নব্যপ্রস্তরযুগের এই দ্রাবিড়ভাষাভাষী লোকেরাই ভারতবর্ষের নাগর-সভ্যতার সৃষ্টিকর্তা। আর্যভাষায় ‘উর’, ‘পুর’, ‘কুট’ প্রভৃতি নগর-জ্ঞাপক যে সব শব্দ আছে সেগুলি প্রায় সবই দ্রাবিড় ভাষা হইতে উদ্ভূত। রামায়ণে স্বর্ণলঙ্কার বিবরণ, মহাভারতে ময়দানবের গল্প, মহেন-জো-দড়ের নগরবিন্যাসের উন্নত ও সমৃদ্ধ রূপ, ভারতের বিভিন্ন প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ—সমস্তই প্রাক-আর্যভাষী দীর্ঘমুণ্ড দ্রাবিড়ভাষাভাষী নরগোষ্ঠীর নগর-নির্ভর সভ্যতার দিকে ইঙ্গিত করে, এ কথা কতকটা নিঃসংশয়ে অনুমান করা চলে। নগর-নির্ভর সভ্যতা জটিল; এই সভ্যতার উপাদান-উপকরণও বহুল এবং জটিল হইতে বাধ্য। বিচিত্র খনিজ বস্তুর ব্যবহার তাহার অন্যতম প্রমাণ। এই গোষ্ঠীর লোকেরা সোনা, রূপা, সীসা, ব্রোঞ্জ ও টিনের ব্যবহার জানিত; শিলাজতু, নানাপ্রকারের পাথর, জাস্তব হাড়, পোড়ামাটি ও নানাপ্রকার খনিজ ও সামুদ্রিক দ্রব্য ইত্যাদি নিজেদের বিচিত্র প্রয়োজনে অলংকরণে, বিচিত্র রূপে ও রচনায় ব্যবহার করিত। বর্শা, ছুরি, খড়গ, কুঠার, তীর, ধনুক, মুষল, বঁটুল, তরবারি, তীরের ফলা ইত্যাদি ছিল ইহাদের অস্ত্রোপকরণ। পাথরের হলমুখ, চকমকি পাথরের ছুরি ও। কুঠার, নানাপ্রকার ধাতু ও মাটির থালাবাটি ইত্যাদি বিচিত্র রূপের নিত্যব্যবহার্য গৃহোপকরণ, মাটির তৈয়ারি নানাপ্রকারের খেলনা, তামা ও ব্রোঞ্জের দেহসজোপকরণ, খেলার জন্য গুটি ও পাশা ইত্যাদি অসংখ্য, বিভিন্ন ও বিচিত্র উপাদান এই সভ্যতার বৈশিষ্ট্য। গোরুর গাড়িও এই সভ্যতারই দান বলিয়া মনে হয়। সুতাকাটা, কাপড় বোনা তো ইহারা জানিতই। যব ও গম, মাছ, মেষ, শূকর ও কুকুট মাংস ছিল ইহাদের প্রিয় খাদ্যবস্তু; বৃহৎ বৃষ (কুকুদ্বান্), গরু, মহিষ, মেষ, হাতি, উট, শূকর, ছাগল, কুক্কুট বা মুরগি, কুকুর ও ঘোড়া (?) ছিল ইহাদের গৃহপালিত জন্তু। ইহাদের বিলাসদ্রব্যের প্রাচুর্য এবং আরাম উপভোগের উপকরণের যে পরিচয়, নানাপ্রকার হস্ত ও কারু শিল্পের যে পরিচয় সিন্ধু উপত্যকার প্রাগৈতিহাসিক ধ্বংসাবশেষে এবং রামায়ণ-মহাভারতের নানা গল্পের মধ্যে পাওয়া যায় তাহাতেও এক সমৃদ্ধনগর-নির্ভর সভ্যতার দিকে ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। তাম্র-প্রস্তরযুগের চিত্রকলার, জ্যামিতিক রেখাঙ্কন এবং অলংকরণের, মাটির পুতুল ও খেলনায় চারুকলার যে রূপের সঙ্গে আমার পরিচিত তাহারও কিছুটা এই দ্রাবিড়ভাষী দীৰ্ঘমুণ্ড নরগোষ্ঠীরই সৃষ্টি, এ কথা মনে করিবারও যথেষ্ট কারণ আছে। ছোটবড় রাস্তা, জলনিঃসরণের প্রণালী, বড়-ছোট