গুণবিষ্ণু
দামুক-পুত্র গুণবিষ্ণু হয় বাঙালী ছিলেন, না হয়। মৈথিলী। হলায়ুধ তাহার ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থে গুণবিষ্ণুর ছান্দোগ্যমন্ত্রভাষ্য-গ্ৰন্থ প্রচুর ব্যবহার করিয়াছেন; কাজেই গুণবিষ্ণু হলায়ুধের পূর্বগামী। ছান্দোগ্যমন্ত্রভাষ্য সামবেদীয় গৃহ্যসূত্রের প্রায় ৪০০ মন্ত্রের সুবিস্তৃত টীকা! আটটি ভাগে গুণবিষ্ণু গর্ভাধান হইতে আরম্ভ করিয়া সমাবর্তন, বিবাহ প্রভৃতি সমস্ত প্রধান প্রধান সংস্কারগুলির আলোচনা করিয়াছেন; স্নান, সন্ধ্যা, পিতৃতর্পণ, শ্ৰাদ্ধ প্রভৃতির আলোচনাও আছে; তাহা ছাড়া পুরুষসূক্তের একটি টীকাও আছে। গুণবিষ্ণু ছান্দ্যোগ্য-ব্রাহ্মণ বা মন্ত্রব্রাহ্মণ-গ্রন্থের একটি টীকা এবং পারষ্কার-গৃহ্যসূত্রের একটি টীকাও রচনা করিয়াছিলেন। চতুর্দশ শতকে সায়নাচার্য গুণবিষ্ণুর নাম করেন নাই, কিন্তু ছান্দোগ্য-মন্ত্রভাষ্য হইতে প্রচুর উদ্ধৃতি গ্রহণ করিয়াছেন।
হলায়ুধ
প্রথম যৌবনে রাজপণ্ডিত, পরিণত যৌবনে লক্ষ্মণসেনের মহামাত্য, এবং প্রৌঢ় বয়সে লক্ষ্মণসেনেরই ধর্মধ্যক্ষ বা ধর্মধিকারী, আবস্থিক, মহাধৰ্মধ্যক্ষ (বা মহাধৰ্মধিকৃত বা ধর্মােগারাধিকারী) হলায়ুধও ছিলেন এ-যুগের অন্যতম যুগন্ধর পণ্ডিত এবং প্রভাবশালী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ। তাহার পিতা ধনঞ্জয় ছিলেন বৎস-গোত্রীয় ব্রাহ্মণ, মাতা উজলা। ধনঞ্জয় ছিলেন ধর্মধ্যক্ষ। হল্যায়ুধের দুই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, ঈশান ও পশুপতি, ঈশান আহ্নিক-পদ্ধতি নামে একটি গ্রন্থ এবং পশুপতি শ্ৰাদ্ধপদ্ধতি ও পাকযজ্ঞ নামে দুইখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ঈশান এবং পশুপতির তিনটি গ্ৰন্থই বিলুপ্ত; তবে জনৈক রাজপণ্ডিত পশুপতি-রচিত শুক্ল যজুৰ্বেদীয় কাঞ্চশাখানুসারী গুহ্যানুষ্ঠানাদি সম্পর্কিত দশকর্মপদ্ধতি নামে একটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বিদ্যমান। ধনঞ্জয় পুত্র পশুপতি এবং রাজপণ্ডিত পশুপতি এক এবং অভিন্ন হওয়া বিচিত্র নয়।
ব্ৰাহ্মণসর্বস্ব, মীমাংসা সর্বস্ব, বৈষ্ণবসর্বস্ব, শৈব সর্বস্ব এবং পণ্ডিতসর্বস্ব নামে অন্তত পাচখানা গ্ৰন্থ হলায়ুধ রচনা করিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে একমাত্র ব্রাহ্মণসর্বস্ব ছাড়া আর বাকী চারিটি গ্ৰন্থই বিলুপ্ত। শেষোক্ত দুটি গ্রন্থের উল্লেখ ও কিছু আলোচনা রঘুনন্দন করিয়াছেন। হলায়ুধ নিজেই বলিতেছেন, রাঢ় এবং বরোন্দ্রের ব্রাহ্মণেরা বেদপাঠ করিতেন না, এবং সেই হেতু বৈদিক ক্রিয়াকর্মের যথাযথ নিয়মও জানিতেন না। সেইজন্যই তিনি ব্রাহ্মণসর্বস্ব গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, প্রধানত শুক্লা-যজুৰ্বেদীয় কাঞ্চশাখাধ্যায়ী ব্রাহ্মণদের নিত্যকর্ম ও গৃহ্যসূত্রীয় সংস্কারাদি সম্বন্ধে শিক্ষাদানের জন্য। বৈদিক মন্ত্রভাষ্য রচনাই এই গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এবং মন্ত্রগুলি ব্যাখ্যা করিতে গিয়া হলায়ুধ প্রাতঃকৃত্য, পূজা, অতিথিসেবা, বেদপাঠ, পিতৃতৰ্পণ, দশসংস্কারাচার প্রভৃতি সমস্তই আলোচনা করিয়াছেন। এই কাজে কাত্যায়নের ছান্দােগ্যপরিশিষ্ট এবং পরিষ্করের গৃহ্যসূত্র তিনি প্রচুর ব্যবহার করিয়াছেন বলিয়া মনে হয়, এবং প্রকাশ্যে ঋণ স্বীকার করিয়াছেন। উবট এবং গুণবিষ্ণুর।
