একাদশ শতকের শেষভাগে বৈয়াকরণিক ক্ষীরস্বামী তাহার অমরকোষের টীকায় অনেকবারই জনৈক গৌড়ীয় বৈয়াকরণিকের উল্লেখ করিয়াছেন; কয়েকবার গৌড়ীয় বৈয়াকরণিক এক গোষ্ঠীর উল্লেখও যেন করিয়াছেন। কিন্তু গৌড়ীয় বৈয়াকরণিকটি যে কে, কিংবা গোষ্ঠীভুক্ত লোকেরাই বা কাহারা, কিছুই বলিবার উপায় নাই।
সৰ্ব্বানন্দ
আর্তিহরী-পুত্র বন্দ্যঘটীয় সর্বানন্দের প্রতিষ্ঠার নির্ভর টীকা সৰ্বস্ব নামক অমরকোষের টীকার উপর। এই গ্রন্থ বাঙলার গৌরব, এবং সুপ্রচুর বাঙলা দেশী শব্দের সর্বপ্রাচীন সংগ্ৰহ। বৃহস্পতি রায়মুকুটের পদচন্দ্ৰিকা (১৪৩১ খ্ৰীষ্ট বৎসর) নামক অমরকোষের টাকায় টীকাসর্বস্ব হইতে প্রচুর উদ্ধৃতি আছে। কিন্তু এ-পর্যন্ত টীকাসর্বম্বের একটি পাণ্ডুলিপিও বাঙলাদেশে পাওয়া যায় নাই, পাওয়া গিয়াছে দক্ষিণ-ভারতে। সর্বানন্দ নিজেই বলিতেছেন, ১৭০৮ শকাব্দে ১১৫৯-৬০ খ্রীষ্ট শতকে তাহার গ্রন্থ-রচনা চলিতেছিল।
লক্ষণীয়। এই, এই পর্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনা একান্তু ভাবেই শিক্ষিত উচ্চ বৰ্ণস্তরে আবদ্ধ। ধর্মশাস্ত্রগুলির দৃষ্টি-পরিধির মধ্যে তো দ্বিজবৰ্ণ ছাড়া আর কাহারও স্থানই নাই। ব্যাকরণ এবং কোষগ্রন্থগুলিতে মোটামুটি ব্ৰাহ্মণ্য শিক্ষা-দীক্ষারই প্রতিফলন। এই শিক্ষা-দীক্ষায় ব্যবস্থা, পাঠক্রম, রতিপদ্ধতি এই পর্বে কিরূপ ছিল তাহা বলিনার মতো উপাদান আমাদের নাই। বৌদ্ধ শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থার সঙ্গে ব্ৰাহ্মণ্য শিক্ষা-ব্যবস্থার যে পার্থক্য তাহা তো ছিলই, অর্থাৎ বৌদ্ধ শিক্ষা-ব্যবস্থার কেন্দ্র ছিল বৌদ্ধ সংঘ ও বিহার এবং সেখানে শিক্ষাটা হইত সংঘবদ্ধ ভাবে। ব্ৰাহ্মণ্য শিক্ষা ছিল একক ও ব্যক্তিক এবং সে-শিক্ষার কেন্দ্র ছিল গুরুগৃহ। সেই গৃহে দ্বিজবৰ্ণ এবং উচ্চতর বর্ণস্তরের শিক্ষার্থী ছাড়া আর কাহারও স্থান ছিল না। তাহা ছাড়া, এই পর্বের গুরুগৃহে অধ্যয়ন-অধ্যাপনার বিষয়ও ছিল সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। লিপি-প্রমাণ ও সমসাময়িক সাহিত্যে যে সব বিষয়ের উল্লেখ পাইতেছি তাহা মীমাংসা, স্মৃতি, গৃহ্যসূত্র, ব্যাকরণ ও ফলসংহিতা-জ্যোতিযেই যেন সীমাবদ্ধ। যে-ন্যায়শাস্ত্রে বাঙলা দেশের প্রতিষ্ঠা তাহাও এই পর্বে গড়িয়া ওঠে নাই। শস্ত্ৰবেদ, আয়ুর্বেদ, অর্থশাস্ত্র প্রভৃতির উল্লেখও কোথাও দেখিতেছি না। দৰ্শন-শাস্ত্রের গভীর গহনে আত্মস্থ হইবার সাহস তো নাই। এই সব কারণেই বোধ হয় সমসাময়িক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টি-পরিধিই সংকীর্ণ হইয়া পড়িতে বাধ্য হইয়াছিল; সৃষ্টির প্রেরণাও ছিল দুর্বল। সমস্ত মনন যেন শুধু টীকা ও টিল্পনীর বন্ধ্যা বন্ধনে শৃঙ্খলিত!
