হে মূঢ়, কুলে কুলে ঘুরিয়া ফিরিও না, সংসারে সহজ পথ পড়িয়া আছে। সম্মুখে যে মায়া-মোহের সমুদ্র তাহার যদি না বোঝা যায় অন্ত, না পাওয়া যায় থই, সম্মুখে যদি না দেখা যায় ভেলা বা নৌকা, তবে এ-পথের যাহারা অভিজ্ঞ পথিক, তাহদের নিকট সন্ধান জানিয়া লও। শূন্য প্রান্তরে যদি না পাও পথের দিশা, ভ্রান্ত হইয়া আগাইয়া যাইও — না; সহজ পথে চল, তাহা হইলেই মিলিবে অষ্টমহাসিদ্ধি।
কাহ্ন ও সরহপাদের দোহাকোষ
আগেই বলিয়াছি, পশ্চিম ও উত্তর-ভারতীয় শৌরসেনী অপভ্রংশে রচিত হইয়াছিল সরহ ও কাহেক্তর দোহাগুলি। এই দোহাগুলিও সহজেসিদ্ধির গুহ্যতত্ত্ব ও আচরণ সম্বন্ধীয়, এবং ইহাদেরও অর্থ নিরূপণ অত্যন্ত কঠিন, তবে চর্যাগীতি অপেক্ষা সরলতর। ছন্দে ও ধ্বনিগৌরবে: দোহাগুলিওঁ খুব সমৃদ্ধ, তবে অদীক্ষিতের পক্ষে ইহাদের সৌন্দর্যের অনেকখানি গুহ্যনিহিত। ঠিক বাঙলা ভাষা ও বাঙলা সাহিতা না হইলেও প্রাচীনতম বাঙলা সাহিত্যের ধারার সঙ্গে ইহাদের সম্বন্ধ নিবিড়; দুইই একই ভাব-মণ্ডলের সৃষ্টি। পরবতী কালের বাঙলা বৈষ্ণব-পদাবলীর সঙ্গে ব্রজবুলিতে রচিত বৈষ্ণব-পদাবলীর যে-সম্বন্ধ, ভাষা ও ভাব-পরিমণ্ডলের দিক হইতে চর্যাগীতির সঙ্গে দোহাকোষের সম্বন্ধ ঠিক তাহাই প্রাচীন বাঙলায় শৌরসেনীর এই প্রভাব উত্তর-ভারতের দান; এ-দান কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করিতেই হয়।
চর্যাগীতিগুলির পাঠ সর্বত্র সুস্পষ্ট নয়, গুহা অর্থ তাহাকে আরও যেন অস্পষ্ট করিয়া দেয়। সংস্কৃত টীকাটির ভাষা এবং অর্থও দুর্বোধ্য। দোহাকোষ সম্বন্ধেও বক্তব্য একই। চর্যার ভাষায় কোথাও শৌরসেনী অপভ্রংশের এবং কোথাও কোথাও মৈথিলীর প্রভাব সুস্পষ্ট। ঠিক তেমনই দোহাগুলির অপভ্রংশ কিছু কিছু স্থানীয় বাঙলা ও মৈথিলী প্রভাবও ঢুকিয়া পড়িয়াছে। কাহ্ন ও সরহপাদের ২/৪টি অপভ্রংশে দেহাংশ অন্য প্রসঙ্গে অন্যত্র উদ্ধার করিয়াছি; এখানেও একটি উদ্ধার করিলাম, কতকটা ইহাদের সাহিত্য মূলের সঙ্গে পরিচিত হইবার জন্য।
পণ্ডিত লোঅ খমহু মহু এখুনি কিঅই বিআপ্পু
জো গুরুবঅণে মই সুঅই তহি কিং কহুমি সুগোপ্পু
কমল কুলিস বেবি মজ কঠিউ জো সো সুরত্ম বিলাস
কো তহি রামই ন তিহু আণ কস্স ন পূরই আস৷।
পণ্ডিত লোক, আমাকে ক্ষমা কর; এখানে কিছু বিকল্প করা হইতেছে না; যাহা আমি শুনিয়াছি সুগোপন গুরুবাক্যে তাহা আমি কী করিয়া বলি! কমল এবং কুলিশ এই দুইয়ের মধ্যস্থিত যে সুরতবিলাস তাহাতে ত্ৰিভুবনে কোেনা সুখী হয় এবং কাহার না। আশা পূৰ্ণ হয়!
