সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থে জয়দেবের ৩১টি শ্লোক উদ্ধার করা হইয়াছে; তন্মধ্যে ৫টি মাত্র গীতগোবিন্দ হইতে, এ-কথা আগেই বলিয়াছি। অনুমান হয়, তিনি অন্য এক বা একাধিক কাব্যও রচনা করিয়াছিলেন। জয়দেবের রচিত দুইটি কবিতা শিখদের শ্ৰীগুরুগ্ৰন্থ বা গ্ৰন্থসাহেব (ষোড়শ শতক) স্থান পাইয়াছে, তন্মধ্যে একটি যোগমার্গের পদ। সদুক্তিকর্ণামৃতে কল্কির উপরও জয়দেব-রচিত একটি পদ আছে।
জয়দেবের পিতার নাম ছিল ভোজদেব, মাতা রামাদেবী (পাঠান্তরে, বামাদেবী, রাধাদেবী); তাহার জন্মস্থান কেন্দুবিন্ধ (অজয়-নদের তীরে কেদুঁলি গ্রাম)। স্ত্রীর নাম বোধ হয় ছিল পদ্মাবতী। কবির বন্ধু এবং তাঁহার গানের দোহার বা গায়েন ছিলেন পরাশর। জয়দেবের সম্বন্ধে নানা কাহিনী সমগ্র উত্তর-ভারতে প্রচলিত; নাভাজী দাসের ভক্তমাল (সপ্তদশ শতক)-গ্রন্থে ও চন্দ্ৰদত্তের ভক্তমালায় কিছু কিছু এই সব কাহিনীর বিবৃতি আছে। কাহিনীগুলির মধ্যে পদ্মাবতীর কাহিনী সুপরিচিত। পদ্মাবতীর পিতার ইচ্ছা ছিল কন্যাকে দেবদাসীরূপে জগন্নাথ-মন্দিরে সমর্পণ করিবেন, কিন্তু নারায়ণকর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হইয়া জয়দেবের সঙ্গে তাহার বিবাহ দেন। ‘দেহিপদপল্লবমুদারম’-সংক্রান্ত আখ্যায়িকাটিও বাঙলাদেশে সুপরিচিত। গীতগোবিন্দের দুইটি পদে পদ্মাবতীর নামোল্লেখ আছে; এক জায়গায় পাইতেছি “পদ্মাবতী-রমণ-জয়দেব কবি”; অন্য জায়গায় আছে, “পদ্মাবতী-চরণচারণচক্রবর্তী”। জয়দেব গীতগোবিন্দের পদ গাহিতেন এবং পদ্মাবতী সঙ্গে সঙ্গে তালে তালে নাচিতেন, এই জনশ্রুতি ষোড়শ শতকেই স্বীকৃতিলাভ করিয়াছিল। সেকশুভোদয়া গ্রন্থেও জয়দেব-পদ্মাবতীর সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। বাঙলাদেশের বাহির হইতে জনৈক সংগীতজ্ঞ বুঢ়নমিশ্র সেন-রাজসভায় আসিয়া জয়দেবকে সঙ্গীত-প্রতিযোগিতায় আহ্বান করেন; জয়দেবপত্নী পদ্মাবতী তাহাকে পরাজিত করিয়াছিলেন। পদ্মাবতী যে গীতিনৃত্যনিপুণা ছিলেন তাহা তাহার পিতার দেবদাসীরূপে কন্যাকে সমর্পণের বাসনায়, গীতগোবিন্দের শ্লোকে ‘পদ্মাবতীচরণ চারিণীচক্রবর্তী’ ও নাভাজী দাসের ‘পদ্মাবতীসুখজনকরবি’ এই আখ্যায় এবং সেকশুভোদয়ার এই গল্প হইতেই অনুমান করা যায়। এই সব সুবিস্তৃত কাব্য-সাহিত্য এবং প্রকীর্ণ শ্লোকাবলী ছাড়াও সেনা-বর্মণ রাজসভায় অলংকারবহুল উচ্ছসিত কাব্য রচনার পরিচয় পাওয়া যায় রাজকীয় লিপিগুলির প্রশস্তি শ্লোকাবলীতে, এবং এই সব শ্লোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই রাজসভাকবিদের দ্বারা রচিত। ভবদেব-প্রশস্তির কথা আগেই বলিয়াছি। বিজয়সেনের বারাকপুর-প্রশস্তি, বল্লালসেনের নৈহাটি-প্রশস্তি লক্ষ্মণসেনের আনুলিয়া, গোবিন্দপুর ও তৰ্পণদীঘি-শাসনের প্রশস্তি প্রভৃতি সমস্তই সমসাময়িক কবি-প্ৰতিভার সাক্ষ্য বহন করে।
