জয়দেব ও গীতগোবিন্দ
গীতগোবিন্দ-রচয়িতা জয়দেব এ-যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, এবং প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবের দিক হইতে স্বল্প সংখ্যক সর্বভারতীয় কবিদের মধ্যে অন্যতম। ষোড়শ শতকে সন্ত কবি নাভাজী দাস তাহার ভক্তমাল-গ্রন্থে জয়দেবের প্রশস্তি গাহিয়া বলিতেছেন,
জয়দেব কবি নৃপচক্কবৈ, খণ্ড মণ্ডলেশ্বর আনি কবি।৷
প্রচুর ভয়ো তিহুঁ লোক গীতগোবিন্দ উজাগর।
কোক-কাব্য নবরস-সরস-শৃঙ্গার-কে আগার৷।
অষ্টপদী অভ্যাস করৈ, তিহি বুদ্ধি বঢ়াবৈ।
রাধারমণ প্ৰসন্ন হাঁ নিশ্চৈ আবৈ৷।
সন্ত-সরোরুহ-খণ্ড-কৌ পদুমাবতি-সুখ-জনক রবি।
জয়দেব কবি নৃপচক্কবৈ, খণ্ড মণ্ডলেশ্বর আনি কবি৷।
কবি জয়দেব হইতেছেন চক্রবর্তী রাজা, অন্য কবিগণ খণ্ড মণ্ডলেশ্বর মাত্র। তিন লোকে গীতগোবিন্দ প্রচুর ভাবে উজাগর বা উজ্জ্বল হইয়াছে। ইহা একাধারে কোকশাস্ত্ৰ, কাব্য, নবরাস ও সরস শৃঙ্গারের আগার স্বরূপ। যে এই গ্রন্থের অষ্ট্রপদী অভ্যাস করে তাহার বুদ্ধি বধিত হয়; রাধারমণ প্ৰসন্ন হইয়া শুনেন এবং নিশ্চয় সেখানে আসিয়া বিরাজিত হ’ন! সন্তরীপ কমলদলের পক্ষে তিনি পদ্মাবতী-সুখ-জনক রবি। কবি জয়দেব চক্রবর্তী রাজা, অন্য কবিগণ খণ্ড মণ্ডলেশ্বর মাত্র।
এই পর্বে এবং পরবর্তী কালেও জয়দেবের কবি-চক্রবর্তীত্বে প্রতিযোগিতার স্পর্ধ রাখেন, সত্যই এমন কেহ বড় একটা নাই। তবে, নাভাজী দাস যে তাহাকে কবি-চক্রবর্তী রাজা বলিতেছেন,তাহা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক মধুর কোমলকান্ত কাব্য গীতগোবিন্দের রচয়িতা হিসাবেই, যথার্থ কবি-প্রতিভার জন্য কিনা তাহা উদ্ধৃত পদগুলি হইতে বুঝা যাইতেছে না। নাভাজীর উক্তি বৈষ্ণব সন্তের স্বতস্ফুর্ত ভক্তি ও প্রেমে অনুপ্রাণিত, কাব্য ও সাহিত্য বোদ্ধার উক্তি বোধ হয় নয়। বস্তুত, সর্বভারত জুড়িয়া জয়দেবের খ্যাতি যেন একান্তই ভক্ত বৈষ্ণব সাধক কবিরূপে, এবং গীতগোবিন্দ যেন সেই সাধকের দৃষ্টিতে রাধাকৃষ্ণ লীলা প্রত্যক্ষ করিবার কামমধুর ভক্তিরসময় উপায়। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার উপর শ্রুতিমধুর, শৃঙ্গার-ভাবনাময়, রসাবেশময় গানের রচয়িতা হিসাবে জয়দেবের পক্ষে রসিক বৈষ্ণব-সমাজে এবং জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠালাভ সহজেই সম্ভব হইয়াছিল; এবং পরে একবার যখন গীতগোবিন্দ চৈতনোত্তর গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম মূল প্রেরণা বলিয়া স্বীকৃত হইল। তখন গীতগোবিন্দ হইয়া উঠিল ধর্মগ্রন্থ এবং জয়দেব হইলেন দিব্যোন্মাদ সাধক। অথচ, জয়দেব একান্তই তাহা ছিলেন না, আমাদের প্রচলিত ধারণার ভক্তি ও প্রেমোন্মাদ বৈষ্ণবও ছিলেন না। আমি আগেই বলিয়াছি, তিনি ছিলেন সাধারণ ভাবে পঞ্চোপাসক স্মার্ত ব্ৰাহ্মণ; কল্কি এবং মহাদেবও তাঁহার অকুণ্ঠ স্তুতিপূজা লাভ করিয়াছেন; তিনি যোগমার্গ সাধনার উপর কবিতা লিখিয়াছেন, শৌর্য-বীৰ্য্য-যুদ্ধ-তুৰ্য্য-সংগ্রামের উপরও কাব্য তিনি রচনা করিয়াছেন। সেই জয়দেব গীতগোবিন্দও রচনা করিয়াছিলেন, এবং সন্দেহ নাই, এ-রচনা একান্তভাবে লক্ষ্মণসেনের রাজসভার জন্য, যে-রাজসভায় রাধাকৃষ্ণর প্রেমলীলা এবং নানা প্রকারের কামকল্পনা-ভাবনাকে আশ্রয় করিয়া প্রতি সন্ধ্যায় বাররামাদের নৃত্যগীত হইত, এবং নবদ্বীপকৃষ্ণ লক্ষ্মণসেন পাত্ৰমিত্রদের লইয়া