যাই হোক, ২৮০ পাটক ভূমি সম পরিমাণে, অর্থাৎ ১৪০ পাটক করে, ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল দুই প্রস্থ মন্দির-চতুষ্টয়ের মধ্যে, অন্যার্থে প্রত্যেকটি মন্দিরের ভাগে পড়েছিল ৩৫ পাটক করে। বিস্তৃত ভূমিখণ্ডদানের তালিকা এইভাবে দেওয়া হয়েছে : চতুৰ্বেদ অধ্যাপনার জন্য ৮ জন অধ্যাপকের প্রত্যেককে ১০ পাটক করে, মোট ৮০ পাটক; প্রত্যেকটি মঠে ৫ জন করে, অর্থাৎ ৮টি মঠে ৪০ জন ছাত্রের ভরণ-পোষণ ও শিক্ষার জন্য প্রতি ছাত্ৰ পিছু ১ পাটক হিসেবে মোট ৪০ পাটক; প্রত্যেকটি মঠের একজন ফুলমালী, একজন ক্ষীেরকার, একজন তৈলক ও একজন রাজক এবং ৮ জন ভৃত্য বা সেবক ও চর্মকার, প্রত্যেককে ঐ পাটক হিসেবে, অর্থাৎ মোট ১৬+৩২-৪৮ পাটক; প্রত্যেকটি মঠের দুজন সেবিকা, প্রত্যেককে ঐ পাটক হিসেবে, মোট ১২ পাটক; প্রত্যেক মন্দির-চতুষ্টয়ের দুজন মহত্তর-ব্রাহ্মণ, প্রত্যেককে ১ পাটক হিসেবে, মোট ৪ পাটক; প্রত্যেক মন্দির-চতুষ্টয়ের একজন আবেক্ষক (superintendent), প্রত্যেককে ১: পাটক হিসেবে, মোট ৩ পাটক; প্রত্যেক মন্দির চতুষ্টয়ের একজন কায়স্থ বা লেখক, প্রত্যেককে ২২ পাটক হিসেবে, মোট ৫ পাটক; প্রত্যেক মন্দির-চতুষ্টয়ের একজন গণক, প্রত্যেককে ১ পাটক হিসেবে, মোট ২ পাটক; এবং প্রত্যেক মন্দির-চতুষ্টয়ের একজন চিকিৎসক, প্রত্যেককে ৩ পাটক হিসেবে, মোট ৬ পাটক; সর্বমোট ২৮০ পাটক।
আগেই বলা হয়েছে, তৃতীয় প্রস্থ ভূমি দান করা হয়েছিল ছ-হাজার ব্রাহ্মণকে, প্রত্যেককে সম পরিমাণে। এই ছ-হাজারের ভেতর ৩৫ জন ব্ৰাহ্মণ প্রমুখের নাম দেওয়া আছে; ঐদের মধ্যে কয়েকজনের নামের শেষাংশ বা অন্তঃনাম (পদবী নয়) নাগ, দত্ত, নন্দী, পাল, ধর, ঘোষ, দাস, সোম, গুপ্ত, কর ইত্যাদি দেখে মনে হয়, এই ধরনের শেষাংশ থেকেই বোধ হয়। পরবর্তীকালে অব্রাহ্মণ বাঙালীদের, বিশেষ করে কায়স্থ ও বৈদ্যদের, পদবীগুলোর সূচনা হয়ে থাকবে।
কিন্তু সে যাইহোক, এই পট্টোলী থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেল। যা প্রাচীন বাঙলার ধর্ম ও সমাজ এবং শিক্ষা-দীক্ষার উপর নূতন আলোকপাত করেছে। ব্ৰহ্মা ও অগ্নি স্বাধীন স্বতন্ত্র পূজা ও মঠ, জৈমনি বা জৈমিনির দেবত্ব, পূজা ও মঠ ধর্মের দিক থেকে নূতন সংবাদ। শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে দশম শতকে ব্ৰাহ্মণদের সুবৃহৎ উপনিবেশ স্থাপন সমাজেতিহাসের দিক থেকে গভীর অর্থবহ। দেশান্তরীয় ও বঙ্গলদের জন্য পৃথক পৃথক মঠ প্রতিষ্ঠাও কম অর্থবহ নয়। শিক্ষার দিক থেকে দেখতে পাচ্ছি, দশম শতাব্দীতে শ্ৰীহট্টে চন্দ্ৰগোমিনের চান্দ্র-ব্যাকরণের প্রচলন ও চতুৰ্ব্বেদের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। কিন্তু সবচেয়ে যা অর্থবহ তা হচ্ছে ব্ৰহ্মপুর শ্ৰীচন্দ্রপুরের মতন একটি সুবৃহৎ ধর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা।
পশ্চিমভাগ পট্টোলীর পূর্ণমৃলো পাঠোদ্ধার ও যথার্থ ব্যাখ্যা করেছেন অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সরকার। দীনেশচন্দ্র বলেছেন, এ-ধরনের সুবিস্তীর্ণ, সুবৃহৎ ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ লিপিমালায় আর পাওয়া যায় না; উত্তর-ভারতে আর কোথাও এ-ধরনের প্রতিষ্ঠান ছিল বলে আজও জানা যায়নি। আছে শুধু দক্ষিণ-ভারতে, যেমন, অন্ধুপ্রদেশে তিরুমালয়-তিরুপতির শ্ৰীবেংকটেশ্বর দেবস্থানে। দক্ষিণ-ভারতের একাধিক লিপিতেও যে এই ধরনের ধর্ম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ আছে, দীনেশচন্দ্ৰই তা দেখিয়েছেন। তার পাঠোদ্ধার, বর্ণনা ও ব্যাখ্যার উপরই আমার উপরোক্ত বিশ্লেষণের নির্ভর। আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত এবং তার প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞ।
পাঠ্যপঞ্জি ll Sircar, D.C., Epigraphic Discoveries in East Pakistan, Calcutta, 1973, pp. 19-40.
