কালধর্মী মৃৎশিল্প
কিন্তু আর এক ধরনের মাটির শিল্পরূপও লোকেরা গড়িত, গড়া শেষ হইয়া গেলে প্রয়োজন ফুরাইয়া গেলেই ভাঙিয়া ফেলিবার জন্য নয়, বা নেহাৎই খেয়াল-খুশীর খেলনার জন্যও নয়। সেগুলি লোকে ব্যবহার করিত ঘরের কুলুঙ্গি, মঞ্চ, দেয়াল প্রভৃতির সাজাইবার জন্য, আমরা যেমন ছবি দিয়া ঘর সাজাই; আবার সেগুলির সাহায্যে, সুযোগ পাইলেও প্রয়োজন হইলে, বড় বড় মন্দির, বিহার প্রভৃতির বহিরঙ্গ সজ্জাও হইত। বড় বড় মন্দির-বিহারে সুবিস্তৃত বহির্গাত্র শিল্পীরূপে ঢাকিয়া দিবার মতো পাথরের প্রাচুর্য বাঙলাদেশে ছিল না; কাজেই তখন ডাক পড়িত গ্রামের কুমোর শিল্পীদের। তাহারা তখন আসিয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে ছাচের সাহায্যে অথবা হাতের আঙুলে টিপিয়া টিপিয়া অপেক্ষাকৃত স্বল্প আয়াসে ক্ষুদ্র বৃহৎ মাটির ফলক গড়িয়া চারিদিক ঢাকিয়া দিত জীবনের শোভাযাত্রায়। এই ধরনের অন্তত কিছুটা স্থায়িত্বের প্রশ্ন যেখানে ছিল সেখানে মাটির গড়া এই সব শিল্প-ফলক, ছোটই হউক আর বড়ই হউক, আগুনে পোড়ানো হইত। এই ধরনের পোড়ামাটির ছোটবড় শিল্প-ফলক বাঙলার নানা প্রত্নস্থান হইতে কিছু কিছু পাওয়া গিয়াছে’- খ্ৰীষ্টীয় শতকের প্রারম্ভ হইতে একেবারে অষ্টম-নবম শতক পর্যন্ত। সুপ্রচুর সংখ্যায় পাওয়া গিয়াছে পাহাড়পুর ও ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষ হইতে। এই সব পোড়ামাটির ফলকগুলি ঠিক পূর্বোক্ত কালাতীত বা কালজয়ী প্রকৃতির নয়; বরং ইহাদের উপর কালের ছাপ সুস্পষ্ট এবং সমসাময়িক পাথরের তক্ষণ শিল্পের শিল্পরূপ ও ধারার প্রভাবও ইহারা একেবারে এড়াইতে পারে নাই। কিন্তু বিষয়বস্তু এবং লোকায়াত জীবনের প্রাণ-প্রবাহের দিক হইতে ইহাদের মধ্যে পার্থক্যও প্রচুর। পোড়ামাটির শিল্প সাধারণত দেবদেবীর মূর্তি নয়, কাজেই কোনও শাস্ত্ৰ বা নিয়ম-বন্ধন দ্বারা নিয়মিতও নয়! ইহাদের বিষয়বস্তু দৈনন্দিন জীবনের চলমান প্রবাহের লোকায়ত কথা ও কাহিনীর, ক্ষণস্থায়ী জীবন-রূপের; কোনও গভীর ভাব-রহস্যের, কোনও গভীর তত্ত্বের বা আদর্শের দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপেরও নয়। বস্তুত, প্রাচীন বাঙালীর লোকায়ত শিল্পের প্রধান অভিজ্ঞান এই মাটির ফলকগুলিই।