জ্ঞান ও বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতির এই অবস্থায় শিক্ষিত উচ্চ বৰ্ণস্তরের চিত্ত মুক্তি পাইতে চায় কবি-কল্পনার অপেক্ষাকৃত প্রশস্ততর ক্ষেত্রে। এই পর্বের শিক্ষিত সমাজে তাহাই হইয়াছিল, এবং তাহা প্রধানত রাজসভাকে কেন্দ্ৰ করিয়া। সেনা-রাজারা সকলেই, বিশেষভাবে বল্লালসেন, লক্ষ্মণসেন ও কেশবসেন পরম বিদ্যোৎসাহী ছিলেন, নিজেরা কবি ছিলেন এবং কবিজনের সমাদরও করিতেন। কবি ধোয়ী লক্ষ্মণসেনকে বলিয়াছেন বাঙলার বিক্ৰমাদিত্য। তাহার রাজসভা অলংকৃত করিতেন। অন্তত পাচজন সৃষ্টিধর কবি- গোবর্ধন বা গোবর্ধনাচার্য, শরণ, জয়দেব, উমাপতি-ধর এবং কবিরাজ। কবিরাজ বোধহয় বলা হইত ধোয়ী কবিকে, কারণ জয়দেব ধোয়ীকেই বলিয়াছেন কবি ক্ষমাপতি এবং ধোয়ী নিজেও তাঁহার পবনদূত-কাব্যে নিজেকে ঐ বিশেষণে বিশেষিত এবং কবিরাজা আখ্যায় আখ্যাত করিয়াছেন। এই পাঁচজন ছাড়াও সমসাময়িক কাব্য সংকলনগ্রন্থ সদুক্তিকর্ণামৃতে আরও অনেক বাঙালী কবির সংবাদ এবং তাঁহাদের কাব্য-নিদর্শন পাওয়া যায়। বস্তুত, সংস্কৃত গীতিকাব্যে এই পর্বের বাঙালী কবিদের দান শুধু সংখ্যা-সমৃদ্ধিতেই উল্লেখযোগ্য নয়, কাব্যসমৃদ্ধিতেও গৌরবের দাবি রাখে। তবু, স্বীকার করিতেই হয়, এ-পর্বের সমস্ত কাব্যই, এমন কি গীতগোবিন্দও ক্ষীণাত্মা ও অল্পপ্রাণ; ইহাদের সহজ সৌন্দর্য আছে, ভাবের ও দৃষ্টির গভীরতা নাই। যে কবি-কল্পনার পশ্চাতে সবল ও গভীর মননের প্রেরণা নাই, বিস্তৃত জীবনের সাধনা নাই তাহার প্রকৃতি সর্বদেশে সৰ্বকালেই এইরূপ। সদ্যোক্ত কবিদের কথা বলিবার আগে নৈষধচরিত-রচয়িতা শ্ৰীহৰ্ষ, বেণীসংহার-রচয়িতা ভট্ট-নারায়ণ এবং অন্যর্ঘরাঘব রচয়িতা মুরারী সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলিয়া লইতে হয়।
শ্রীহর্ষের নৈষধচরিত
নৈষধচরিত-কাব্য রচয়িতা শ্ৰীহৰ্ষ বাঙালী কিনা। এই লইয়া পণ্ডিত মহলে প্রচুর বিতণ্ডা বিদ্যমান। বাঙালী কুলপঞ্জিকাকারদের মতে শ্ৰীহয়ের পিতার নাম মেধাতিথি বা তিথিমেধা, কিন্তু যথার্থত তাহার পিতা ছিলেন শ্ৰীহীর এবং মাতা ছিলেন মামল্লদেবী নৈষধ-চরিতের সপ্তম সর্গের ১১০ সংখ্যক শ্লোকে জানা যায়, শ্ৰীহৰ্ষ অনুল্লিখিত নোম জনৈক গৌড়রাও সম্বন্ধে একটি প্রশস্তি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন; ষোড়শ সর্গের ১৩১ সংখ্যক শ্লোকে দেখিতেছি, তাহার প্রতিভার সমাদর করিয়াছিলেন কাশ্মীরী পণ্ডিতেরা; আবার দ্বাবিংশতম সর্গের ২৬ সংখ্যক