নৈষধ-চরিত ছাড়া শ্ৰীহৰ্ষ আরও কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন এবং তাহার উল্লেখ নৈষধ-চরিতেই আছে; নবসাহিসাংক-চরিত, স্থৈৰ্যবিচার-প্রকরণ, অর্ণব-বৰ্ণনা, শিবশক্তিসিদ্ধ, ছিন্দ-প্রশস্তি ও শ্ৰীবিজয়-প্রশস্তি। খণ্ডন-খণ্ড-খাদ্য নামে দর্শনের উপরও তিনি একখানা মূল্যবান
বাঙালীর ঐতিহ্য বেণীসংহার-রচয়িত শাণ্ডিল্যাগোত্রীয় ভট্ট-নারায়ণকেও বাঙালী বলিয়া দাবি করে; আদিশূর-প্রবর্তিও এবং কনৌজগত পঞ্চব্ৰাহ্মণের তিনি নাকি অন্যতম। এ-তথ্য কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন; অন্তত ঐতিহাসিক প্রমাণ কিছু নাই। মৌদগল্য-গোত্রীয় বর্ধমানাঙ্কপুত্র, অনৰ্ঘারাঘব-রচয়িতা মুরারী-মিশ্রকেও অনেকে বাঙালী বলিয়া মনে করেন; টীিকাকার প্রেমচন্দ্র-তর্কবাগীশ তো তাহাই বলিতেছেন। পুরীর জগন্নাথ-মন্দিরে উৎসবাভিনয়ের জন্য অনঘারাঘব রচিত হইয়াছিল।
একাদশ-দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতকের বাঙলাদেশে নাট্য-রচনার যথেষ্ট প্রাচুর্য ছিল বলিয়া মনে হয়। এবং ইহাদের অধিকাংশই রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ প্রভৃতির কাহিনী লইয়া রচিত হইয়ছিল। ১৪৩১ খ্ৰীষ্ট বৎসরের আগে সাগরনন্দী-রচিত (“মুকুটেশ্বর নন্দিবংশ বোমাঙ্গনৈকশশী”) নাটকলক্ষণরত্নকোষ-গ্রন্থে বহু বাঙালী নাট্যকারের নাট্যরচনার উল্লেখ আছে। কয়েকটি নাম উল্লেখ করিতেছি: কীচকতীম, প্রতিজ্ঞাতীম, শৰ্মিষ্ঠা-পরিণয়, রাধা, সত্যভামা, কেলি-রৈবতক, উষাহরণ, দেবী-মহাদেব, উর্বশী-মৰ্দন, নলবিজয়, মায়া-মদালসা, উন্মত্ত চন্দ্ৰগুপ্ত, মায়া-কোপালিক, মায়া-শকুন্তু, মদানিকা-কামুক, জানকী-রাঘব, রামানন্দ, কেকয়ী-ভরত, অযোধ্যা-ভরত, বালিবধ, রামবিক্রম, মারীচ-বঞ্চিতক, ইত্যাদি।
সমসাময়িক বাঙলাদেশের কবিমনের সম্পূর্ণ পরিচয় নৈষধ-চরিতে নাই, এমন কি ধোয়ীকবি-রচিত পবনদূতেও নয়। প্রাচীনতম বাঙলায় বা শৌরসেনী অপভ্রংশের স্থানীয় রূপে যে স্বল্প কবিতা ও গান এই দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতকে রচিত হইয়াছিল। তাহদের মধ্যেও সি-পরিচয় পাইবার কথা নয়; কারণ এই সব কবিতা ও গান রচিত হইয়াছিল ধর্মের প্রেরণায়, কাব্যের প্রেরণায় নয়। তাহা ছাড়া, রচয়িতারা সকলেই কিছু শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান লোক ছিলেন না; মন ও বুদ্ধি শিক্ষাশাসন দ্বারা যথেষ্ট মার্জিত ছিল না, চিত্ত ছিল না কল্পনায় উজ্জ্বল। সেই জন্য কল্পনোজুল শিক্ষিত মনের পরিচয় শৌরসেনী অপভ্রংশ বা প্রাচীনতম বাঙলা পদগুলিতে বড় একটা পাওয়া যায় না; তাহা পাওয়া যায় বাঙলার কবিদের সংস্কৃত ভাষায় কাব্য-রচনার মধ্যে, এবং বিশেষভাবে যে-কাব্য রচিত হইয়াছিল রাজসভার আলোকমালার আড়ালে।
কাব্য ও কবিতা
