শুধু জয়দেবের গীতগোবিন্দই নয়। প্রায় সমসাময়িক কাল বা কিছু পরবর্তী কালে রচিত ব্ৰহ্মবৈবর্ত-পুরাণেও ঘন কামনাবাসনাময় আবহের মধ্যে রাধাকৃষ্ণ-লীলাকে আশ্রয় করিয়া একই সঙ্গে ইন্দ্ৰিয়-কামনা ও প্ৰেমভক্তির জয়-ঘোষণার ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। এ-ক্ষেত্রেও সামাজিক আবহাওয়ার প্রতিফলন অনস্বীকার্য।
কিন্তু পরবর্তী কালে রূপ-গোস্বামীর রাসব্যাখ্যায় প্রভাবান্বিত হইয়া গৌভীয় বৈষ্ণব সমাজ গীতগোবিন্দের মধ্যে নূতন অর্থসন্ধান লাভ করিলেন; গীতগোবিন্দ নূতন মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিল এবং অন্যতম ধর্মগ্রন্থ পর্যায়ে উন্নীত হইল। তাহার আগেই ভক্ত বৈষ্ণবসমাজ এই গ্রহকে কিছুটা ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দান করিয়াছিল। প্রধানত তাহারই ফলে সমগ্র উত্তর-ভারত জুড়িয়া গীতগোবিন্দের প্রতিষ্ঠা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া অব্যাহত ছিল, সমগ্র বৈষ্ণব-সমাজের মধ্যে তো বটেই, অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যেও, বিশেষ ভাবে সেই সব সম্প্রদায়ে যাহাদের প্রধান আশ্রয় ভক্তি ও প্রেম। তাহারই ফলে জয়দেব সহজিয়া সম্প্রদায়েরও আদিগুরু, নব রসিকের অন্যতম রসিক। বল্লভাচারী সম্প্রদায়ও গীতগোবিন্দকে অন্যতম ধর্মগ্রন্থ বলিয়া স্বীকার করেন। বল্লভাচার্যের পুত্র বিঠ্ঠলেশ্বর গীতগোবিন্দের অনুকরণেই তাহার শৃঙ্গাররসমণ্ডন-গ্ৰন্থ রচনা করেন। প্রধানত এই কারণেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন সময়ে গীতগোবিন্দের চল্লিশ খানারও উপর টীকা রচিত হইয়াছে, অনুকরণে দশ-বারোখানা কাব্য রচিত হইয়াছে এবং বিভিন্ন সংকলন-গ্রন্থে বারবার গীতগোবিন্দ হইতে অসংখ্য শ্লোক উদ্ধৃত হইয়াছে। গীতগোবিন্দের জনপ্রিয়তার ইহার চেয়ে বড় সাক্ষ্য আর কী হইতে পারে? গীতগোবিন্দের অন্যতম প্রাচীন প্রসিদ্ধতম টাকা মোবাড়পতি মহারাণা কুম্ভের নামে প্রচলিত রসিকপ্রিয়া (১৪৩৩-১৪৬৮ খ্ৰী.) পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের একটি ওড়িয়া শিলালেখা হইতে (১৪৯৯) জানা যায়, মহারাজ প্রতাপরুদ্রের আদেশে ঐ সময় হইতে গীতগোবিন্দের গান ও শ্লোক ছাড়া জগন্নাথ-মন্দিরে অন্য কোনও গান ও শ্লোক গীত হইতে পারিত না।
গীতগোবিন্দের লোকপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ, ইহার পদ বা গীতগুলির ভাষা। এই কাব্যে প্রাচীন সংস্কৃত কাব্যের ভাষা এবং পরবর্তী ও সমসাময়িক কালের অপভ্রংশ ও ভাষা-কাব্যের ভাষা এক উদ্বাহ বন্ধনে আবদ্ধ। আখ্যায়িকা বা বর্ণনামূলক অংশ সংস্কৃত কাব্যের ধারা অনুসরণ করিয়াছে- ভাবে, ভাষায় ও শব্দে; কিন্তু পদ বা গীতগুলির সমস্ত আবহাওয়াটা অপভ্ৰংশ ও ভাষা থকাব্যের; ছন্দ এবং মিলও সেই কাব্যেরই। ছন্দ তো পরিষ্কার মাত্রাবৃত্ত, সংস্কৃত কাব্যের অক্ষরবৃত্ত নয়। ছত্রের অন্ত্য এবং আভ্যন্তর অক্ষরের মিলও অপভ্রংশ ও ভাষা-কাব্যের রীতি অনুসরণ করিয়াছে। শ্লোকগুলি একে অন্য হইতে বিচ্ছিন্ন নয়; অন্ত মিল এবং ধুয়া মিলিয়া প্রত্যেকটি গীতাংশের একটি সমগ্র রূপ খুব সুস্পষ্ট। এই সমগ্র রূপ একান্তই ভাষা-কাব্যের বৈশিষ্ট্য; সংস্কৃতে এই রূপ অনুপস্থিত। সেই জন্যই মনে হয়, কাব্যের এই রূপ জয়দেব গ্রহণ করিয়াছিলেন লোকায়ত চলিত ভাষা-সাহিত্য হইতে। জযদেবের কালে সংস্কৃত কাব্য ও নাট্য-সাহিত্যের অবস্থা বদ্ধ জলাশয়ের মতো; জয়দেবই বোধ হয় সর্বপ্রথম সেই সাহিত্যে নূতন স্রোত সঞ্চার করিলেন, লোকায়ত চলিত-সাহিত্যের গান ও গীতিনাট্যের খাত কাটিয়া। সেই লোকায়ত ভাষা-সাহিত্যে গান ও অভিনয় লইয়া এক ধরনের যাত্ৰা প্ৰচলিত ছিল এবং এই সময়ের সংস্কৃত কাব্য-সাহিত্যে তাহার প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট, ভাষা এবং সাহিত্যরূপ উভয়ত। রামকৃষ্ণের গোপালকেলিচন্দ্ৰিকা, উমাপতি-উপাধ্যায়ের পারিজাত-হরণ, মহানাটক প্রভৃতি সমস্তই এই ভাষা সাহিত্যরূপের নিদর্শন; কিন্তু গীতগোবিন্দ ইহাদের সকলের আদিতে।
সমসাময়িক কালে একদিকে সেনা-রাজসভা ও উচ্চকোটির সমোজস্তর এবং অন্যদিকে ঘনায়মান অন্ধকারের প্রেক্ষাপটে জয়দেব গীতগোবিন্দ রচনা করিয়া সামাজিক কর্তব্য পালন করিয়াছিলেন। কিনা সে-সম্বন্ধে প্রশ্ন অনিবার্য হইলেও, জয়দেব যে যুগন্ধর ও সৃষ্টিধর কবি ছিলেন এবং তাঁহার গীতগোবিন্দ যে ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকাব্য, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। প্রথমত, তাহার লেখনীতে সংস্কৃতে কাব্যভাষার অপভ্রংশ ও ভাষাধর্মী সদ্যোক্ত রূপান্তর প্রায় বৈপ্লবিক বলিলেও চলে। দ্বিতীয়ত, অলৌকিক দেবকাহিনী ও লৌকিক প্রেমগাথার এরূপ সমন্বয় ইতিপূর্বে ভারতীয় সাহিত্যে আর দেখা যায় নাই; গীতগোবিন্দের এই সমন্বয় ধারায়ই পরবর্তী বৈষ্ণব মহাজন-পদাবলীর উদ্ভব। এই সমন্বয়ই মধ্যযুগের হিন্দু সাংস্কৃতিক নবজাগরণের মধ্যযুগীয়হিউম্যানিজমের মূলে। অলৌকিক দেবতাদের এইরূপ মানবীকরণের ইঙ্গিত বহুলভাবে জয়দেবই প্রথম সূচনা করিলেন। অন্য কবিদের রচিত সদুক্তিকর্ণামৃতের দু’চারটি প্রকীর্ণ শ্লোকেও সে-ইঙ্গিত কিছু কিছু পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, সন্দেহ নাই, গীতগোবিন্দ একান্তই গীতিকাব্য, কিন্তু তৎসত্ত্বেও স্বীকার করিতেই হয়, লোকায়ত নাট্যাভিনয়ের (যাত্রার?) নাটকীয় লক্ষণও কিছুটা এই কাব্যে বর্তমান, বিশেষত রাধার সখীদের অথবা স্বয়ং রাধা ও কৃষ্ণের কথোপকথনাত্মক গীতাংশে। বস্তুত, গীতগোবিন্দে বর্ণনা-বিবৃতি, আলাপ বা কথোপকথন, এবং গীত এই তিনটি একসঙ্গে একই কাব্য বা সাহিত্যরূপের মধ্যে সমন্বিত। এই রূপও একান্তই অভিনব এবং সংস্কৃত সাহিত্যে অজ্ঞাত। চতুর্থত, কাব্যটির বিষয়বস্তু ধৰ্মগত, কিন্তু লৌকিক ইন্দ্ৰিয়কামনার এমন রসাবেশময় ব্যঞ্জনা সংস্কৃত-সাহিত্যে বিরল। বস্তুত মৌলিক যৌনকামনার এমন অপূর্ব ভক্তিরসময় রূপান্তর মধ্যযুগীয় বাঙলার পদাবলী-সাহিত্য ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। পঞ্চমত, গীতগোবিন্দ একাধারে পদ-কাব্য (মধুর কোমলকান্ত পদাবলীং) এবং মঙ্গলকাব্য (শ্ৰীজয়দেব কবেবিদন কুরুতে মুদং মঙ্গলম উজ্জ্বল-গীতি), এবং এই হিসাবে পরবর্তী বাঙলা পদাবলী-সাহিত্য এবং মঙ্গলকাব্য-সাহিত্য এই দুই সাহিত্যধারার আদিতে গীতগোবিন্দের স্থান।
