এই পর্বে ব্ৰাহ্মণ্য ধর্ম ও সংস্কৃত সাহিত্যের পুনরভ্যুত্থান শুধু যে বাঙলাদেশেই আবদ্ধ ছিল তাহা নয়। সমগ্র উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতবর্ষ জুড়িয়াই তখন নূতনতর এক ব্ৰাহ্মণ্য দৃষ্টির এবং সৃষ্টির তরঙ্গ বহিয়া চলিয়াছে–কাশ্মীরে, কল্যাণে (মহারাষ্ট্র), কলিঙ্গে, কনৌজে, ধারায়, মিথিলায়। এই একই ব্ৰাহ্মণ্য তরঙ্গ বাঙলাদেশেও বহিয়া আসে নাই, তাহা কে বলিবে? কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, এই পর্বের বাঙলায় সমস্ত গ্ৰন্থ-রচনাই তিনটি রাজার রাজত্বকালে– হরিবর্মা, বল্লালসেন, লক্ষ্মণসেন, এবং সমস্ত গ্ৰন্থই প্ৰায় হয় জ্যোতিষ-মীমাংসা ধৰ্মশাস্ত্র-স্মৃতিশাস্ত্র, অর্থাৎ ব্ৰাহ্মণ্য আচার-আচরণ সম্পর্কিত, অথবা কাব্যনাটক, এবং সে কাব্য-নাটকও চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী এবং ব্রাহ্মণ্য-ঐতিহ্যে ভরপুর। ব্যাকরণে, ন্যায় বৈশেষিক দর্শনে, বৌদ্ধ বিজ্ঞানবাদের আলোচনায়, তান্ত্রিক দর্শনে, নূতন সাহিত্যরীতির প্রবর্তন ও প্রচলনে যে-বাঙলাদেশ গুপ্তোত্তর ও পালপর্বে প্রায় সর্বভারতীয় খ্যাতি অর্জন করিয়াছিল, এই পর্বে সে-সব দিকে কোনো উল্লেখযোগ্য চেষ্টাও যে ছিল, এমন নিদর্শন পাওয়া যাইতেছে না। এই তথ্যের মধ্যে ইতিহাসের যে-ইঙ্গিত নিহিত তাহা অন্য প্রসঙ্গে একাধিকবার ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি; এখানে পুনরুল্লেখ নিম্প্রয়োজন। আসল কথা, এই পর্বে বাঙালীর মনন ও অন্বেষণের স্রোতে ভঁটা পড়িয়া গিয়াছিল, গভীরতর এবং বহুমুখী জ্ঞানসাধনা আর ছিল না, স্বাধীন চর্চার ক্ষেত্রে স্বকীয়ত্ব প্রায় নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। একমাত্র কবিকল্পনার ক্ষেত্রে কিছুটা সরস প্রাণপ্রবাহ ত্ৰয়োদশ শতকের প্রথম পাদ পর্যন্তও অব্যাহত ছিল, কিন্তু সে-প্রাণেরও বিস্তার বা গভীরতা স্বল্প। গীতগোবিন্দের মতো কাব্যও যথার্থত স্বল্পপ্রাণ; তাঁহার মাধুর্য আছে, শক্তি নাই; সুর আছে, তেজ নাই; দাহ আছে, দীপ্তি নাই।
মীমাংসা, ধর্মশাস্ত্ৰ, স্মৃতিশাস্ত্ৰ, ব্ৰাহ্মণ্য বিধি-বিধান
গৌড় মীমাংসক সম্বন্ধে উদয়ন ও গঙ্গেশ-উপাধ্যায় যে উক্তিই করিয়া থাকুন না কেন বাঙলাদেশে যে মীমাংসার চর্চা হইত। তাহার লিপি প্রমাণ বিদ্যমান। তাহা ছাড়া অনিরুদ্ধ ও ভবদেব-ভট্ট এই দুইজনই ছিলেন মীমাংসা-শাস্ত্ৰে সুপণ্ডিত: তাহারা দুইজনই কুমারিল-ভট্টের মীমাংসা সম্বন্ধীয় মতামতের সঙ্গে সুপরিচিত। হল্যায়ুধও বলিতেছেন, বাঙলাদেশে বৈদিক শাস্ত্রাদির আলোচনা হইত না বটে, কিন্তু মীমাংসার চর্চা ছিল। কিন্তু তাহা থাকিলেও এই পর্বে রচিত মীমাংসাশাস্ত্রের মাত্র দুটি গ্রন্থের খবর আমরা জানি। একটি ভবদেব-ভট্টকৃত তৌতান্তিতমততিলক, অর্থাৎ তোতাতিত বা কুমারিল-ভট্টের তন্ত্র-বার্তিক গ্রন্থের টীকা, আর একটি হলায়ুধের মীমাংসা সর্বস্ব। শেষোক্ত গ্রন্থটি বিলুপ্ত; আর, তৌতাতিতমততিলক-পূর্বমীমাংসাসূত্রের একাংশের মাত্র টীকা।
ভবদেব ভট্ট
