অ্যালপো-দীনারায় নরগোষ্ঠীর বাস্তব সভ্যতার রূপ যে কী ছিল, তাহা বলিবার কিছু উপায় নাই। নানা কারণে মনে হয়, বৈদিক আর্যভাষীদের ভাষা ও সভ্যতা হইতে তাহার এক পৃথক অস্তিত্ব ছিল। পূর্ব ভারতের অ্যালপো-দীনারায় অবৈদিক আর্যভাষীদিগকে বৈদিক আর্যভাষীরা ঘূণার চক্ষেই দেখিত এবং তাঁহাদের অভিহিত করিত ব্রাত্য বলিয়া। এই ব্রাত্য অবৈদিক আর্যদের ভিতর হইতেই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উদ্ভব বলিয়া অনুমান করিলে ইতিহাস অসম্মত কিছু বলা হয় না। আর, যেহেতু ইহারাও ছিল আর্যভাষী, সেই হেতু যে নিজেদের ধর্মানশাসনগুলিতে বলিত ‘আর্যসত্য’ তাহাতেও কিছু অন্যায় হয় নাই। “ব্রাত্যষ্টোম” যজ্ঞ করিয়া ইহাদের শুদ্ধিসাধন করিয়া নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করিবার একটা কৌশল বৈদিক আর্যেরা আবিষ্কার করিয়াছিলেন, কিন্তু তৎসত্ত্বেও ইহারা যে (বৈদিক ভাবে ও ধ্যানে, অর্থাৎ বৈদিক ধর্মে) ‘অ-দীক্ষিত’ তাহা বলিতেও ছাড়েন নাই। এই তথ্য হইতে মনে হয়, এই অ্যালপো-দীনারায় অবৈদিক আর্যভাষীদের স্বতন্ত্র একটা বাস্তব সভ্যতার রূপও ছিল; কিন্তু তাহা অনুমান করিবার উপায় আজ কিছু অবশিষ্ট আর নাই।
বৈদিক আর্যভাষীদের বাস্তব সভ্যতা ছিল একান্তই প্রাথমিক স্তরের। খড়, বাঁশ, লতাপাতার স্বল্পকালস্থায়ী কুঁড়েঘরে অথবা পশুচর্মনির্মিত তাবুতে ইহারা বাস করিত; গো-পালন জানিত, পশুমাংস পোড়াইয়া তাহাই আহার করিত এবং দলবদ্ধ হইয়া এক জায়গা হইতে অন্য জায়গায় ঘুরিয়া বেড়াইত। যাযাবরত্ব ত্যাগ করিয়া এ দেশে আসিয়া যথাক্রমে কৃষি অর্থাৎ গ্রাম-সভ্যতা এবং নগর-সভ্যতার সঙ্গে ধীরে ধীরে তাঁহাদের পরিচয় ঘটিল এবং ক্রমে তাহারা দুই সভ্যতাকেই একান্তভাবে আত্মসাৎ করিয়া নিজস্ব এক নূতন সভ্যতা গড়িয়া তুলিল। এই সভ্যতার বাহন হইল আর্যভাষা। এই দুই সভ্যতার সমন্বিত আর্যীকরণই হইল আর্যভাষীদের বিরাট কীর্তি; অথচ বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে তাঁহাদের একান্ত নিজস্ব কিছু তাহাতে বিশেষ নাই।
বাঙলাদেশ ও বাঙালীর বাস্তব সভ্যতার রূপ শুধু প্রাচীনকালেই নয়, উনবিংশ শতক পর্যন্ত একান্তভাবেই গ্রামীণ, এ কথা সকলেই স্বীকার করবেন। দ্রাবিড়ভাষাভাষী লোকদের উদ্ভূত নগর-সভ্যতার স্পর্শ বাঙলাদেশে খুব কমই লাগিয়াছে; সেইজন্যই সুদীর্ঘ শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালীর ইতিহাসে নগরের প্রাধান্য নাই বলিয়াই চলে। উত্তর ভারতে রাজগৃহ, পাটলীপুত্র, সাকেত, শ্রাবস্তী, হস্তিনাপুর, পুরুষপুর, শাকল, অহিচ্ছত্র, কান্যকুব্জ, তক্ষশীলা, উজ্জয়িনী, বিদিশা, কৌশম্বী প্রভৃতি, দক্ষিণ ভারতের অসংখ্য সামুদ্রিক বাণিজ্যের বন্দর, পুর, নগর প্রভৃতি ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে স্থান অধিকার করিয়া আছে, বাঙলাদেশে বাঙলার ইতিহাসে নগর নগরী সে স্থান অধিকার করিয়া নাই। বস্তুত বাঙলাদেশে নগরের সংখ্যা কম এবং বাঙালীর সমাজবিন্যাসে নগরের প্রাধান্যও কম। এ কথা অন্যত্র আরও পরিষ্কার করিয়া বলিবার সুযোগ হইবে; এখানে এইটুকু বলিলেই চলিতে পারে যে, নগর-সভ্যতার