সমসাময়িক বাঙলাদেশের সাহিত্যিক আবহাওয়ার চমৎকার নিদর্শন এই গৌড়-বঙ্গীয় কবিদের প্রকীর্ণ শ্লোকগুলি। এই আবহাওয়া রাজসভায় রচিত স্তৃতি-প্রশস্তিতে বা কাব্যে নাই। জয়দেব যে যুদ্ধ বীররসের কবিতা এবং মহাদেবের বন্দনা শ্লোক রচনা করিতেন, গীতগোবিন্দে সে-পরিচয় পাইবার সুযোগ নাই, অথচ সদুক্তিকর্ণামৃতে সে-পরিচয় পাইতেছি। সে-রাজসভায় যে নানা সমস্যাপূরণ লইয়া শ্লোক-রচনার প্রতিযোগিতা খেলা চলিত এ-ইঙ্গিতও পাইতেছি। এই গ্রন্থের কিছু প্রকীর্ণ শ্লোকে এবং এই সব শ্লোকাশ্ৰয়েই জানিতেছি যে, লক্ষ্মণসেন, কেশবসেন, শরণ ও জয়দেব পাল্লা দিয়া রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ রচনা করিতেন। জয়দেব-রচিত মহাদেব স্তুতি-বিষয়ক শ্লোকটি দেখিয়া মনে হয়, তিনি শুধু রাধাকৃষ্ণের লাস্যলীলার কবি ছিলেন না, এমন কি আমাদের প্রচলিত ধারণার বৈষ্ণব সাধক-মহাজনও ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিদ্যাপতির মতো পঞ্চোপাসক স্মার্ত ব্ৰাহ্মণ, এবং তাঁহার জীবনে যুদ্ধ ও বীররসের স্পর্শও লাগিয়াছিল। কবি শরণ বা উমাপতি-ধরও শুধু বিজয়সেন ও লক্ষ্মণসেনের প্রশস্তি ও স্তুতিশ্লোক লিখিয়াই অঁতাহাদের কর্তব্য শেষ করেন নাই; রাজসভার বাহিরে বসিয়া লোকায়াত জীবনের নানা প্রকীর্ণ শ্লোকও রচনা করিয়া ছিলেন। এই গ্রন্থে লক্ষ্মণসেনের ১১টি, কেশবসেনের ১০টি এবং হলায়ুধেরও ৫টি শ্লোক আছে।
সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের নানা শ্লোক এই গ্রন্থের নানা অধ্যায়ে নানা প্রসঙ্গে উদ্ধার ও ব্যবহার করিয়াছি। এই শ্লোকগুলি নানা দিক দিয়া সমসাময়িক বাঙলাদেশের নানা পরিচয় বহন করে; তাহা ছাড়া, সমসাময়িক সাহিত্যিক আবহাওয়ার স্পর্শও ইহাদের মধ্যে পাওয়া যায়। ভবিষ্যৎ বাঙলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির কিছু কিছু আভাসও ইহাদের গর্ভেই নিহিত। একটি অজ্ঞাতনামা কবি (খুব সম্ভব বাঙালী) বিবাহকালে গৌরীর বর্ণনা দিতেছেন
ব্ৰহ্মায়ং— বিষ্ণুরেষ— ত্ৰিদশপতিরসেী।- লোকপালাস্তথৈতে,
জামাতা কোহিত্র? যোহসৌ ভূজগপরিবৃতো ভস্মরূক্ষ্ম কপালী।
হা বৎসে! বঞ্চিতাসীতানভিমতবর প্রার্থনাবীড়িতাভির
দেবীভিঃ শোচ্যমানাপুপচিত পুলক শ্রেয়সে যেহস্তু গৌরী।
এই শ্লোকটিতে পার্বতীর বিবাহের যে-বৰ্ণনা এবং শিবের প্রতি যে মনোভাব তাহারই প্রতিধ্বনি শোনা যায় মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যে, বিশেষ ভাবে ভারতচন্দ্র। কয়েকটি শ্লোকে দরিদ্র শিবের গৃহস্থালী বৰ্ণনা, শিশু কার্তিকেয়ের বেশভূষায় শিবের অনুকরণ, শিবের জটাজুট লইয়া খেলার বর্ণনা প্রভৃতি পড়িতে পড়িতে স্বতই মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যের