১৪. শিল্পকলা
০১. যুক্তি – শিল্পকলা
ভাষা-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষায় যে সংস্কৃতি প্রতিফলিত তাহার পশ্চাতে সচেতন বুদ্ধির ক্রিয়া প্রত্যক্ষ। কিন্তু সংস্কৃতির এমন প্রকাশও আছে যেখানে বুদ্ধির লীলা সক্রিয় থাকিলেও তাহা প্রত্যক্ষ ভাবে দেখা যায় না, কিংবা বুদ্ধিই সেখানে একমাত্র নিয়ামক নয়। সংস্কৃতির সেই প্রকাশ ধরা পড়ে চারুকলায় ও সংগীতে এবং এ-দুয়েরই প্রধান উৎস ও আবেদন মানুষের বোধ, বুদ্ধি ও বোধির ক্ষেত্রে। এ-বিষয়ে ভাষা-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানাপেক্ষা চারুকলা ও সংগীতের আবেদন একদিকে যেমন সূক্ষ্মতর, অন্যদিকে তেমনই প্রত্যক্ষতার এবং পরিধি হিসাবে বিস্তৃততর, বোধ হয়, গভীরতরও বটে।
উপাদান
কিন্তু আদিম লোকায়ত বাঙালীর চারুকলা বা সংগীত সম্বন্ধে উপাদান’ অভাবে কিছু বুলিবার উপায় নাই। সাংস্কৃতিক নরতত্ত্বের গবেষণার কাজও এমন কিছু অগ্রসর হয় নাই যে, সেদিক হইতে কিছু সাহায্য পাওয়া যাইতে পারে। চারুকলার কিছু কিছু উপাদান যদিও-বা পাওয়া যায়, একেবারে শেষ পর্বের আগে সংগীত সম্বন্ধে কোনও কথাই বলা যায় না। অথচ গুহাবাসী অরণ্যচারী মানুষেরও প্রাথমিক সাংস্কৃতিক প্রকাশ তো গানেই। এই গানের ভিতর দিয়াই তো সে তাহার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা বাক্ত করে। আদিম কৌম বাঙালীও– রাঢ়-পুণ্ডু-বঙ্গ-সুহ্ম। প্রভৃতি জনপদবাসীরাও তাহাই করিত, সন্দেহ নাই। কিন্তু সেই গানের কী ছিল রাগ-রাগিণী, কী ছিল সুর, তাল, লয়, মোন কিছুই আমরা জানি না, কেহ তোহা লিখিয়াও রাখে নাই। পরবর্তী কালে, একেবারে দশম-দ্বাদশ শতকে যে সব রাগ-রাগিণী, তাল-লিয়ের পরিচয় পাইতেছি, তাহা তো একান্তই সভা, সংস্কৃতিপুত চিণ্ডের প্রকাশ, প্রধানত আৰ্যমানসের প্রকাশ, যে আর্যমানসে অন্তত কিছুটা পরিমাণে বহির্ভারতীয় সংস্কৃতির স্পর্শও লাগিয়াছে। কিন্তু, তাহাতে ক্টোম বাঙালীর লোকায়াত সংগীতের প্রভাবও পড়ে নাই, এ কথাও বলা যায় না, বরং তাহার সুস্পষ্ট প্রমাণও আছে। সে সব কথা পরে বলিতেছি। আজিকার দিনেও বাঙালীর বাউল, ভাটিয়াল, ঝুমুর গানে যে সংস্কৃতির প্রকাশ এবং যাহা আজও বিশুদ্ধ মাৰ্গ-সংগীতের পর্যায়ে স্থান লাভ করে নাই, সেই সব গানে কৌম বাঙালীর লোকায়াত সংগীতের ধারাই তো বহমান, এ কথা কোনও তথ্যগত প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না, এবং এই লোকায়ত সংগীতকেই রবীন্দ্রনাথ তাঁহার অসংখ্য গানে উচ্চস্তরে সাংগীতিক মর্যাদা দান করিয়াছেন।