স্পর্শ বাঙলাদেশে যে যথেষ্ট লাগে নাই, তাহার কারণ বাঙলাদেশ চিরকালই ভারতের একপ্রান্তে নিজের কৃষি ও গ্রামীণ সভ্যতা লইয়া পড়িয়া থাকিয়াছে। সর্বভারতীয় প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে তাহার যোগ আর্যভাষা ও আর্যসভ্যতা এবং সংস্কৃতিকে অবলম্বন করিয়াই এবং সেই সূত্রে যে দ্রাবিড় ভাষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির যতটুকু প্রবাহম্পর্শ পাইয়াছে, তাহাই বোধহয় তাহার দ্রাবিড়ী উপাদান এবং সে উপাদান তাহার মূল অষ্টিক উপাদানকে একান্তভাবে বিলোপ করিতে পারে নাই। ঐতিহাসিক কালেও দক্ষিণ হইতে নানা সমরাভিযান এবং আদান-প্রদানের ফলে বাঙলাদেশে কিছু কিছু দক্ষিণী দ্রাবিড় প্রভাব আসিয়াছে, সন্দেহ নাই; বাঙলাদেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে তাহার কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যায় ভাষায়, বাস্তব সভ্যতার কিছু কিছু উপাদান-উপকরণে এবং মানস-সংস্কৃতিতে। তাহা স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ করিয়া দেখাইবার স্থান এখানে নয়।
৭. জনপ্রবাহ ও মানস-সংস্কৃতি
দ্বিতীয় অধ্যায় । ইতিহাসের গোড়ার কথা
সপ্তম পরিচ্ছেদ – জনপ্রবাহ ও মানস-সংস্কৃতি
জনপ্রবাহ ও মানস-সংস্কৃতি
বাস্তব সভ্যতার উপাদান-উপকরণ এবং তাহার সঙ্গে জনপ্রবাহের সম্বন্ধের কিছু আভাস লইতে চেষ্টা করা গেল। এইবার মানস-সংস্কৃতি এবং জনপ্রবাহের খানিকটা সম্বন্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা করা যাইতে পারে।
অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অষ্ট্রেলীয়দের কথাই সর্বাগ্রে বলিতে হয়, কারণ ভারতীয় নিগ্রোবটুদের মানস-সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রায় কিছুই আমরা জানি না। অস্ট্রিক ভাষাভাষী প্রাচীন ও বর্তমান জনদের সম্বন্ধে যতটুকু জানা যায় এবং অনুমান করা যায়, তাহাতে মনে হয়, ইহারা অতি সরল ও নিরীহ প্রকৃতির লোক ছিল। ঐতিহাসিক যুগে ইহাদের বিবর্তন ও পরিবর্তনের গতি ও প্রকৃতি দেখিয়া মনে হয়, ইহাদের মধ্যে দৃঢ়তা ও সংহতির কিছু অভাব ছিল; সহজেই ইহারা পরের নিকট বশ্যতা স্বীকার করিত এবং আত্মসমর্পণ করিয়াই নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখিত। বারবার অধিকতর পরাক্রান্ত জাতির নিকট রাষ্ট্ৰীয় ও অর্থনৈতিক বশ্যতা স্বীকার করিয়াও যে ইহারা নিজেদের জনগত বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি আজও বজায় রাখিতে পারিয়াছে, তাহাতে মনে হয় এই বশ্যতা স্বীকার করিয়াও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখাই ইহাদের প্রাণশক্তির মূল। বর্তমান শবর বা সাঁওতাল, ভূমিজ বা মুণ্ডা প্রভৃতির জীবনাচরণ একটু মনোযোগ দিয়া দেখিলে মনে হয়, ইহারা কিছুটা কল্পনাপ্রবণ, দায়িত্বহীন, অলস, ভাবুক এবং কতকটা কামপরায়ণও বটে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া এত বিবর্তন-পরিবর্তন হইয়াছে, কিন্তু ইহাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য তাহাতে বিশেষ বদলাইয়াছে বলিয়া মনে হয় না।
