আর্যীকরণ, তথা ব্ৰাহ্মণীকরণের ক্রিয়াকৌশল (method and technique) ভারতেতিহাসের বুদ্ধি ও চক্ষুষ্মাণ পণ্ডিত ও পাঠকমাত্রেরই সুপরিজ্ঞাত। সে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা মনের পশ্চাতে রেখে পশ্চিমভাগ পট্টোলীর সমৃদ্ধ তথ্যাবলীর দিকে তাকালে বুঝতে বিলম্ব হয় না যে, এ ধরনের ঘনসন্নিবদ্ধ সুবিস্তীর্ণ ব্ৰাহ্মণ বসতির প্রয়োজন হয়েছিল এই জন্যেই যে, এই অঞ্চলটিতে ব্ৰাহ্মণ ও ব্ৰাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রচলন তেমন ছিল না, অন্তত প্রভাব বিস্তার করিবার মতো যথেষ্ট ছিল না। এ অনুমান যে কল্পনা নয় তা এই তিন প্রস্থ ভূমির দান-বিবরণের মধ্যেই আছে। পূর্ব-ভারতের পূর্বতম একটি প্রান্তে দশম শতাব্দীর তদবধি অ-ব্রাহ্মণীকৃত এক বিস্তৃত অঞ্চলে ব্রাহ্মণীকরণের, অন্যার্থে সমসাময়িক ভারতীয় সংস্কৃতির সীমা-বিস্তারের চেষ্টা কিভাবে অগ্রসর হচ্ছে, এই তাম্রপট্টোলীটি তার একটি অন্যতম প্রকৃষ্ট সাক্ষ্য। একই শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে (পঞ্চখণ্ডে) এবং রংপুর অঞ্চলে এর প্রথম প্রমাণ দেখা গিয়েছিল সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভাস্করবর্মর নিধনপুর তাম্রশাসনে। এই লিপিতে দেখা যাচ্ছে চন্দ্রপুরী বিষয়ের ময়ুরুশাল্মল অগ্রহারে ভাস্করবর্মার বৃদ্ধপ্রপিতামহ ভূতিবৰ্মা (ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম পাদ) ভিন্ন ভিন্ন বেদের ৫৬টি বিভিন্ন গোত্রীয় অন্তত ২০৫ জন ‘বৈদিক’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ ব্ৰাহ্মণের বসতি করিয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিমভাগ পট্টোলীতে দেখা যাচ্ছে, দু-চারশ’ নয়, ছ-হাজার ব্রাহ্মণ বসানো হচ্ছে এবং চার-চারটি মঠকে কেন্দ্র করে, যে মঠ শুধু বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা-আরাধনার জন্য নয়, সেখানে নানা ব্ৰাহ্মণ্য বিদ্যা ও জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার জন্যও।
প্রথম প্রস্থ ১২০ পাটক ভূমি দেওয়া হয়েছিল দেবতা ব্ৰহ্মা ও তার পূজাগৃহ একটি মঠের উদ্দেশে। ব্ৰহ্মার মঠ ও তার একক পূজার প্রচলন প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে বড় একটা দেখা যায় না; সুতরাং পূর্বভারতের পূর্বতম প্রান্তে দশম শতকে ব্ৰহ্মার একটি মঠ ইতিহাসের দিক থেকে কৌতুহলোদ্দীপক সন্দেহ নেই। এই মঠ প্রতিষ্ঠা, পোষণ ও পরিচালনার জন্য যো-পরিমাণ ভূমির প্রয়োজন তা বাদ দিয়ে ১২০ পাটকের বাকি ভূমি দান করা হয়েছিল নিম্নোক্ত ভাবে। প্রতি পাটকে দশদ্রোণ হিসেবে ১০ পাটক দেওয়া হয়েছিল জনৈক (ব্রাহ্মণ) অধ্যাপককে, চন্দ্ৰগোমিনের চান্দ্ৰ ব্যাকরণ সম্বন্ধে অধ্যাপনা করবার জন্য : ১০ পাটক ১০ জন বিদ্যার্থীর ভরণ-পোষণ ও লেখ-গুটিকার (খড়িমাটির পেন্সিল) ব্যয় নির্বাহের জন্য; ৫ পাটক প্রতিদিন ৫ জন অতিথি-সেবার জন্য; এক পাটক সেই ব্ৰাহ্মণের জন্য যিনি