কাঅ হউ দুবল, তেজি গারাস, খাণে খণে জানিঅ অচ্ছ ণিসাস।
কুহূরব তার দুরন্ত বসন্ত, নিদ্দঅ কাম নিদ্দঅ কস্ত৷।
দুর্বল হইল কায়, গ্রাস (অর্থাৎ আহার) হইল পরিত্যক্ত, ক্ষণে ক্ষণে (দীর্ঘ) নিঃশ্বাস জানা যাইতেছে; কুহুরব তীব্র, বসন্ত, দুরন্ত– কাম-নির্দয় কি কান্ত নির্দয়, জানি না।
সো মহকস্তাদূর দিগন্তা।
পাউস আএ চেউ চলাএ৷।
সেই আমার কান্ত (গিয়াছে) দূর দিগন্তে; প্রাবৃষ (বৰ্ষ) আসিতেছে, চঞ্চলিত হইতেছে চিত্ত।
গজ্জই মেহ কি অম্বর সামর
ফুল্লাই ণীব লি বুল্লই ভামর।
এক্কল জীঅ পরাহিণ অম্মহ
কীলউ পাউস কীলউ বাম্পহ।৷
মেঘ গর্জন করিতেছে, অম্বর শ্যামল, নীপ ফুটিয়াছে, ভ্রমর বুলিতেছে; আমার একলা জীবন পরাধীন; প্রাবৃষ (মেঘ) খেলা করিতেছে, মন্মথও খেলা করিতেছে।
তরুণ-তরুণি, তবই ধরণি, পাবণ বহখরা
লগ ণহি জল, বড় মরু থল, জনজীবন হরা।
দিসই বলই, হিঅ আ দুলাই, হামি একলি বহু
ঘর ণহি পিআ, সুণহি পহি আ, মণ ঈচ্ছই কহু৷
তরুণ সূর্যে ধরণী, তপ্ত, বাতাস বহিতেছে খর বেগে, নিকটে নাই জল, জল জীবননাশা বিস্তৃত মরুস্থল (সম্মুখে); ঘরে নাই আমার প্রিয়, আমি একেলা বধু— শোনো গো পথিক, আমার মন কী চায়।
শুধু প্রমের কবিতা, ভক্তিরসের কবিতাই নয়, বীররসের কবিতাও প্রাকৃত-পৈঙ্গলে মিলিতেছে, এবং সেই প্রসঙ্গে বাঙালীর বীরত্বের গৌণ প্রশংসাও আছে। সুকুমার সেন মহাশয় তাহার কিছু কিছু উদ্ধার করিয়াছেন। এই গ্রন্থে শ্ৰীকৃষ্ণরাধাকাহিনী, শ্ৰী রামচন্দ্র প্রভৃতি লইয়াও দুই চারিটি ছোট ছোট কবিতা আছে! একটি শ্লোকে দেখিতেছি, কয়েকটি বিশিষ্ট মাত্ৰা-সংস্থানের নামকরণই হইয়াছে বাঙলাদেশে পজিত চারিজন বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য দেবীর নামানুসারে— লক্ষ্মী, গৌরী, চুন্দা ও মহামায়া। আর একটি শ্লোকে শিবজায়া পাৰ্ব্বতীর দারিদ্র্যময় সংসারের গাৰ্হস্থ্য দুঃখ বৰ্ণনা অত্যন্ত করুণ!
বাল কুমারো ছঅ মুণ্ডধারী, উবা অহীণা মুই এক্ক ণারী।
অহংণিসং খাই বিসং ভিখারী গঈ ভবিত্তী কিল কা হামারী।
ছয় মুণ্ডধারী বালকপুত্র আমার ছয়মুখে খায়, আর আমি এক উপায়হীনা নারী! আমার ভিখারী স্বামী অহৰ্নিশ কেবল বিষ খায়; কী গতি হইবে আমার!
এই বর্ণনা মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যে শিবগৃহিণী পার্বতীর গাৰ্হস্থ্য-বৰ্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলিয়া যায়; সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থেরও একাধিক প্রকীর্ণ শ্লোকে একই চিত্র সুস্পষ্ট দৃষ্টিগোচর। সন্দেহ নাই, এ-চিত্র একান্তই বাঙালীর এবং বাঙলার আবহে-পরিবেশে আস্নাত।
শুদ্ধ ও সংযত, স্বচ্ছন্দ ও সমৃদ্ধ সংসারের সংক্ষিপ্ত বাস্তব বর্ণনাও আছে।
পুত্ত পবিত্ত বহুত্ত ধণা ভত্তি কুটুম্বিণি সুদ্ধমনা।
হাঙ্ক তারাসই ভিচ্চগণা কো কর বব্বর সগ্গমণা।৷
পুত্র পবিত্র; অনেক ধন; ভর্ত্রী অর্থাৎ স্ত্রী এবং কুটুম্বিনীরা শুদ্ধ স্বভাবা; হাঁকে ত্ৰস্ত হয় ভূত্যগণ; (এমন সব রাখিয়া) কোন বর্বর স্বর্গে যাইতে চায়!
