আর্তিহরপুত্র, সর্বানন্দ দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে আমরকোয্যের যে টীকা রচনা করিয়াছিলেন তাহাতে অন্যান্য গ্রন্থের সঙ্গে বাঙালী কবির রচনা হইতেও কিছু কিছু শ্লোক উদ্ধার করা হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে সাহিত্যকল্পতরু, দেবীশতক, বিদগ্ধমুখমণ্ডল, বৃন্দাবনষমক, বাসনামঞ্জরী (শ্ৰীপোবোক-রিচিত) প্রভৃতি গ্ৰন্থ বাঙালী কবির রচনা বলিয়াই তো মনে হয়। সর্বানন্দ নিজেও ছিলেন কবি, এবং তাঁহার টীকাসর্বম্বের প্রথম শ্লোকেই তিনি যে গোপাল-বন্দনা করিয়াছেন তাহাতে তাঁহার কবি-প্রতিভা কিছুটা প্ৰতিফলিত।
বহিণ বৰ্হপীড়ঃ সুষিরপরো বালীবল্লবো গোষ্ঠে।
মেদুরমুদিরশামলারুচিবাদেয গোবিন্দঃ ॥
এইবার সেন-রাজসভার পঞ্চরত্ন অর্থাৎ শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতি-ধর এবং জয়দেবের কথা একটু বিশদভাবে পৃথক পৃথক করিয়া বলা যাইতে পারে।
শরণ
শরণ বা শরণদেবের ২০টি শ্লোক সদুক্তিকর্ণামৃতে (বা সুক্তিকর্ণামৃতে) উদ্ধার করা হইয়াছে; তন্মধ্যে একটি শ্লোকে শরণ জনৈক সেনা-বংশতিলকের রাজত্বে বাসের ইঙ্গিত দান করিয়াছেন; অপর একটি শ্লোকে গৌড়লক্ষ্মী-প্রসঙ্গে চেদি, কলিঙ্গ কামরূপ এবং ম্লেচ্ছরাজের পরাজয়ের ইঙ্গিত আছে (এই শ্লোকটি রাজবৃত্ত-প্রসঙ্গে উদ্ধার করিয়াছি)। জয়দেব বলিতেছেন, “শরণঃ শ্লাঘ্যে দুরূহ-দ্রুতে”– কবি শরণ দুরূহ দ্রুত শ্লোকবন্ধনে শ্লাঘ্য ও প্রশংসনীয়।
ধোয়ী কবিরাজ
ধোয়ী (বা ধোই, ধোয়ীক, ধূয়ী)-কবিরাজ সম্বন্ধে জয়দেব বলিতেছেন, “বিশ্রুতঃ শুতিধরে ধোয়ী কবি-ক্ষমাপতিঃ”। ধোয়ী সাধারণত পবনদূত-কাব্যের রচয়িতা হিসাবেই প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। কালিদাসের মেঘদূতের আদর্শে যত দূতকাব্য পরবর্তী কালে রচিত হইয়াছে তন্মধ্যে পবনদূত প্রাচীনতম। মন্দাক্রান্তা ছন্দে। ১০৪টি শ্লোকে ধোয়ী সুকৌশলে তাহার পৃষ্ঠপোষক লক্ষ্মণসেনের স্তুতিবাদ করিয়াছেন। লক্ষ্মণসেন নাকি দক্ষিণ-দেশে গিয়াছিলেন; সেখানে কুবলয়াবতী নামী এক গন্ধৰ্ব্ব-কন্যা তাহার প্রতি প্রেমাসক্ত হইয়াছিলেন। দক্ষিণা-মলয়াবায়ুকে দূত করিয়া বিরহিনী কুবলয়াবতী লক্ষ্মণসেনের নিকট প্রেমবার্তা প্রেরণ করিতেছেন, ইহাই পবনদূতের বিষয়বস্তু। কাব্যটির মৌলিকত্ব বিশেষ কিছু নাই, ভাব-গভীরতার পরিচয়ও স্বল্পই, তবে কোনও কোনও শ্লোকের চিত্র-গরিমা এবং কল্পনার মাধুর্য চিত্তকে স্পর্শ করে। ধোয়ী নিজেই বলিতেছেন, পবনদূত ছাড়াও তিনি অন্য একাধিক কাব্য রচনা করিয়াছিলেন; কিন্তু সে-সব কাব্য আমাদের হাতে আসিয়া পৌছায় নাই। তবে, সাদণ্ডি-কর্ণামতে তাহার রচিত ২০টি শ্লোক আছে, এবং জহলণের সূক্তিমুক্তাবলীতে আছে আরও দুইটি; এগুলি তাহার অন্যান্য কাব্যের প্রকীর্ণ শ্লোক হওয়া অসম্ভব নয়।
উমাপতি-ধর
কবি উমাপতি-ধর বল্লালসেনের পিতা বিজয়সেনের দেওপাড়া-প্রশস্তির রচয়িতা; বোধ হয় তিনি সেন-রাজসভার অন্যতম সভাকবি ছিলেন। এই প্রশস্তির চারিটি শ্লোক সদুক্তিকর্ণামৃতে উদ্ধার করা হইয়াছে! এই সংকলনে উমাপতি-পুরের নামেই আর একটি শ্লোক আছে যাহা লক্ষ্মণসেনের মাধাইনগর-পট্টোলীতেও হুবহু একই রূপে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। এই কারণে মনে হয়, মাধাইনগর-লিপিটিরও রচয়িতা ছিলেন উমাপতি-ধর। মেরুভূঙ্গ তাহার