জীমূতবাহন
ধর্মশাস্ত্র রচয়িতাদের মধ্যে ভবদেব-ভট্টের পরেই নাম করিতে হয় পারিভদ্রীয় (পরিভদ্র-কুলজাত; বোধ হয়। রাঢ়ীয় পারিহাল বা পারি-গাঞী) মহামহোপাধ্যায় জীমূতবাহনের। তাহার বাড়ি ছিল খুব সম্ভব রাঢ়দেশে। জীমূতবাহনের কাল লইয়া পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ বিস্তর। তিনি রাজা ভোজ এবং গোবিন্দরাজের নাম করিয়াছেন এবং শকাব্দ ১০১৪-১০৯২ খ্রীষ্ট বৎসরের উল্লেখ করিয়াছেন; কাজেই তাহার,কাল একাদশ শতকের আগে হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে বাচস্পতি মিশ্র, শূলপাণি ও রঘুনন্দন তিন জনাই জীমূতবাহনের গ্রন্থাদি হইতে মতামত উদ্ধার ও আলোচনা করিয়াছেন; কাজেই তাঁহার কাল চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের পরেও হইতে পারে না। খুব সম্ভব তিনি দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে জীবিত ছিলেন। জীমূতবাহন। অন্তত তিনখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন- কালবিবেক, ব্যবহারমাতৃকা এবং দায়ভাগ। কালবিবেক-গ্ৰন্থ ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মের নানা পূজানুষ্ঠান শুভকর্ম, আচার, ধর্মোৎসব প্রভৃতি পালনের শুভাশুভ কাল, সৌরমাস, চান্দ্রমাস প্রভৃতি সম্বন্ধে আলোচনা। এ-সম্বন্ধে জীমূতবাহন পূর্ববতী অসংখ্য লেখকের রচনা উদ্ধার ও আলোচনা করিয়া নিজের মতামত ও যুক্তি প্ৰতিষ্ঠা করিয়াছেন। এ-গ্ৰন্থ সমসাময়িক কালে প্রভূত সমাদর লাভ করিয়াছিল, এবং রঘুনন্দন, শূলপাণি, বাচস্পতি, গোবিন্দানন্দ প্রভৃতি সকলেই সশ্রদ্ধভাবে তাহার যুক্তি ও মতামত উদ্ধার ও স্বীকার করিয়াছেন। ব্যবহারমাতৃকা-গ্রন্থ ব্ৰাহ্মণ্যদর্শনুযায়ী বিচারপদ্ধতির আলোচনা; গ্রন্থের পাঁচটি বিভাগ : ব্যবহারমুখ, ভাষাপাদ, উত্তরপাদ, ক্রিয়াপদ এবং নির্ণয়পাদ। ব্যবহারের সংজ্ঞা, প্রাড়বিবাক বা বিচারকের গুণাগুণে ও কর্তব্য, নানা প্রকার ও স্তরের ধর্মধিকরণ, ধর্মাধিকরণ-সভ্যদের কর্তব্য, বিচারার্থীর আবেদন বা পূর্বপক্ষ, প্রতিভূ বা জমীন, প্রত্যার্থীদের চার প্রকারের উত্তর বা জবাব, প্রমাণ বা ক্রিয়া, মানুষী ও দৈবী নানা প্রকারের সাক্ষ্য, বিচার ও বিচারফল প্রভৃতি সমস্তই পূর্বোক্ত পাঁচভাগ জুড়িয়া আলোচিত হইয়াছে। এই গ্রন্থেও জীমূতবাহন পূর্বগামী পণ্ডিতদের প্রচুর বচন ও মতামত উদ্ধার ও নিপুণ আলোচনা করিয়াছেন। জীমূতবাহনের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্ৰন্থ দায়ভাগ, এবং এই গ্রন্থ আজও মিতাক্ষরা-বহির্ভূত হিন্দুসমাজে দায় বা উত্তরাধিকার, সম্পত্তি-বিভাগ এবং স্ত্রী-ধন সম্পর্কে একতম সুবিখ্যাত ও সুপ্রতিষ্ঠিত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে জীমূতবাহন পূর্বগামী অসংখ্য শাস্ত্রকারদের যুক্তি ও মতামত উদ্ধার করিয়া অগাধ পণ্ডিত্য এবং প্রখর বুদ্ধির সাহায্যে সে-সব আলোচনা ও খণ্ডন করিয়াছেন। দায়ভাগের টীকাকার অনেক; রঘুনন্দন বারবার তাহার গ্রন্থে দায়ভাগের যুক্তি ও মতামত গ্রহণ করিয়াছেন। সন্দেহ নাই, দায়ভাগ সমসাময়িককালেই যথেষ্ট প্রসিদ্ধি ও প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল। বাঙলাদেশে তো আজও দায়ভাগ আলোচ্য বিষয়ে একমাত্র প্রামাণিক গ্রন্থ। জীমূতবাহন যে অদ্ভুত মনীষা ও পাণ্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, সুকুশলী নৈয়ায়িক ছিলেন, প্রখর ছিল তাহার বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্ব এ-তথ্য অনস্বীকার্য।