একাধিক তলাবিশিষ্ট ইটকাঠের বাড়ি, দুর্গ, সিঁড়ি, খিলানযুক্ত দরজা, জানালা, স্নানাগার, কুপ, জলকুণ্ড, প্রাঙ্গণ, পূজামন্দির, মৃতদেহ-সৎকার-স্থান প্রভৃতি নগরবিন্যাসের যাহা কিছু অত্যাবশ্যক উপাদান, তাম্র-প্রস্তরযুগীয় দীর্ঘমুণ্ড নরগোষ্ঠীর চিত বাস্তব সভ্যতায় তাহার কিছুরই যে অভাব ছিল না হরপ্পা ও মহেন-জো-দড়োর ধ্বংসাবশেষ তাহা প্রমাণ করিয়াছে।
তামা, লোহা, ব্রোঞ্জ, সোনা, কাঠ ইত্যাদির ব্যবহার এবং এ সব বস্তুর সাহায্যে যে কারুশিল্প ইহারা জানিত তাহার একটু পরোক্ষ প্রমাণ ভাষাতত্বের মধ্যেও পাওয়া যায়। বাঙলা কামার (পরবর্তী সংস্কৃত কর্মকার) তো দ্রাবিড় ভাষার ‘কর্মার’ শব্দ হইতেই গৃহীত। চারুশিল্পের সঙ্গে পরিচয়ের প্রমাণ, ‘রূপ’ ও ‘কলা’ এই দুইটি দ্রাবিড় শব্দ। মৃৎপাত্র যে তৈরি করিত তাহার নাম হইতেছে ‘কুলাল’; বানর, গণ্ডার ও ময়ূরের সঙ্গে পরিচয়ের প্রমাণ ‘কপি’, ‘মৰ্কট’, ‘খড়্গ’ (জন্তু অর্থে) ও ‘ময়ূর’ প্রভৃতি দ্রাবিড় ভাষার শব্দ। চালের যে ক’টি শব্দ আছে সংস্কৃত ভাষায়, তাহার মধ্যে অন্তত দুইটি, ‘তণ্ডুল’ ও ‘ব্রীহি’, দ্রাবিড় ভাষা হইতে গৃহীত। লক্ষণীয় ইহাই যে, এই প্রত্যেকটি শব্দই ঋগ্বেদ ও ব্রাহ্মণ হইতে আহৃত। আর্য সভ্যতার প্রথম স্তরের ইতিহাসেই দ্রাবিড় সভ্যতার বাস্তব উপকরণগত এইরূপ অনেক শব্দ ঢুকিয়া পড়িয়াছে। পরবর্তী কালে সংস্কৃতে ও প্রাকৃতে বস্তুবাচক আরও কত অসংখ্য শব্দ যে ঢুকিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। এইসব বস্তুর সঙ্গে যদি পূর্ব হইতেই আর্যভাষীদের পরিচয় থাকিত তাহা হইলে হয়তো তাহাদের ভাষায় সেইসব বস্তুর নামও থাকিত; ছিল না বলিয়াই হয়তো এমন ভাষাভাষী লোকদের নিকট হইতে তাহা ধার করিয়া আত্মসাৎ করিয়া লইতে হইয়াছে যাহাদের মধ্যে সেইসব বস্তু ছিল এবং সেইহেতু তাঁহাদের নামও ছিল, এবং যাহাদের সঙ্গে আর্যভাষীদের পাশাপাশি বাস করিতে হইয়াছে, কখনও শত্রুভাবে, কখনও মিত্রভাবে। এইসব বস্তুবাচক অসংখ্য শব্দের ইতিহাসের মধ্যে দ্রাবিড়ভাষাভাষীজনদের উন্নত বাস্তব সভ্যতার ইঙ্গিতও সুস্পষ্ট।
দ্রাবিড়ভাষাভাষী বিভিন্ন দীর্ঘমুণ্ড নরগোষ্ঠীর রক্তপ্রবাহ বাঙলাদেশে কতখানি সঞ্চারিত হইয়াছে বা হয় নাই, তাহার ইঙ্গিত আগেই করা হইয়াছে। কিন্তু তাঁহাদের ভাষা ও বাস্তব সভ্যতার চলমান প্রবাহ যে বাঙলার ভাষা ও সভ্যতার প্রবাহে স্রোতধারা সঞ্চার করিয়াছে, এ সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার উপায় নাই। বাঙলাদেশে এই ভাষা প্রভাবের ও সভ্যতার বাহন যতদূর অনুমান