শ্লোকে জানা যাইতেছে, কানাকুজের রাজা ছিলেন তাহার পৃষ্ঠপোষক। নৈষধ-চরিতের একজন অর্বাচীন টীকাকার বাঙালী গোপীনাথ আচার্য তাহার হর্ষহীদয় নামীয় টীকায় বলিতেছেন, শ্ৰীহৰ্ষের – উল্লিখিত বিজয়প্রশস্তি-কাব্যটি সেন-ব্লাজ বিজয়সেন সম্বন্ধে। তেমনই আবার অন্যদিকে চাণ্ডুপণ্ডিত ও অন্যান্য টীকাকারেরা এবং রাজশেখর সূরি তাহার প্রবন্ধচিন্তামণি-গ্রন্থে বলিতেছেন, যে-কান্যকুব্জরাজ তাহার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাহার নাম জয়চন্দ্র। জয়চন্দ্ৰ যাহার পৃষ্ঠপোষক কিংবা কাশ্মীরী পণ্ডিতেরা র্যাহার অনুরক্ত, বিজয়সেন সম্বন্ধে প্রশস্তি রচনায় তাহার কোনও বাধা থাকিবার কথা নয়। ইতিহাসগত বাধাও কিছু নাই। কাব্যটি আগাগোড়া গৌড়ী-রীতিতে রচিত; সর্বত্র অনুপ্রাসের ছড়াছড়ি, শ-ষ-স হইয়া ধ্বনিসাম্য-অর্থবৈষম্যের খেলা, বাঙালী-সুলভ দন্ত্য ‘ন’ এবং মূর্ধ্য ‘ন’, বর্গীয় ‘ব’ এবং অস্ত্যস্থ ‘ব’, বর্গীয় ‘জ’ এবং অন্তঃস্থ ‘য’ প্রভৃতির একই মূল্য দান সামাজিক বিবাহ-ভোজে ভাত এবং মাছ খাওয়া; ব্যঞ্জনে দই ও সরিষার ব্যবহার; দুগ্ধপক্ক বাটক (বা বড়া পিঠে) খাওয়া, ভোজে বসিয়া বরযাত্রীদের ব্যবহারের নানা খুঁটিনাটি, বিবাহে উলুলু ধ্বনি, শঙ্খবলয় ও সীমান্তে সিঁদুর ব্যবহার, মঙ্গলানুষ্ঠানে আলপনা আঁকা, বিবাহ উপলক্ষে মঙ্গলগীত গাওয়া, দরজার দুই ধারে কদলী বৃক্ষরোপণ, বিবাহে গাঁটছড়া বাধা, বিবাহ সংক্রান্ত নানা স্ত্রী-অ্যাচার, বাসরঘরে চুরি করিয়া দেখা বা আড়ি পাতিয়া শোনা, প্রভৃতি তথ্য একত্র করিলে শ্ৰীহৰ্ষকে বাঙালী বলিয়াই তো মনে হয়। টীকাকারেরা সকলেই তাহাকে গৌড়ীয় অর্থাৎ বাঙালী বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু বাঙালী হইলেও তাহার নৈষধ-চরিত কাব্য লইয়া গর্ব করিবার কিছু নাই। শ্ৰীহৰ্ষ দাবি করিয়াছেন। ‘কবিকুলের অজ্ঞাত অদৃষ্ট পথের তিনি পথিক!’ এত বড় দাবি এ-কাব্য সম্বন্ধে করা চলে না। মহাভারতের নল-দময়ন্তীর মধুর কাহিনীটির একাংশ মাত্ৰ নানা অবাস্তর বর্ণনায় অলংকৃত করিয়া বাইশটি সুদীর্ঘ সর্গে এমন একটি জটিল মহাকাব্য তিনি রচনা করিয়াছেন যাহা ছন্দ, অলংকার এবং পাণ্ডিত্যের গুরুভারে ভারাক্রান্ত, কিন্তু যথার্থ কাব্যমূল্যে দরিদ্র ও দুর্বল। কোনো সূক্ষ্মী উচ্চস্তরের কল্পনা বা গভীর জীবনদর্শন এই কাব্যকে মহিমান্বিত করে নাই। তবু, কোন প্রাচীন ভারতের পাচটি মহাকাব্যের অন্যতম বলিয়া পরিগণিত হইত, তাহা বলা কঠিন।