অনিরুদ্ধ
ধমাধ্যক্ষ বা ধর্মাধিকরণিক, বরেন্দ্ৰান্তৰ্গত চম্পাহট্টীয় মহামহোপাধ্যায় অনিরুদ্ধ, এবং বরেন্দ্রীবাসী বল্লাল-গুরু, বেদ, পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্ৰবিদ অনিরুদ্ধ একই ব্যক্তি, সন্দেহ নাই। বল্লালসেন ইহারই নিকট পুরাণ ও স্মৃতিশিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন এবং দানসাগর-গ্রন্থে ইহারই সশ্রদ্ধ উল্লেখ বর্তমান। অনিরুদ্ধের হারলতা এবং পিতৃদায়িত উভয়ই সুবিখ্যাত গ্রন্থ। অনিরুদ্ধ বাস করিতেন গঙ্গাতীরে বিহার-পাটকে। কুমারিল-ভট্টের মীমাংসা সম্বন্ধীয় মতামতের সঙ্গে তাহার পরিচয় ছিল ঘনিষ্ঠ। হারলতা অশৌচ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ের বিস্তৃত আলোচনা। পিতৃদায়িত সামবেদী গোভিলপন্থীদের শ্ৰাদ্ধাদি ব্যাপারে নানা ক্রিয়াকর্মের বর্ণনা বিধান। আচমন, দন্তধাবন, স্নান, সন্ধ্যা, পিতৃতৰ্পণ, বৈশ্বদেবতৰ্পণ, পার্বণশ্রাদ্ধ, দানন্তুতি প্রভৃতি কিছুই বাদ পড়ে নাই। রঘুনন্দন এই দুই গ্রন্থেরই বিস্তৃত ব্যবহার করিয়াছেন।
বল্লালসেন
অনিরুদ্ধ-শিষ্য সেন-রাজ বল্লালসেন অন্তত চারখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন— আচারসাগর, প্রতিষ্ঠাসাগর, দানসাগর এবং অদ্ভুতসাগর। দানসাগরে প্রথমে দুইটি গ্রন্থের উল্লেখ আছে; আচারসাগরের কিছু কিছু উদ্ধৃতি আছে বেদাচার্যের স্মৃতিরত্নাকর এবং বিশ্বেশ্বর-ভট্টের মদনপারিজাত গ্রন্থদ্বয়ে। কিন্তু আচারসাগর ও প্রতিষ্ঠাসাগর গ্রন্থ আমাদের কালে আসিয়া পৌঁছায় নাই। দানসাগর রচিত হইয়াছিল গুরু অনিরুদ্ধের শিক্ষার অনুপ্রেরণায়, এ-কথা বল্লালসেন নিজেই স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু রঘুনন্দন বলিতেছেন, গ্রন্থটি অনিরুদ্ধ-ভট্টের নিজের রচনা। গ্রন্থটিতে ৭০টি বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন প্রকারের দান, দানপুণ্য, দানের উদ্দেশ্য, প্রকৃতি, প্রয়োজনীয়তা, স্থান-কাল-পাত্র, কুদান, নিষিদ্ধদান, দানকরণ এবং দানগ্রহণের রীতি, ক্রম ও পদ্ধতি, ষোড়শ মহাদান, অসংখ্য ক্ষুদ্র দান প্রভৃতি সম্বন্ধে সুবিস্তৃত আলোচনা আছে। এ-বিষয়ে অন্যান্য নানা গ্রন্থ এবং সাধারণ সমস্ত পুরাণের উল্লেখও আছে। অদ্ভুতসাগর নানা শুভাশুভলক্ষণ সম্বন্ধীয় গ্রন্থ; তিনটি ভাগে গ্ৰহতারা, রামধনু, বীজ, বিদ্যুৎ, ঝড়, ভূমিকম্প অর্থাৎ আকাশী, বায়বীয় এবং ভৌতিক নানা ইঙ্গিত ও লক্ষণের আলোচনা। অদ্ভুতসাগর বল্লালসেন সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারেন নাই। এই সুবৃহৎ গ্রন্থটি সমাপন করিয়াছিলেন পুত্ৰ লক্ষ্মণসেন পিতার নিকট প্রতিজ্ঞাক্ৰমে। গ্রন্থটির রচনা আরম্ভ হইয়াছিল ১০৮৯ শকে (১১৬৮ খ্ৰীষ্ট বৎসরে)।