প্রাচীন বাঙলার লোকায়ত চিত্রশিল্পের কোনও নিদর্শনই আমাদের কালে আসিয়া পৌঁছায় নাই; অথচ তাহা যে ছিল না, এমন নয়। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকীয় বাঙলা পটচিত্রের ধারা প্রাচীন কৌম লোকায়ত খাতেই বহিয়া আসিয়াছে এবং তাহার কিছু কিছু প্রাচীন আভাসও সাম্প্রতিক গবেষণায় ধরা পড়িয়াছে। ধর্মানুশাসিত উচ্চকোটি-স্তরের যে চিত্ৰ-নিদর্শনের কথা আমরা কিছু কিছু জানি তাহা সমস্তই পুঁথিচিত্র; পুঁথিসজ্জা, পুঁথিবর্ণিত দেবদেবীর মূর্তি-পরিচয়ের জন্যই তাহাদের সৃষ্টি।
০২. সংগীত ও নৃত্য
আগেই বলিয়াছি, দশম-একাদশ শতকের আগে নৃত্য ও গীত সম্বন্ধে কিছু বলিবার মতো উপাদান আমাদের নাই। কিন্তু দশম-দ্বাদশ শতকীয় চর্যাগীতিগুলিতে, জয়দেবের গীতগোবিন্দ এবং লোচনা-পণ্ডিতের রাগীতরঙ্গিনী-গ্রন্থে এমন সব রাগের ও তালের নামোল্লেখ পাইতেছি। যাহাতে মনে হয়, এই সময়ের বহু আগে হইতেই প্রাচীন বাঙলাদেশ ভারতীয় সংগীতের ধারাস্রোতের সঙ্গে যুক্ত হইয়া গিয়াছিল এবং সর্বভারতে অভ্যস্ত ও প্রচলিত অনেক রাগ ও তাল বাঙলাদেশেও বিস্তার লাভ করিয়াছিল।
চর্যাগীতির রাগ
চর্যাগীতির পদগুলি যে সুরে তালে গাওয়া হইত। তাহা গীতারম্ভে রাগের নামেই প্রমাণ; কিন্তু এ-সব রাগের ঠাট্ট বা কাঠামো যে কী ছিল, এখন আর তাহা বলা যায় না। এ-গুলি প্রায় সমসাময়িক লোচনা-পণ্ডিতের রাগীতরঙ্গিনীর বা কিছু পরবর্তী কালের শার্ঙ্গদেবের সংগীত-রত্নাকরের (১২১০-১২৪৭) পদ্ধতি অনুযায়ী গাওয়া হইত। কিনা, বলা কঠিন। চর্যাগীতির ৫০টি গীত “যে-সব রাগে গাওয়া হইত। তাহদের সংখ্যা ১০টি। ১, ৬-৭, ৯, ১১, ১৭, ২০, ২৯, ৩১, ৩৩, ৩৬ এবং ৪৮ নং গীতের রাগ পটমঞ্জরী এবং বারংবার ব্যবহারে মনে হয়, এই রাগটিই ছিল সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়; ২-৩ ও ১৮ নং- গবড়া বা গউড়া; ৪— অরু; ৫, ২২, ৪১, ৪৭- গুর্জরী, গুঞ্জরী, কাহ্ন-গুর্জরী; ৮— দেবক্ৰী; ১০, ৩২- দেশাখ; ১৩, ২৭, ৩৭, ৪২— কামোদ; ১৪- ধনসী, ধানশ্ৰী; ১৫, ৫০- রামক্রী ২১, ২৩, ২৮, ৩৪— বলাড্ডী বা বরাড়ী; ২৬, ৪৬- শবরী; ৩০, ৩৫, ৪৪, ৪৫, ৪৯— মল্লারী; ৩৯— মালসী; ৪০ – মালসী-গবুড়া; ৪৩— বঙ্গাল; ১২, ১৬, ১৯, ৩৮– ভৈরবী! গবড়া ও গউড়া একই রাগী সন্দেহ নাই এবং খুব সম্ভব কাবো। যেমন গৌড়ীরীতি রাগের মধ্যেও তেমনই একটি ছিল গউড়া বা গৌড়ী রাগ এবং তাহারই সঙ্গে মালসী বা মালশ্রী (মালব-শ্ৰী?) মিশাইয়া