এই মঠ নির্মাণ করিয়েছিলেন; এই পাটক মঠসংলগ্ন গণকের জন্য; ২*পাটক মঠের কায়স্থ বা হিসাব রক্ষকের জন্য; ৪ জন ফুলওয়ালা বা ফুলমালী, ২ জন তৈলক, ২ জন কুম্ভকার, ৫ জন কাহলিক অর্থাৎ কহল বা (ছোট) ঢাকবাদক, ২ জন শঙ্খবাদক, ২ জন বৃহৎ ঢাক্কা বা ঢাকবাদক; ৮ জন প্রাগড়াবাদক (দ্রগড় এক ধরনের ঘনবাদ্য) ও ২২ জন কর্মকার (ভূত্য) ও চর্মকার, এদের প্রত্যেককে ঐ পাটক হিসেবে একুনে ২৩২ পাটক; ২ পাটক মঠ-নটের জন্য; ২ জন সূত্রধর, ২ জন স্থপতি, ২ জন কর্মকার, প্রত্যেকের ২ পাটক হিসেবে, মোট ১২ পাটক; ৮ জন চেটিকা (এরা কি দেবদাসী, না দাসী বা সেবিকামাত্র?), প্রত্যেককে ঐ পাটক হিসেবে মোট ৬ পাটক; এবং মঠের নবকর্ম বা নিয়মিত সংস্কারব্যয় নির্বাহের জন্য ৪৭ পাটক। অর্থাৎ মঠ এবং মঠশ্রিত যাবতীয় কর্মনির্বাহের জন্য মোট ১২০ পাটক।
দ্বিতীয় প্রস্থ ২৮০। পাটক ভূমি দেওয়া হয়েছিল আটটি পৃথক পৃথক মঠের জন্য; চারটি দেশান্তরী (অর্থাৎ অ-বাঙ্গাল ব্রাহ্মণ, পূজক ও ভক্তদের জন্য, আর বাকি চারটি বঙ্গাল (ব্রাহ্মণ, পূজক ও ভক্ত)-দের জন্য; প্রথম চারটির নাম দেশান্তরী (অর্থাৎ বিদেশীয়) মঠ; শেষের চারটির, বঙ্গাল মঠ। দুই প্রস্থ মঠেই এক এক জন করে যে-চারজন দেবতা প্রতিষ্টিত তারা হচ্ছেন বৈশ্বােনর বা অগ্নি, যোগেশ্বর শিব, জৈমিনি বা জৈমিনি এবং মহাকাল শিব। স্বাধীনভাবে একক বৈশ্বিানর বা অগ্নির পূজা ও তার জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠা একটু বিস্ময়কর, যেহেতু এই ধরনের অগ্নিপূজা ও অগ্নিমন্দির বড়ই বিরল, প্রায় নেই বললেই চলে। তার চেয়েও বিস্ময়কর পূর্ব-মীমাংসা দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবক্তা জৈমিনির দেবত্বে উওরণ; ভারতবর্ষে জৈমিনির মঠ বা মন্দির আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, প্রত্যেকটি দেবতার দুটি করে মঠ, একটি বিদেশীদের, একটি বঙ্গলদের! এই দুই দলের মধ্যে কি কলহ, বাদ-বিসম্বাদ, রেষারেষি কিছু ছিল? ছিল বলেই তো মনে হয়, কিন্তু কেন ছিল? পূজার রীতিনিয়ম পদ্ধতির কি পার্থক্য ছিল? যে দেশান্তরীয়দের কথা ইঙ্গিত করা হচ্ছে তারা কারা, কোথা থেকে এলেন, কী:করে এবং কেন এলেন শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে? শ্ৰীচন্দ্ৰই কি এদের নিয়ে এসে বসবাস করিয়েছিলেন? শ্ৰীচন্দ্রের পিতা ত্ৰৈলোক্যচন্দ্ৰ বঙ্গালদেশের অধিপতি ছিলেন, চন্দ্ৰদ্বীপে ছিল তার রাজধানী। শ্ৰীচন্দ্ৰ যদিও তার পঞ্চম রাজ্যাঙ্কের আগেই কোনও সময় চন্দ্ৰদ্বীপ থেকে রাজধানী তুলে নিয়ে এসেছিলেন বঙ্গে, বিক্রমপুরে, তা হলেও তিনি নিজে যথার্থত বঙ্গাল। সেই বঙ্গলদের সঙ্গে দেশাস্তুরীয়দের এমন কী বিরোধ ছিল যার ফলে তারই দত্ত ভূমিতে, ব্ৰহ্মপুত্ৰ-শ্ৰীচন্দ্রপুরে, একই দেবতা-চতুষ্টয়ের স্থান করতে হলো দুই প্রস্থ মন্দির-চতুষ্টয়ে, দুই ভিন্ন নামে চিহ্নিত করে? ব্যাপারটা শুধু কৌতুহলোদ্দীপক নয়, ইতিহাসের দিক থেকে একটি প্রশ্নচিহ্নও বটে।