অনুরূপ ছবিগুলি মনে পড়িয়া যায়। এই শ্লোকগুলি তো বাঙালী কবিদেরই রচনা বলিয়া মনে হইতেছে; ভাবাত্মীয়তা একান্তই ঘনিষ্ঠ। কবি কুলশেখরের চারিটি হরিভক্তি সম্বন্ধীয় শ্লোকে এবং অজ্ঞাতনামা কোনও কবির একটি শ্লোকে চৈতন্যোত্তির গৌড়ীয় বৈষ্ণবের হৃদয়ধ্বনি যেন কানে আসিয়া প্ৰবেশ করে। সন্দেহ নাই, এই শ্লোকগুলির মধ্যে হরিভক্তির পূর্বাভাস দেখা যাইতেছে; সে যে আসে, আসে, আসে। এই গ্রন্থে জয়দেবের ৩১ শ্লোক আছে, তন্মধ্যে ৫টি মাত্ৰ গীতগোবিন্দের শ্লোক, কয়েকটি আছে প্রকীর্ণ শ্লোক, দু’একটি লক্ষ্মণসেনের স্তৃতি-শ্লোক, বাকী সবগুলিই যুদ্ধ, শৌর্য-বীৰ্য, তুর্যনিনাদ, সংগ্রাম, কীর্তি প্রভৃতি সম্বন্ধীয়। সন্দেহ হয়, জয়দেব বীররসেরও একটি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন, এবং এই শ্লোকগুলি সেই কাব্যের; কিন্তু সে-কাব্য আমাদের কালে আসিয়া পৌছায় নাই। লক্ষ্মণসেনের প্রশস্তিমূলক শ্লোকটি এইরূপ:
লক্ষ্মীকেলি-ভুজঙ্গ! জঙ্গমহরে! সংকল্প কল্পদ্রুম!
শ্ৰেয়ঃ সাধকসঙ্গ সঙ্গর কলা-গাঙ্গেয়! বঙ্গপ্রিয়!
গৌড়েন্দ্ৰ! প্রতিরাজরাজক! সভালংকার! কারাপিত–
প্রত্যার্থিক্ষতিপাল! পালক সীতাং! দূক্টোহসি, তুষ্টা বয়ম!
বোধ হয় এই শ্লোকটি কণ্ঠে লইয়াই জয়দেব কেন্দুবিন্ধ হইতে নবদ্বীপে আসিয়া লক্ষ্মণসেনের সমীপে উপস্থিত হইয়াছিলেন! শৃঙ্গার-প্রবাহে উমাপতি-ধরের একটি সুন্দর কাব্যময় শ্লোক আছে; বনবিহার-কালে একটি সুন্দরী নারী পায়ের আঙুলে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া উপরে গাছের ডাল হইতে ফুল পাড়িতেছেন, বাহুমূল ঊর্ধ্বে উত্তোলিত, উর্ধপ্রয়াসে স্তন ঈষদোন্মুক্ত,বসন ঈষদব্যায়ত হইয়া পড়ায় নাভিহ্রদ দেখা যাইতেছে–
দুরোদঞ্চিত বাহুমূলবিলাসচীন প্রকাশস্তনা
ভোগব্যায়ত মধ্যলম্বিবসনানিমুক্তনাভিহ্রদা
আকৃষ্ট্রোজ্বিত-পুষ্পমঞ্জরিরজঃ পাতোবরুদ্ধেক্ষণা
চিম্বত্যাঃ কুসুমং ধিনোতি সুদৃশঃ পাদ্যগ্ৰদুস্থাতনুঃ৷
এই সংকলনে শরণ, উমাপতি-ধর, জয়দেব, গোবর্ধনাচার্য, ধোয়ী-কবিরাজ, লক্ষ্মণসেন, কেশবসেন প্রভৃতিরা তো আছেনই, কিন্তু ইহাদের ছাড়া অগণিত গৌড়-বঙ্গীয় কবিদের সাক্ষাৎও পাইতেছি: জলচন্দ্র, যোগেশ্বর, বৈদ্য গঙ্গাধর, সাঞ্চাধর, বেতাল, ব্যাস-কবিরাজ, কেবাট, পপীপ, (জনৈক) বঙ্গাল, চন্দ্ৰচন্দ্ৰ, গাঙ্গোক, বিম্বোক, শুঙ্গোক ইত্যাদি অনেক অজ্ঞাতনামা কবি। ইহারা সকলেই ছিলেন সমসাময়িক বাঙলার কবি, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার খুব কারণ নাই। বটুদাসের প্রশস্তিময় পাচটি শ্লোক যে পাচজন কবির রচনা তাহারা সকলেই সমসাময়িক বাঙালী, এ-তথ্য সন্দেহ করা বোধ হয় চলে না; এই পাঁচজন হইতেছেন মথু, সাঞ্চাধর, বেতাল, উমাপতি-ধর এবং কবিরাজ-ব্যাস।