সেই নৃত্যগীত উপভোগ করিতেন। গীতগোবিন্দ, আর্য-সপ্তশতীর শৃঙ্গার রসসমৃদ্ধ শ্লোক, পবনদূত সমস্তই সেই রাজসভার বিলাসলীলাসময় সংস্কৃতির সঙ্গে আচ্ছেদ্য সম্বন্ধে যুক্ত। বাঙলা দেশ যখন অর্ধেক মুসলমানদের করতলগত তখনও বিক্রমপুরে কেশবসেনের রাজসভায় একই বৃন্দাবনলীলা অব্যাহত। ধোয়ী, জয়দেব, গোবর্ধনাচার্যের মতো প্ৰতিভাও সেই ইন্ধনে আহুতি দিবার লোভ সংবরণ করিতে পারেন নাই; অথচ সেই রাজসভার বাহিরে অন্য রসের কাব্যও তাহারা রচনা করিয়াছেন।
আসল কথা, এই পর্বের বাঙলাদেশে রাজসভায়, সামন্ত-সভায়, উচ্চতর সম্প্রদায়গুলির বহির্বাটিতে, এক কথায় উচ্চকোটি সমাজের সামাজিক আবহাওয়াটাই এই ধরনের। অন্যত্র সে-ইঙ্গিত ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি। সংস্কৃতির কথা বলিতে বসিয়া আরও কয়েকটি তথ্যের ইঙ্গিত অন্বেষণ করা যাইতে পারে। ধোয়ীই হউন, আর শ্ৰীধরদাসই হউন, জয়দেবই হউন, আর উমাপতি-ধরই হউন, সকলেই লক্ষ্মণসেনের স্তৃতি যখন গাহিয়াছেন তখন অনিবাৰ্য্যভাবেই যেন তাঁহার তুলনা করিয়াছেন কৃষ্ণের সঙ্গে এবং সে-কৃষ্ণ মহাভারতের শ্ৰীকৃষ্ণ নহেন, মথুরা-বৃন্দাবনের রাধালীলাসহচর কৃষ্ণ। শুধু তাঁহাই নয়, সর্বত্রই, এমন কি কাশী-কলিঙ্গ-কামরূপের যুদ্ধক্ষেত্রেও তাহার সঙ্গে কেলি-লীলা যেন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত; যেখানে লক্ষ্মণসেন সেখানেই ‘কেলি’ তাহা রাজকীয় লিপিতেই হউক, বা কবির স্তুতিতেই হউক। এ-তথ্যের ঐতিহাসিক ইঙ্গিত অবহেলা বস্তু নয়। দ্বিতীয়ত, শ্ৰীহর্যের নৈষধ-চরিত বা ধোয়ীর পবনদূত, জয়দেবের গীতগোবিন্দ বা গোবর্ধনের সপ্তশতী সর্বত্রই যেন শৃঙ্গার রসের প্রাবল্য একটু বেশি, কমলালসময় ভাবনা কল্পনার দিকে আকর্ষণ প্রবল, রুচি তরল এবং ইন্দ্ৰিয়বিলাসী। সাহিত্যের এই চিত্ৰ সাধারণ ভাবে সমসাময়িক সমাজের প্রতিফলন, সন্দেহ কি, এবং এই সমাজ রাজসভাপুষ্ট অভিজাত সমাজ। কারণ, এই সমাজের বাহিরে বৃহত্তর যে সমাজ তাহার প্রতিফলনও সমসাময়িক সংস্কৃত কাব্য-সাহিত্যে কিছু কিছু আছে; সে-সাহিত্য এমন ভাবে শৃঙ্গার রসে জারিত নয়, এমন কামলালসময় ভাবনা-কল্পনা দ্বারা অভিসিঞ্চিত নয়। তাহার দৃষ্টান্ত সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, এবং সে-সব দৃষ্টাস্তের মধ্যে ধোয়ী, জয়দেব, গোবর্ধন, উমাপতির শ্লোকও নাই, এমন নয়। তৃতীয়ত, এ-যুগের কাব্য-সাহিত্যে ধ্বনিতত্ত্বের প্রভাব আর নাই; এ-যুগ দণ্ডী-ভামহের যুগ নয়, মৰ্ম্মট-ভট্টের রসাতত্ত্বের যুগ; রস-ই এ-যুগের কাব্যে প্রধান গুণ বলিয়া কীর্তিত। সেনা-রাজসভায় এবং সমসাময়িক অভিজাত স্তরে সেই রসই কামদহনে মদ্যের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। গীতগোবিন্দেও কিছুটা পরিমাণে সেই মদ্যই পরিবেশিত হইয়াছে, অন্তত শেষতম সর্গে। অর্বাচীন জৈন-গ্রন্থে, লোকস্মৃতিতে লক্ষ্মণসেন সম্বন্ধে যে-সব কাহিনী বিধূত, রাজকীয় লিপিমালায় এবং সমসাময়িক সভা-সাহিত্যে সেন-রাজসভার এবং উচ্চকোটিস্তরের যে-চিত্র দৃষ্টিগোচর তাহার সঙ্গে গীতগোবিন্দের নৃত্যগীতলাস্যবিলাসময়, কামভাবনাময় তরল রসের কোথাও কোনও অমিল নাই। রাজসভার সুর ও আবহের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করিয়া নৃপতি ও সভাসদদের রসাবেশনিমীলিত চক্ষুর দিকে দৃষ্টি রাখিয়া জয়দেব গীতগোবিন্দ এবং গোবর্ধন সপ্তশতী রচনা করিয়াছিলেন।