পুরুষোত্তম দেব ॥ পুরুষোত্তম
আগেই বলিয়াছি, এই পর্বে গভীর মননের কোনোও নিদর্শন বাঙলাদেশে মাই, সেই হেতু দর্শনগ্রন্থ রচনার চেষ্টাও নাই। তবে ব্যাকরণ ও কোষগ্রন্থ রচনার কিছুটা চেষ্টা হইয়াছিল, এবং রচয়িতাদের মধ্যে আর কেহ বাঙালী হউন না না হউন, এক আর্তি হরপত্র বন্দ্যঘটীয় সর্বানন্দই সকলের মুখোজ্জল করিয়াছেন। কিন্তু তাহার কথা বলিবার আগে বৈয়াকরণিক পুরুষোত্তমদেব এবং কোষকার পুরুষোত্তম সম্বন্ধে দু’একটি কথা বলিতেই হয়। এই দুই পুরুষোত্তম এক এবং অভিন্ন কিনা, নিঃসংশয়ে কিছু বলা কঠিন। ইহাদের দুইজনই বৌদ্ধ ছিলেন, নাম ছিল এক, এবং সমসাময়িক কালে জীবিত ছিলেন, শুধু এই সব কারণে দুইজনকে এক এবং অভিন্ন বলা চলে কিনা সন্দেহ। সপ্তদশ শতকে সৃষ্টিধর নামে জনৈক বৈয়াকরণিক পুরুষোত্তম দেব-রূচিত ভাষাবৃত্তি গ্রন্থের একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন। এই টীকায় সৃষ্টিধর বলিতেছেন, পুরুষোত্তমদেব রাজা লক্ষ্মণসেনের নির্দেশে এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, এবং তাঁহারই নির্দেশে ও অনুরোধে পুরুষোত্তম তাহার গ্রন্থে বৈদিক ব্যাকরণ আলোচনা করেন নাই। বেদানুরক্ত, ব্রাহ্মণ্যধর্মের পরম পৃষ্ঠপোষক লক্ষ্মণসেন কেন যে বৈদিক ব্যাকরণসূত্রগুলি বাদ দিতে বলিবেন, তাহা বুঝা কঠিন। তাহা ছাড়া, বৌদ্ধ পুরুষোত্তম বৈদিক ব্যাকরণ বাদ দিতে গিয়া বৌদ্ধরীতির অনুসরণ করিয়াছেন; বৌদ্ধের তো এমনিতেই বৈদিক ব্যাকরণের সূত্র মানিতেন না; তাহার জন্য লক্ষ্মণসেনের অনুরোধের প্রয়োজন হইবে কেন? ১১৫৯ খ্ৰীষ্ট বৎসরে সর্বানন্দ পরুষোত্তমের ভাযাবৃপ্তির উল্লেখ যদি করিয়াই থাকেন, তবু সন্দেহ থাকিয়াই যায়; কারণ প্রথমত উল্লেখটাই নির্ভরযোগ নয়; দ্বিতীয়ত ১১৫৯-এ লক্ষ্মণসেন হয়তো সিংহাসনেই আরোহণ করেন নাই! কাজেই লক্ষ্মণসেনের সঙ্গে তথা বাঙলাদেশের সঙ্গে পুরুষোত্তমের সম্বন্ধ সন্দেহাতীত নয়। পুরুষোত্তমদেব যে একাদশ বা দ্বাদশ শতকের লোক তাহাও নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না।
কোয্যকার পুরুষোত্তমের শ্রেষ্ঠ গ্ৰন্থ ত্রিকাণ্ডশেষ বিখ্যাত অমরকোষের সম্পূরক, অমর যাহা বাদ দিয়া গিয়াছেন। পুরুষোত্তম তাহাই পূরণ করিয়াছেন। তিনি আরও অন্তত তিন খানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন-হালাবলি, বৰ্ণদেশনা ও দ্বিরূপকোষ। হারাবলি ২৭৮টি শ্লোকে সাধারণত অব্যবহৃত প্ৰতিশব্দ ও সমরশব্দের সংগ্ৰহ। বৰ্ণদেশনা গদ্যে রচনা; যে-সব শব্দের বানানের রূপ নানা প্রকারের সেই সব শব্দের আলোচনা এই গ্রন্থে আছে, বিশেষভাবে গৌড়ীয় লিপিরূপের জন্য যে-সব বানানে নানা রকমের গোলমাল সেই সব শব্দের উল্লেখ ও আলোচনা আছে। দ্বিরূপকোষে ৭৫টি শ্লোকে এমন সব শব্দের একটি তালিকা আছে যাহাদের বানানের দুইটি রূপ।
