নাট্যশাস্ত্ৰসম্পর্কিত গ্রন্থ ছিল এই তুম্বুরু নাটক। লোচন এই গ্রন্থ হইতে কিছু মতামত উদ্ধার করিয়াছেন; একটি উদ্ধৃতিতে আছে :