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত-সমাজের বাহিরেও কাব্য-সাহিত্যের প্রসিক একটি শ্রেণী ছিল, এবং সম্পাণ একখানা কাব্য বা প্রকীর্ণ শ্লোক যে সংস্কৃতে রচিত হইত। তাহা শুধু পণ্ডিত-সমাজের জন্যই নয়, বরং এই বৃহত্তর রসিক শ্রেণীটিকে উদ্দেশ্য করিয়াই। প্রধানত এই শিক্ষিত রসিক শ্রেণীটির জন্যই বোধ হয় বাঙলাদেশে সর্বপ্রথম সরস শ্লোক-সংগ্রহ বা কবিতা-চয়নিক সঙ্কলন করিবার একটা সজাগ প্রয়াস দেখা দেয়। অন্তত, সংস্কৃত সাহিত্যের ভাণ্ডারে যে কয়েকটি কবিতা-সংগ্ৰহ সুপরিচিত, তাহার মধ্যে সর্বপ্রাচীন দুটি সংগ্রহই বাঙলাদেশে বাঙালী সংকলন-কর্তদ্বারা সংকলিত ও সম্পাদিত; সে দুটি কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় এবং সদুক্তিকর্ণামৃত। কবীন্দ্রবচনসমুচ্চায়ের কথা আগের পর্বেই বলিয়াছি; বইখানা বোধ হয় একাদশ শতকের শেষ পর্বের সঙ্কলন।
সদুক্তিকর্ণামৃত
সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্ৰন্থখানা সঙ্কলিত হয় ১২০৬ খ্ৰীষ্ট বৎসরে (১২২৭ শকাব্দ), বোধ হয়, কেশবসেনের রাজত্বকালে। গ্রন্থের পুম্পিক-শ্লোকে যেন কেশবসেনের নামোল্লেখ আছে। সঙ্কলয়িতা শ্ৰীধরদাসের পিতা শ্ৰীবটুদাস লক্ষণসেনের প্রতিরাজ বা লেখক এবং অন্যতম মহাসামন্ত ছিলেন। বটুদাস লক্ষ্মণসেনের ‘অনুপম প্রেমের একমাত্র পাত্র এবং “সখা ছিলেন। শ্ৰীধরদাস নিজে কবি ছিলেন। কিনা জানিবার উপায় নাই, কিন্তু তাহার সঙ্কলিত শ্লোক-সংগ্ৰহ এবং শ্রেণীবিভাগ বিশ্লেষণ করিলে এ-তথ্য অস্বীকার করা যায় না যে, তিনি একজন বিদগ্ধ কাব্যরসিক ও সাহিত্যবোদ্ধা ছিলেন। এই গ্ৰন্থ পাচটি প্রবাহ বা অধ্যায়ে বিভক্ত; প্রত্যেক প্রবাহে কয়েকটি করিয়া বীচি বা তরঙ্গ বা শ্রেণী এবং প্রত্যেক বীচিতে পাচটি করিয়া শ্লোক। প্ৰত্যেক শ্লোকের শেষে সংকলয়িতার নাম দেওয়া আছে; যে-সব ক্ষেত্রে নাম শ্ৰীধরদাসের অজ্ঞাত ছিল সে-সব ক্ষেত্রে বলা হইয়াছে ‘কস্যচিৎ’। প্রথম প্রবাহে ৯৫টি বীচিতে নানা দেবতার লীলাবিষয়ক ৪৭৫টি শ্লোক; দ্বিতীয় শৃঙ্গার প্রবাহে ১৭৯টি বীচির ৮৯৫টি শ্লোকে প্রেম, নায়ক-নায়িকা, প্রেমের নানা ভাব ও অবস্থা, বিভিন্ন ঋতু ও প্রকৃতির নানা অবস্থার সরস বর্ণনা; তৃতীয় চাটু প্রবাহে ৫৪টি বীচির ২৭০টি শ্লোকে রাজার স্তুতি, বীরের বীর্য, যুদ্ধ, সেনা, শত্ৰু, তুর্যধ্বনি, কীর্তি ইত্যাদির বর্ণনা বা প্রশংসা; চতুর্থ অপদেশ প্রবাহে ৭২টি বীচির ৩৬০টি শ্লোকে দেবতাদের দোষগুণ, পার্থিব সংসার, গাছলতাপাতা, পশুপক্ষী ইত্যাদির বর্ণনা; এবং পঞ্চম উচ্চাবাচ প্রবাহে ৭৪টি বীচির ৩৭০টি শ্লোকে গরু, ঘোড়া, মানুষ, পাখি, দেশ, কবি, স্থান, গুণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে নানা বর্ণনার ছড়াছড়ি। গ্রন্থটিতে সর্বমোট ৪৮৫ জন বিভিন্ন কবির রচনার নমুনা আছে; ইহাদের মধ্যে পাণিনি, ভাস, ভারবি, কালিদাস, ভামহ, অমরু, বাণভট্ট, বিলহন, ভর্তৃহরি, মুঞ্জ, রাজশেখর, বাকপতিরাজ, বিশখাদত্ত প্রভৃতি সর্বভারতীয় কবির রচনা যেমন আছে, তেমনই আছে অসংখ্য বাঙালী কবির রচনা। বস্তুত, কবিদের নামের রূপ দেখিয়া মনে হয়, অর্ধেকেরও উপর বোধ হয় শ্ৰীধর দাসের সমসাময়িক অথবা কিছু আগেকার গৌড়-বঙ্গীয় কবিকুলের রচনা। সুকুমার সেন মহাশয় এই বাঙালী কবিকুলের সুদীর্ঘ নাম-তালিকা চয়ন করিয়াছেন।