যে মিশ্র রাগ তাহার নাম মালসী-গবুড়া (৪০)। লোচনা-পণ্ডিত কিন্তু এক গৌরী-রাগের নাম করিয়াছেন; গৌরী কি গৌড়ী-রাগ? গুঞ্জরী গুর্জরী-রাগেরই লিপিকর প্রমাদ এবং কাহ্ন-গুর্জরী গুর্জর-রাগেরই বিশেষ এক প্রকার মিশ্রিত রূপ; অসম্ভব নয়, মাৰ্গ গুর্জরীর সঙ্গে দেশী কাহ্ন-রাগের মিশ্রণেই কাহ্ন-গুর্জরীর সৃষ্টি। কাহ্ন বা কৃষ্ণভক্তরা যে ঠাটে গুর্জরী রাগ গাহিতেন তাহাই কি কাহ্নগুর্জরী? বা মথুরা-বৃন্দাবনের কৃষ্ণলীলার প্রচলিত গুর্জরীরাই কাহ্নগুৰ্জরী? রামক্রী-রাগ নিঃসন্দেহে পরবতী কালের রামকেলি, গীতগোবিন্দের রামকিরী, শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তনের রামগিরি রাগ। কিন্তু দেবক্রীর পরবর্তী ভগ্নরূপ দেবকিরী-দেবকেলি বা দেবগিরির উল্লেখ আর কোথাও দেখিতেছি না। বস্তুত, পরবর্তী সংগীত-শাস্ত্ৰে বিভিন্ন ঘরানায় দেবক্রীরাগের কোনও স্থান যেন আর নাই। দেশাখ নিঃসন্দেহে গীতগোবিন্দ ও শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তনের দেশাখ; কিন্তু দেশাখ কি দেশাখ্য, অর্থাৎ কোনও দেশী রাগের মার্গীকরণ? ধনসী, ধানশ্ৰী। পরবর্তী (শ্ৰীকৃষ্ণকীর্তন) কালের ধানুষী এবং মল্লারী সুপরিচিত মল্লার। কিন্তু সংগীতেতিহাসের দিক হইতে চর্যাগীতির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য রাগ শবরী ও বঙ্গল-রাগ। শবরী রাগ তো নিঃসন্দেহে শবরদের মধ্যে প্রচলিত রাগ। এই লোকায়ত রাগটির মার্গীকরণ কবে হইয়াছিল, বলা কঠিন, তবে ইহার উল্লেখ শুধু চর্যাগীতিতেই পাইতেছি, আগে বা পরে সে-উল্লেখ আর কোথাও দেখিতেছি না। বঙ্গাল রাগও যে কী ধরনের আজ আর তাহা বুঝিবার উপায় নাই, তবে এই রাগটিও যে এক সময় গুর্জরী, মালবস্ত্রী বা মালসী, শবরী প্রভৃতি রাগের মতো স্থানীয় লোকায়ত রাগ ছিল, সন্দেহ নাই। অথচ ভারতীয় মার্গ-সংগীতে বঙ্গল-রাগ এক সময় সুপরিচিত রাগ ছিল এবং অষ্টাদশ শতকের রাজস্থানী চিত্রনির্দেশে বঙ্গল-রাগের চিত্রও দুর্লভ নয়। পরে কখন কী ভাবে যে এই রাগটি লুপ্ত হইয়া গেল তাহা জানা যাইতেছে না। বস্তুত, চর্যাগীতির দেবক্ৰী, গউড়া বা গবুড়া, মালসী-গবুড়া, শবরী, বঙ্গাল, কাহ্নগুৰ্জরী প্রভৃতি অনেক রাগই আজ বিলুপ্ত। দেশাখ-রাগ তো বোধ হয়। আজিকার দেশ-রাগে বিবর্তিত বা রূপান্তরিত হইয়া গিয়াছে। অরু-রাগ যে কি তাহাও আজ আর বুঝিবার উপায় নাই।