গীতগোবিন্দ-রচয়িতা জয়দেব অপভ্রংশ ভাষায়ও গীতিকবিতা রচনা করিতেন। গুর্জরী ও মারূ রাগে গেয় জয়দেবের দুটি গান শিখদের শ্ৰীগুরুগ্রন্থে বা আদিগ্রন্থে স্থান পাইয়াছে, কিছুটা বিকৃত রূপে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তাহা উদ্ধার করিয়াছেন।
ধর্মাশ্রয়ী বৌদ্ধ বা ব্রাহ্মণ্য গীতিকবিতা ছাড়া অপভ্রংশে কিছু কিছু প্রেমের কবিতাও যে বাঙলাদেশে রচিত হইয়াছিল তুর্কী-বিজয়ের আগেই, তাহার পরিচয় তো প্রাকৃত-পৈঙ্গলের কতকগুলি শ্লোকে পাওয়া যাইতেছে। ইহাদের মধ্যে কিছু বাঙলা শব্দ, বাঙলা বাকভঙ্গি, বাঙলা ধরন-ধারণ, সর্বোপরি বাঙলার আবহ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। খুব সম্ভব এই ধরনের কবিতাগুলি বাঙলাদেশেই রচিত হইয়াছিল, এমন অপভ্রংশে যাহার উপর প্রাচীনতম বাঙলা ভাষার প্রভাব অত্যন্ত বেশি।
সৰ্ব্বানন্দের টীকাসর্বস্ব গ্রন্থে বৌদ্ধ ধর্মদাসের বিদগ্ধমুখমণ্ডল-গ্ৰন্থ হইতে কিছু কিছু শ্লোকের উদ্ধৃতি আছে। সুকুমার সেন মহাশয় দেখাইয়াছেন, এই গ্রন্থের কোনও কোনও শ্লোক ও শ্লোকাংশ প্রাকৃত ও অপভ্রংশে, রচিত; প্রাচীনতম বাঙলাভাষারও দু’একটি ছত্র বিদ্যমান। সুনীতিবাবু দেখাইয়াছেন, শেক-শুভোদয়ার উনবিংশ অধ্যায়ে মধ্যযুগীয় বাঙলাভাষায় রচিত একটি প্রেমের কবিতা আছে; কবিতাটি প্রাক-তুর্কী আমলের রচনা বলিয়াই মনে হয়; পরে শোক-শুভোদয়া রচনাকালে সমসাময়িক ভাষায় রূপান্তরিত করা হইয়াছিল।
ডাক ও খনার নামে যে বচনগুলি বাঙলাদেশে আজও প্রচলিত তাহাও বোধ হয় প্রাক-তুর্কী আমলের চলতি প্রবাদ সংগ্রহ; কালে কালে তাঁহাদের ভাষা বদলাইয়া গিয়াছে মাত্র। শুভংকরের নামে প্রচলিত গণিত-আর্যার শ্লোকগুলিতেও যে অপভ্রংশের প্রত্যক্ষ প্রভাব বিদ্যমান তাহা অঙ্গুলি সংকেতে দেখাইবার প্রয়োজন আজ আর নাই।
লক্ষণীয় এই যে, এই পর্বে প্রাচীনতম বাঙলায় এবং অপভ্রংশে রচিত সাহিত্যের অল্পস্বল্প যে-সব দৃষ্টান্ত আমাদের গোচর তাহা সমস্তই গীতিকবিতা, এবং তাহার অধিকাংশ সুরে-তালে গোয়। বাঙলা দেশের এই সুপ্রাচীন গীতিকাব্যের ধারার সঙ্গেই মধ্যযুগীয় বাঙলা গীতিকাব্যের প্রবাহ যুক্ত, তাহা বৈষ্ণব-পদাবলীর ধারাই হোক, আর মঙ্গলকাব্যের ধারাই হোক।
মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল-মনসামঙ্গল-কাব্যে চাঁদ সদাগর-লখীন্দর-বেহুলা- ধনপতি-লহনা-খুল্লনা-শ্ৰীমন্ত-কালকেতুর যে-কাহিনীর সঙ্গে আমাদের পরিচয়, গোপীচাঁদের গানে রাজা গোপীচন্দ্র-লাউসেন-ময়নামতী বা মদনাবতী-আদুনা-পদুনার যে গল্প আমরা পাইতেছি, এই সব গল্প খুব সম্ভব প্রাক-তুর্কী বাঙলার লোকায়ত স্তরে জনসাধারণের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, এবং অসম্ভব নয়, কিছু কিছু নূতন রচনাও হয়তো হইয়া থাকিবে। তবে, এ-সম্বন্ধে জোর করিয়া কিছু বলিবার উপায় নাই। মনসামঙ্গলের গল্পে অন্তর্বাণিজ্য ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের যে