গমুদ্রতীরশায়ী দেশ, দ্বীপ ও উপদ্বীপবাসী অষ্ট্রিকভাষী মেলানেশীয়, পলিনেশীয় প্রভৃতি লোকেরা জলপথে যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুঁড়ি কাঠের একপ্রকার লম্বা ডোঙা (এই কথাটিও অস্ট্রিক) এবং লম্বা লম্বা খণ্ড খণ্ড গুঁড়িকাঠ একত্র করিয়া ভাসমান ভেলার আকারে বড় বড় নৌকা তৈয়ারি করিত, এ তথ্য জনতত্ত্ববিদেরা আবিষ্কার করিয়াছেন। গুঁড়িকাঠের তৈরি ডিঙ্গা, ছোট নৌকা এখনও নদীখালবিলবহুল নিম্ন, পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে বহুল প্রচলিত। যাহাই হউক, এইসব ডোঙ্গা, ডিঙ্গা ও ভেলায় চড়িয়াই প্রাচীন অস্ট্রিকভাষী লোকেরা নদী ও সমুদ্রপথে যাতায়াত করিত এবং এইভাবেই তাহারা একটা বৃহৎ সামুদ্রিক বাণিজ্যও গড়িয়া তুলিয়ছিল। বস্তুত, বাঙলা তথা ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে অস্ট্রিকভাষী জাতিদের দানের এত প্রাচুর্য দেখিয়াই লেভি সাহেব বলিয়াছিলেন :
We must know whether the legends, the religion and the philosophical thoughts of India do not owe anythingtothis past. India had been too exclusively examined from the Indo-European stand-point. It ought to be remembered that India is a great maritime country… the movement which carried the Indian colonisation (in historical times) towards the Far East was far frominaugurating a new route. Adventurers, traffickers and missionaries profited by the technical progress of navigation and followed under better conditions of comfort and efficiency, the way traced from time immemorial, by the mariners of another race, whom Aryan or Aryanised India despised as savages.
নির্মলকুমার বসু মহাশয় আর-একটি জনগত তথ্যের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে তাহার উল্লেখ অযৌক্তিক নয়। আসামে, বাঙলাদেশে, ওড়িশায়, দক্ষিণ ভারতের সর্বত্র, গুজরাতে, মহারাষ্ট্রে সকল স্থানেই লোকেরা সাধারণত রান্নার কাজে সরিষা, নারিকেল অথবা তিলতৈল ব্যবহার করিয়া থাকে। সেলাইবিহীন উত্তর ও নিম্নবাস (সাধারণত ধুতি, চাদর, উড়ুনি, উত্তরীয় ইত্যাদি) ব্যবহারই এইসব দেশের জনসাধারণের পরিধেয়। আর, যে পাদুকার ব্যবহার ইহারা করে তাহার পশ্চাদ্ভাগ উন্মুক্ত। বিহারের পশ্চিম প্রান্ত হইতে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত ভূখন্ডের অধিবাসীরা কিন্তু পরিবর্তে ব্যবহার করে ঘৃত বা কোন প্রকার জান্তব চর্বি, সেলাই-করা জামাকাপড় এবং বদ্ধ-গোড়ালি পাদুকা। এই পার্থক্যের মধ্যে জন-পার্থক্যের ইঙ্গিত যে আছে তাহা একেবার উড়াইয়া দেওয়া যায় না, কারণ, জলবায়ুর পার্থক্যদ্বারা ইহার সবটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