প্রবন্ধচিস্তামণি-গ্রন্থে বলিতেছেন, উমাপতি-ধর লক্ষ্মণসেনের অন্যতম মন্ত্রী ছিলেন। মনে হয়, বিজয়সেন হইতে আরম্ভ করিয়া লক্ষ্মণসেন পর্যন্ত তিন পুরুষ ধরিয়া উমাপতি সেন-রাজসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লক্ষণসেনের নবদ্বীপ ছাড়িয়া পূর্ববঙ্গে পলায়নের পরও উমাপতি-ধর জীবিত ছিলেন এবং বিজয়ী ম্লেচ্ছরাজের সাধুবাদ করিয়া স্তুতিশ্লোকও রচনা করিয়াছিলেন! এই শ্লোকটি রাজবৃত্ত-প্রসঙ্গে উদ্ধার করা হইয়াছে। বৃদ্ধ কবির এই পরিণতির কথা অন্যত্র বলিয়াছি; এখানে আর পুনরুক্তি করিয়া লাভ নাই। সদুক্তিকর্ণামৃতে উমাপতি-ধরের নামে ৯১টি শ্লোক আছে। এই সংকলন গ্রন্থেই আর এক উমাপতির নামেও কয়েকটি শ্লোক আছে; এই উমাপতি জনৈক রাজা চাণক্যচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় চন্দ্রচূড়-চরিত নামে একটি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। এই দুই উমাপতি এক এবং অভিন্ন হওয়া বিচিত্র নয়। দেওপাড়া-লিপিতে উমাপতি-ধর সম্বন্ধে বলা হইয়াছে, শব্দজ্ঞান ও শব্দার্থবোধ দ্বারা এই কবি পরিশুদ্ধবুদ্ধি ছিলেন; আর জয়দেব বলিতেছেন, উমাপতি-ধরের লেখনীতে বাক্য যেন পল্লবিত হইত (বাচঃ পল্লবয়তি)।
আচাৰ্য গোবর্ধন
গোবর্ধনাচার্য আর্য-সপ্তশতীর কবি বলিয়াই সর্বভারতে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। এই শৃঙ্গার কাব্যটি জনৈক সোনকুলতিলক ভূপতির পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত হইয়াছিল, এবং এই কাব্যেই খবর পাইতেছি, গোবর্ধনের পিতার নাম ছিল নীলাম্বর। তাঁহার দুই ভ্রাতা ও শিষ্যের নাম ছিল উদয়ন ও বলভদ্র। নীলাম্বর ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে একখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, এবং উদয়ন ও বলভদ্র গোবর্ধন-রচিত কাব্যটি রচনার কাজে সাহায্য করিয়াছিলেন। গোবর্ধন যে সুদক্ষ কবি এবং সুপণ্ডিত ছিলেন তাহা তাহার আচার্য উপাধিতেও প্রমাণ। আর্য ছন্দে রচিত সপ্তশতীর কিঞ্চিদধিক সাতশত শৃঙ্গার শ্লোকও সে-সাক্ষ্য বহন করিতেছে। কবি হালের সরস ও সহৃদয় এবং সূক্ষ্ম ইঙ্গিতময় সহজ প্রকাশের সঙ্গে গোবর্ধনাচার্যের সুচতুর এবং কষ্টকল্পিত কাব্যভঙ্গির আত্মীয়তা সুদূর। তাহা ছাড়া, আর্য ছন্দের স্মৃলিত গতিও শৃঙ্গার রসের ঘন অনুভূতি বা অর্থগৰ্ভ ইঙ্গিতকে ফুটাইয়া তুলিবার যথাযোগ্য বাহন নয়। জয়দেব অবশ্য বলিয়াছেন, ত্রুটিবিহীন শৃঙ্গারকাব্য রচনায় গোবর্ধনাচার্যের কোনও তুলনা ছিল না; কিন্তু ইহাও লক্ষণীয় যে, সদুক্তিকর্ণামৃতের শৃঙ্গারপ্রবাহে বা এই গ্রন্থের অন্যত্র কোথাও আর্য-সপ্তশতীর একটি শ্লোকও উল্পত হয় নাই। জনৈক গোবর্ধনের ছয়টি শ্লোক সদুক্তিতে আছে, কিন্তু ছয়টির একটিও সপ্তশতীর শ্লোক নয়। গোবর্ধনাচার্যের নামের শাঙ্গাধরপদ্ধতি-তে একটি এবং সূক্তিমুক্তাবলীতে একটি শ্লোক উদ্ধৃত আছে; দুটিই আর্যছন্দে রচিত এবং দু’টিই সপ্তশতীর শ্লোক। পদ্যাবলীতে গোবর্ধনাচার্যের নামে চারিটি শ্লোক আছে; তিনটি সপ্তশতীর শ্লোক; চতুর্থটি সপ্তশতীতে নাই, কিন্তু সদুক্তিকর্ণামৃতে আছে জনৈক অজ্ঞাতনানা কবির রচনা হিসেবে। মনে হয়, সংকলয়িতা শ্ৰীধরদাস আর্য-সপ্তশতীর খুব অনুরক্ত পাঠক ছিলেন। বস্তুত, সপ্তশতীর শ্লোকগুলির শৃঙ্গার রস যেন একটু বেশি দেহতাপে তপ্ত!