ছবি তাহা মধ্যযুগীয় বাঙলার ছবি নয়; সে-যুগে বাঙলার এই সামুদ্রিক বাণিজ্যসমৃদ্ধি আর ছিল না। মনে হয়, এই চিত্র প্রাচীনতর কালের দূরাগত স্মৃতিমাত্র; তাহারই উপর সমসাময়িক কালের প্রলেপ পড়িয়াছে। তাহা ছাড়া, ব্রাহ্মণ্যধর্মে মনসার প্রতিষ্ঠা নবম-দশম- একাদশ-দ্বাদশ শতকেই; কাহিনীটিতে মনসার যে প্রতাপ দৃষ্টিগোচর তাহা প্রথম প্রতিষ্ঠাকালে হওয়াই স্বাভাবিক। আর, গোপীৰ্চাদের গল্পে তো একাদশ-দ্বাদশ শতকীয় সহজিয়া তান্ত্রিকধর্মের স্রোত সবেগে বহমান।
০৬. সেন-বর্মণ পর্ব
দ্বাদশ শতকের সেন-বৰ্মণ পর্ব বাঙলাদেশে সংস্কৃত সাহিত্যের সুবর্ণযুগ। সেনা-বর্মণ রাজ বংশের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়া ধীরে ধীরে বদলাইতে আরম্ভ করে। এই দুই রাজবংশই বৈদিক ও পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের পরম পৃষ্ঠপোষক, এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের স্মৃতি ও সংস্কারানুযায়ী সমাজ পুনর্গঠনের প্রয়াসী। এই প্ৰয়াসের স্বাভাবিক প্রকাশ হইবে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের পোষকতা, ব্ৰাহ্মণ্য স্মৃতিগ্ৰস্থাদির অধিকতর আলোচনা ও রচনা, ব্রাহ্মণ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অধিকতর প্রচার, ব্ৰাহ্মণ্য ধর্ম ও জীবনাদর্শের অধিকতর প্রসার, ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছু নাই। এই পর্বে বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান, বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধর্ম ও জীবনাদর্শ অনাদৃত; অন্তত রাষ্ট্রের এবং সমাজের প্রতাপবান এবং সমৃদ্ধ উচ্চতর বর্ণ ও শ্রেণীর সক্রিয় পোষকতা ইহাদের পশ্চাতে আর নাই। সংঘ-বিহার ইত্যাদি ছিল না, বা এখানে সেখানে বৌদ্ধ ও অন্যান্য অবৈদিক ও অপৌরাণিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বা শিক্ষা-দীক্ষার চর্চা আর হইত না, তাহা নয়, কিন্তু যাহা যতটুকু হইত। তাহার পরিধি সংকুচিত হইয়া গিয়াছিল, সন্দেহ নাই, এবং সমস্ত চর্চা ও চর্য একান্ত ভাবেই সংকীর্ণ ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহা ছাড়া, এই সব বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীগুলির প্রভাব ক্রমশই সমাজের অপেক্ষাকৃত নিম্নতর স্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িতেছিল। পাল-বংশের শেষ অধ্যায় হইতেই সমাজ ও সংস্কৃতির এই গতি ধীরে ধীরে ধরা পড়িতেছিল; সেনা-বর্মণ বংশ সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাহার বেগ বাড়িয়াই গেল। প্রাকৃতধর্মী৷ ‘বৌদ্ধ সংস্কৃত, সৃজ্যমান প্রাচীনতম বাঙলা এবং শৌরসেনী অপভ্রংশের গৌড়-বঙ্গীয় রূপের চর্চা যাহা ছিল তাহা সাধারণত বৌদ্ধ তান্ত্রিক সমাজের মধ্যেই এবং লোকায়াত স্তরের স্বল্পসংখ্যক ব্ৰাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল বলিয়া মনে হয়।