এই পর্বে ধর্মশাস্ত্রের প্রসিদ্ধতম লেখক হইতেছেন বালবলভী ভূজঙ্গ (বালবলভী নামক নগরের নাগরিক), রাঢ়ন্তের্গত সিদ্ধলগ্রামবাসী , সামবেদীয় কৌঠমশাখাধ্যায়ী, সাবর্ণগোত্রীয় ব্ৰাহ্মণ ভট্ট-ভবদেব। তাঁহার এক পূর্বপুরুষ জনৈক অনুল্লিখিতনাম গৌড়রাজের নিকট হইতে হস্তিনীভিট্ট নামক গ্রাম শাসনস্বরূপ পাইয়াছিলেন; তাহার পিতামহ আদিদেব জনৈক বঙ্গরাজের সন্ধিবিগ্রহিক ছিলেন; পিতার নাম ছিল গোবর্ধন; মাতা সাঙ্গোকা ছিলেন জনৈক বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণের কন্যা। ভবদেব নিজে বর্মণরাজ হরিবর্মা এবং সম্ভবত তাঁহার পুত্রেরও মহাসন্ধিবিগ্রহিক-মন্ত্রী ছিলেন। শিক্ষিত অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করিয়া ভবদেব রাষ্ট্ৰীয় প্রভুত্বেরও অধিকারী হইয়াছিলেন, ধর্মাচরণোদেশে অনেক দীঘি ও মন্দির নির্মাণ করাইয়াছিলেন, কিন্তু তাহার চেয়েও উল্লেখযোগা এই যে, সমসাময়িক কালে তাঁহার চেয়ে যুগন্ধর শাস্ত্ৰজ্ঞ পণ্ডিত আর কেহ ছিলেন না। তিনি ছিলেন ব্ৰহ্মাদ্বৈত দর্শনের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাতা, কুমারিল-ভুট্রের মীমাংসা বিষয়ক মতামতের সঙ্গে সুপরিচিত, বৌদ্ধদের পরম শত্রু এবং পাষণ্ড বৈতণ্ডিকদের তর্কখণ্ডনে পটু, অর্থশাস্ত্ৰে সুপণ্ডিত, আয়ুর্বেদ-অস্ত্ৰবেদ-তন্ত্র গণিত্ব সিদ্ধান্তে সুদক্ষ, জ্যোতিষে ফলসংহিতায় দ্বিতীয় বরাহ। বাচস্পতি-রচিত- ভবদেব-প্রশস্তিতে বলা হইয়াছে যে, তিনি হোরাশাস্ত্র এবং ধর্মশাস্ত্ৰ সম্বন্ধে এক একখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন, এবং ভট্রোক্ত (অর্থাৎ কুমারিলোপ্ত) নীতি অনুসরণ করিয়া এক সহস্ৰ নায়ে মীমাংসা সম্বন্ধীয় আরও একটি গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন।
ভবদেব রচিত হোরাশাস্ত্রের কোনো পুঁথি আজও পাওয়া যায় নাই। মীমাংসা সম্বন্ধীয় গ্রন্থটি পূর্বোক্ত তৌততিতমততিলক, সন্দেহ নাই। ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে তিনি একাধিক গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন; ব্যবহার, প্ৰায়শ্চিত্ত এবং আচার সম্বন্ধে অন্তত তিনখানা গ্রন্থের সংবাদ এ-পর্যন্ত জানা গিয়েছে— ব্যবহারতিলক, প্ৰায়শ্চিত্তপ্রকরণ (বা প্ৰায়শ্চিন্তু নিরূপণ), এবং ছান্দোগ্যকর্মানুষ্ঠান পদ্ধতি (বা দশকর্মপদ্ধতি বা সংস্কার-পদ্ধতি বা দশকর্মদীপিকা)। ব্যবহারতিলক-গ্রন্থের কোনো পুঁথি আজও পাওয়া যায় নাই, তবে রঘুনন্দন, মিত্ৰমিশ্র এবং বর্ধমান প্রভৃতি পরবর্তী স্মৃতিকর্তারা এই গ্রন্থের নানা মতামত উদ্ধার করিয়াছেন তাঁহাদের রচনায়। প্ৰায়শ্চিত্ত-প্রকরণ-গ্রন্থে ভবদেব প্রায় ষাট জন পূর্বগামীদের মতামত উদ্ধার করিয়া ছয় প্রকারের অপরাধ ও তাহার প্রায়শ্চিত্ত সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করিয়াছেন। এই গ্রন্থ বাঙলাদেশে এবং বাঙলাদেশের বাহিরে প্রভূত প্রতিষ্ঠা অর্জন করিয়াছিল; পরবর্তীকালের বেদাচাৰ্য, নারায়ণভট্ট এবং গোবিন্দানন্দ প্রভৃতি প্ৰসিদ্ধ ধর্মশাস্ত্ৰ-রচয়িতারাও ভািবদেবের মতামত উদ্ধার ও আলোচনা করিয়াছেন। ছন্দোগ্য-কর্মানুষ্ঠানপদ্ধতি সামবেদীয় দ্বিজবর্ণের সংস্কার ‘সম্বন্ধীয় গ্রন্থ; গর্ভাধান, পুংসবন, সীমাস্তোন্নয়ন হইতে আরম্ভ করিয়া ষোলো প্রকারের সংস্কারের আলোচনা এই গ্রন্থে আছে।