০৭. সংযোজন – দশম শতকের একটি ধর্ম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তুতে নূতন সংযোজনের প্রয়োজন আছে, এমন অর্থবহ তথ্যের আবিষ্কার ইতিমধ্যে তেমন কিছু হয়নি, একটি মূল্যবান তথ্য ছাড়া। সে-তথ্যটির উল্লেখ করছি একটু পরেই, এবং কিছুটা বিশদভাবেই। এখানে সেখানে দু-একটি নূতন লেখক বা পণ্ডিতের, নূতন দু-একটি গ্রন্থের সংবাদ যে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন নয়, তবে তার ইঙ্গিত এমন নয় যে নূতন সংযোজন প্রয়োজন হয়, যেহেতু তাতে তথ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি হয় মাত্র, নূতন অর্থ সংযোজিত হয়। না। সুতরাং সে-জাতীয় তথ্য আমি আর উল্লেখ করছি না।
তবে, দশম শতাব্দীর প্রাচীন বাঙলার পূর্বতম একটি প্রান্তের এমন একটি তথ্য ইতিমধ্যে জানা গেছে যা বাঙালীর ইতিহাসের দিক থেকে আমি যথেষ্ট মূল্যবান বলে মনে করি। তথ্যটি জানা যাচ্ছে পুণ্ড্রবর্ধন-বঙ্গ-সমতটাধিপতি চন্দ্ৰবংশীয় পরামসৌগত পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ শ্ৰীচন্দ্রদেবের পঞ্চম রাজ্যান্ধে পট্টীকৃত একটি ভূমিদান-পট্টোলী থেকে। পট্টোলীটি পাওয়া গেছে শ্ৰীহট্ট জেলার পশ্চিমভাগ গ্রাম থেকে; সেজন্য পট্টোলীটি পশ্চিমভাগ-পট্টোলী বলে খ্যাত হয়েছে।
এই পট্টোলীদ্বারা শ্ৰীচন্দ্ৰ পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তর্গত শ্ৰীহট্টমণ্ডলে গরলা, পোগার এবং চন্দ্রপুর বিষয়ে দুই প্রন্থে দু’টি বিস্তৃত ভূমিখণ্ড দান করেছিলেন, প্রথম প্রস্থে ১২০ পাটক, দ্বিতীয় প্রস্থে ২৮০ পাটক। এই বিস্তৃত দুই ভূমিখণ্ড দানের পরও আরও একটি বিস্তৃত ভূমিখণ্ড দান করা হয়েছিল চতুশ্চরণ শাখাধ্যায়ী (চার বেদের বিভিন্ন শাখার ছাত্র ও অধ্যাপক), বিভিন্ন গোত্র ও প্রবর পরিচয়ের ৬০০০ ব্রাহ্মণকে, প্রত্যেককে সম পরিমাণে। তৃতীয় প্রস্থের সমগ্র ভূমিখণ্ডটির পরিমাণ কত তা কোথাও বলা হয়নি। কিন্তু তা না হলেও, অনুমান করা যেতে পারে, সপরিবারে শুধু বসবাস করবার জন্য প্রত্যেকটি ব্রাহ্মণ গৃহস্থের যে নূ্যনতম পরিমাণ ভূমির প্রয়োজন হতে পারে তার ছ-হাজারগুণ ভূমিপরিমাণ স্বল্পায়তন কিছু নয়। তিনটি বিষয়-জোড়া তিনপ্রস্থ এই সুবিস্তৃত ভূমির উত্তরে ছিল কোসিয়ার নদী (–বর্তমান কুসিয়ারা), দক্ষিণে মণি নদী (=বর্তমান মনু নদী), পূর্বে বৃহৎকোট্ট বাধ (কোন সীমা বোঝাচ্ছে বলবার উপায় নেই) এবং পশ্চিম জুৰ্জ্জু ও কণ্ঠপণী খাল (জুজু-বর্তমান ঝর্ণা জুজনংছাড়া; কাষ্ঠপণী যে কোনও খাল বা ছড়া, অর্থাৎ ঋণা, বলবার উপায় নেই) ও বেত্ৰিঘষ্ট্ৰী নদী (=বর্তমান খুঙ্খী নদী)। এই সুনির্দিষ্ট চতুঃসীমা বেষ্টিত ভূমিতে রাজা শ্ৰীচন্দ্ৰ শ্ৰীচন্দ্রপুর নামে একটি সুবৃহৎ “ব্রহ্মপুত্র”, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যাদর্শনুযায়ী একটি আদর্শ ঔপনিবেশিক ধর্ম-সংস্থান সৃষ্টি করেছিলেন। তিন প্রস্থে সুবিস্তীর্ণ ভূমিদানের উদ্দেশ্যই ছিল এই ব্ৰহ্মপুরাণপ্ৰতিষ্ঠা। কিভাবে এই প্রতিষ্ঠা ক্রিয়া হয়েছিল তা এই ভূমিদানের বিবরণের মধ্যেই পাওয়া যাবে।