এ পর্যন্ত অস্ট্রিকভাষী আদি-অষ্ট্রেলীয়দের সম্বন্ধে যাহা বলা হইলে তাহা হইতেই বুঝা যাইবে, ইহাদের মধ্যে যে সব শ্রেণী সভ্য তাহারা যে বাস্তব সভ্যতা গড়িয়া তুলিয়ছিল তাহা গ্রামীণ, একান্তভাবে গ্রামকেন্দ্রিক। কৃষিজীবী বলিয়া খাদ্যাভাব ইহাদের মধ্যে বড় একটা ছিল না এবং লোকসমৃদ্ধিও যথেষ্ট ছিল, এ অনুমানও করা যাইতে পারে। বর্তমান অস্ট্রিকভাষী লোকদের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয় যে, ইহাদের কোনও কোনও প্রাগ্রসর শাখার সমাজবন্ধন নিজেদের গ্রাম অতিক্রম করিয়াও বিস্তৃত হইত। মুণ্ডাদের মধ্যে কয়েকটি গ্রাম মিলিয়া গ্রামসঙ্ঘের মতো একটা সমাজ বন্ধন এখনও দেখা যায়। শরৎকুমার রায় মহাশয় তো মনে করেন, “পঞ্চায়েত প্রথা সম্ভবত ভারতে প্রথম ইহাদেরই প্রবর্তিত। পঞ্চায়েতকে ইহারা সত্যসত্যই ধর্মাধিকরণ জ্ঞানে মান্য করে। এখনও আদালতে সাক্ষ্য দিবার পূর্বে মুণ্ড সাক্ষী তাহার জাতি-প্রথা অনুসারে পঞ্চের নাম লইয়া এই বলিয়া শপথ করে, ‘সিরমারে-সঙ্গরোঙ্গ ওতেরে পঞ্চ’, অর্থাৎ আকাশে সূর্য-দেবতা পৃথিবীতে পঞ্চায়ত।” তিনি এ কথাও বলেন যে, “ইহাদের মধ্যে কোন কোন জাতির কিংবদন্তী আছে যে, এক সময়ে ভারতে ইহাদের ক্ষুদ্র বা বৃহৎ গণতন্ত্র(?)” রাজ্য ছিল। রাজশক্তির চিহ্নস্বরূপ মুণ্ডা, ওঁরাও প্রভূতি জাতির প্রত্যেক গ্রামসঙ্ঘ ও গ্রামে এখনও বিভিন্ন চিহ্ন-অঙ্কিত পতাকা সযত্নে ও সসম্মানে রক্ষিত হয়। মধ্যপ্রদেশে দ্রাবিড় [ভাষী] পূর্ব গন্দ জাতির শক্তিশালী সমৃদ্ধ রাজ্য আধুনিক কাল পর্যন্ত ছিল। গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় রাজ্যাধিকারের কিংবদন্তী মুণ্ডা প্রভৃতি কয়েকটি জাতির মধ্যে এখনও বর্তমান।”
অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকদের বাস্তব সভ্যতার কিছুটা আভাস পাওয়া গেল এবং সে সভ্যতা বাঙলাদেশে কতখানি বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল তাহারও খানিকটা ধারণা ইহার ভিতর পাওয়া গেল। দীর্ঘমুণ্ড দ্রাবিড় ভাষাভাষী লোকদের বাস্তব সভ্যতার উপাদান-উপকরণ আরও প্রচুর। মিশর হইতে আরম্ভ করিয়া ভারতবর্যের উত্তর ও দক্ষিণ পর্যন্ত এক দীৰ্ঘমুণ্ড জন এবং পরবর্তী কালে ভূমধ্যজন সম্পৃক্ত আর এক দীৰ্ঘমুণ্ড নরগোষ্ঠী, এই দুই জনের রক্তধারার সংমিশ্রণে ভারতবর্ষে সিন্ধুনদের উপত্যকা হইতে আরম্ভ করিয়া দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণতম প্রান্ত পর্যন্ত এবং উত্তর ভারতেও প্রায় সর্বত্রই এক বিরাট নরগোষ্ঠী গড়িয়া উঠিয়াছিল। দক্ষিণ ভারতের কোনও কোনও স্থানে, উত্তর ভারতের ২-৪টি স্থানে আকস্মিক আবিষ্কারে, রামায়ণ-মহাভারত -পুরাণকাহিনীতে, কিন্তু বিশেষভাবে হরপ্পা, মহেন্-জো-দড়ো এবং নাল প্রভৃতি নিম্ন-সিন্ধু উপত্যকার একাধিক স্থানের প্রাচীনতম ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এই নরগোষ্ঠীর বাস্তব সভ্যতার যে চিত্র আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে উন্মুক্ত হইয়াছে তাহা আজ সর্বজনবিদিত। সাম্প্রতিক কালে এ সম্বন্ধে আলোচনা-গবেষণাও হইয়াছে প্রচুর। তাহার বিস্তৃত আলোচনার স্থান এখানে নয়, প্রয়োজনও কিছু নাই। তবু এই নরগোষ্ঠীর সভ্যতার উপাদান-উপকরণের মোটামুটি একটু পরিচয় লইলে ভারতবর্ষের এবং সঙ্গে সঙ্গে বাঙলাদেশের সভ্যতার অন্যতম মূল সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা করা যাইবে।