করা যায়, দ্রাবিড়ভাষাভাষী লোকেরা নিজেরা ততটা নয় যতটা আর্যভাষীরা নিজেরা। বাঙলাদেশের আর্যীকরণের আগে অ্যালপো-দীনারায় ও আদি নর্ডিক লোকেরা যতটা দ্রাবিড়ভাষীদের ভাষা ও বাস্তব সভ্যতা আত্মসাৎ করিয়াছিল, তাহারই অনেকখানি অংশ আর্যীকরণের সঙ্গে সঙ্গে বাঙলাদেশে সঞ্চারিত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয়। তবে, প্রত্যক্ষ স্পর্শ লাগে নাই এমন কথাও জোর দিয়া বলা যায় না। বাঙলা ভাষার কিছু কিছু শব্দ ও পদরচনারীতি এবং ব্যাকরণপদ্ধতিতে যে দ্রাবিড় প্রভাব সুস্পষ্ট তাহা তো আগেই বলা হইয়াছে; বাস্তব সভ্যতায় এই দ্রাবিড়ভাষাভাষী নরগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ প্রভাব এতটা সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র না হইলেও সাধারণভাবে ইহার অস্তিত্ব অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র না হইবার কারণ, আর্যভাষী অ্যালপো-দীনারায় ও আদি-নর্ডিক লোকেরা সেই প্রভাবকে একান্তভাবে আত্মসাৎ করিয়া ফেলিয়াছিল এবং আজ আমরা তাহাকে আর্যভাষী লোকদের সভ্যতার অঙ্গীভূত করিয়াই দেখি। তবু মনে হয়, বাঙালীর টাটকা ও শুকনা মৎস্যাহারে অনুরাগ, মৃৎশিল্প ও অন্যান্য কারুশিল্পে দক্ষতা, চারুশিল্পের অনেক জ্যামিতিক নকশা ও পরিকল্পনা, নগর-সভ্যতার যতটুকু সে পাইয়াছে তাহার অভ্যাস ও বিকাশ, বিলাসোপকরণের অনেক সামগ্ৰী, জলসেচনে উন্নততর চাষের অভ্যাস প্রভৃতি দ্রাবিড়ভাষাভাষী নরগোষ্ঠী প্রবাহেরই ফল। মহেন-জো-দড়োর ও হরপ্পার দীর্ঘমুণ্ড লোকেরা যে মৎস্যাহারী ছিল তাহার প্রমাণ সুবিদিত। বৈদিক আর্যেরা ছিলেন মাংসাহারী; কিন্তু পরবর্তীকালে নানা কারণে, বিশেষত বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর অহিংসাবাদের অভ্যুদয়ে, প্রাণিহত্যা এবং সঙ্গে সঙ্গে মাংসাহারের এবং মৎস্যাহারের প্রতি একটা বিরাগ আর্যভাষাভাষী লোকেদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়ে এবং আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দ্রাবিড়ভাষী লোকদের দেশেও তাহা সংক্রামিত হয়। বাঙলাদেশে এই সংস্কৃতির বিস্তার অপেক্ষাকৃত কম হইয়াছিল বলিয়া এ দেশে মৎস্যাহারের প্রতি বিরাগ উৎপাদন ততটা সম্ভব হয় নাই। অবশ্য, এ দেশে নদনদীবহুল জলবায়ু এবং মাছের সহজলভ্যতা এই অনুরাগের আর একটি প্রধান কারণ, এ কথাও অস্বীকার করা যায় না। তাহা ছাড়া, আগে হইতেই অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকদের ভিতরও মৎস্যাহারের প্রচলন ছিল বলিয়া মনে হয়।