কৃষ্ণ-রাধা কাহিনী
প্রাচীনতম বাঙলা ভাষা যেমন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ভাবের ও তত্ত্বের বাহন হইয়াছিল, ব্ৰাহ্মণ্য সাহিত্যেও যে সে-ভাষা একেবারে ব্যবহৃত হয় নাই, এমন নয়। প্রাচীন বাঙলা সাহিত্যে রাধা-কৃষ্ণ কাহিনীর কয়েকটি নাম যে বিবর্তিত রূপে আমাদের গোচর তাঁহাদের ভাষাতত্ত্বগত ইঙ্গিত খুব সুস্পষ্ট বলিয়াই মনে হয়। কৃষ্ণ-কাহ্ন-কানু বা কানাই, রাধিকা-রাহী-রাই, কংস-কাংস, নন্দ-নান্দ, অভিমন্যু-অহিবণ্ণু বা অহিমণ্ণু-আইহণ, আইমন-আয়ান প্রভৃতি নামের বিবর্তনের মধ্যে অর্থাৎ সংস্কৃত হইতে প্রাকৃত এবং প্রাকৃত হইতে অপভ্রংশের মারফৎ প্রাচীন বাঙলায় রূপান্তরের মধ্যে বোধ হয় এ-তথ্য লুক্কায়িত যে কৃষ্ণ-রাধিকার কাহিনী কোনও না কোনও সাহিত্যরূপ আশ্রয় করিয়া কামরূপে ও বাঙলা দেশে প্রসার লাভ করিয়াছিল তুর্কী-বিজয়ের বহু আগেই। এই সাহিত্যরূপের প্রত্যক্ষ প্রমাণও কিছু কিছু আছে, যদিও তাহা সুপ্রচুর নয়। কামরূপরাজ বনমালদেবের একটি লিপিতে, ভোজ্যবর্মার বেলাব-লিপিতে, কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়-গ্রন্থের কয়েকটি প্রকীর্ণ শ্লোকে কৃষ্ণের ব্রজলীলার বর্ণনার কথা তো আগেই বলিয়াছি।
তাহা ছাড়া, চালুক্যরাজ তৃতীয় সোমেশ্বরের পৃষ্ঠপোষকতায় ১০৫১ শকে (১১২৯ খ্ৰীষ্ট বৎসরে) মানসোল্লোস বা অভিলষিতাৰ্থচিন্তামণি নামে একটি সংস্কৃত কোষগ্রন্থ রচিত হইয়াছিল; এই গ্রন্থের গীতবিনোদ অংশে ভারতবর্ষের সমসাময়িক সমস্ত স্থানীয় ভাষায় রচিত কিছু কিছু গানের দৃষ্টান্ত সংকলিত হইয়াছে; ইহাদের মধ্যে কয়েকটি প্রাচীনতম বাঙলায় রচিত গানও আছে। এই বাঙলা গানগুলির বিষয়বস্তু গোপীদের লইয়া শ্ৰীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা এবং বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার-বর্ণনা। এই গানগুলি বাঙলা দেশেই রচিত হইয়াছিল, সন্দেহ নাই, এবং এই প্রান্ত হইতেই মহারাষ্ট্র-প্রান্তে প্রচারিত হইয়াছিল।
গীতগোবিন্দের ভাষা
আচাৰ্য সুনীতিকুমার দেখাইয়া দিয়াছেন, জয়দেব গীতগোবিন্দ-গ্রন্থে এমন কতকগুলি পদ বা গান আছে যে-গুলি আগেও সুরে গাওয়া হইত, এখনও হয়। গীতগোবিন্দের ভাষা শব্দ ও ব্যাকরণের দিক হইতে সংস্কৃত সন্দেহ নাই, কিন্তু ইহার ছন্দ, রীতি ও ভঙ্গি, ইহার অনুভব, ইহার প্রাণবায়ু সমস্তই যেন লোকায়ত স্থানীয় ভাষার, সে-ভাষা প্রাচীনতম বাঙলাই হোক বা বাঙলা দেশে প্রচলিত শৌরসেনী অপভ্রংশই হোক। আর, আগেই বলিয়াছি, এই দুই ভাষায় বিশেষ পার্থক্যও কিছু ছিলনা। এমন কথাও কেহ কেহ বলেন, মূল গীতগোবিন্দ রচিত হইয়াছিল শৌরসেনী অপভ্রংশে বা প্রাচীনতম বাঙলায় পরে তাহার উপর একটা সংস্কৃত পোশাক পরাইয়া দেওয়া হইয়াছে মাত্র! এ-অনুমান সত্য হউক বা না হউক (সত্য বলিয়া মনে করিবার কারণ খুব নাই), একদিকে চর্যাগীতি ও অন্যদিকে গীতগোবিন্দের ধারায়ই পরবর্তী কালের বৈষ্ণব-পদাবলীর সৃষ্টি। চতুর্দশ শতকের শেষাশেষি প্রাকৃত-পৈঙ্গল নামে অবহঠাঁট (অপভ্রষ্ট) বা অপভ্রংশ-ভাষায় রচিত গীতিকবিতার একটি সংকলন গ্ৰন্থ রচিত হয়; প্রাকৃত ছন্দের বিভিন্ন রূপ ও প্রকৃতির দৃষ্টান্ত সংকলন-করাই ছিল অজ্ঞাতনামা গ্রন্থকারের উদ্দেশ্যে। এই গ্রন্থে একাদশ-চতুর্দশ শতকীয় শৌরসেনী অপভ্রংশে রচিত এমন কয়েকটি পদ আছে যে-গুলির মধ্যে কিছু কিছু বাঙলা শব্দ, বাঙলা ধরন-ধারণ প্ৰত্যক্ষ গোচর। ভাষার দিক হইতে গীতগোবিন্দের পদগুলির সঙ্গেও কয়েকটি পদের আত্মীয়তা কিছুতেই দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়। এক কথায় ইহাদের আবহ যেন একান্তই বাঙলার, এবং খুব সম্ভব এই অপভ্ৰংশ পদগুলি বাঙলাদেশেই রচিত হইয়াছিল। কয়েকটি দৃষ্টান্ত উদ্ধার করিতেছি। ক্ষুদ্র পরিসরে ঘনীভূত ভাব ও রসের, ধ্বনি ও ছন্দের এমন সুন্দর প্রকাশ প্রাচীন কাব্যে খুব কমই দেখা যায়। আমার ধারণা, প্রাকৃত-পৈঙ্গলের অনেকগুলি শ্লোক ও কবিতায় বাঙলাদেশের যেটুকু পরিচয় পাইতেছি। তাহা প্ৰাক-তুর্কী বাঙলার।
