চর্যাগীতি
প্রায় পঁয়ত্রিশ বৎসর আগে আচার্য হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপাল হইতে চারিখানা প্রাচীন পুঁথি। সংগ্ৰহ করিয়া আনেন। প্রথমটিতে ছিল বিভিন্ন পদকর্তার রচিত ৪৬টি ছোট ছোট গান; বইটির নাম চর্যচর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাগীতি। গানগুলির সুবিস্তৃত সংস্কৃত টীকাও গ্রন্থটিতে আছে। বহুদিন পর প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয় মূল-গ্রন্থের একটি তিব্বতী অনুবাদও নেপালেই আবিষ্কার করেন। তিব্বতী অনুবাদে গীত কিন্তু ৫১টি; মূল সংখ্যা বোধ হয় ছিল তোহাই। এই গানগুলি প্রত্যেকটিই প্রাচীনতম বাঙলায় রচিত। দ্বিতীয় তৃতীয় পুঁথি যথাক্রমে সিদ্ধাচার্য সরহ এবং কাহ্ন-রিচিত দুটি দোহাসংগ্ৰহ। তৃতীয়টি ডাকার্ণব বা ডাক-রচিত দেহা-সংগ্ৰহ। এই শেষোক্ত তিনটি গ্ৰন্থই শৌরসেনী অপভ্রংশে রচিত এবং সংস্কৃত-টীকাযুক্ত।
আচার্য সুনীতিকুমার চর্যাগীতিগুলির ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করিয়া নিঃসন্দেহে প্রমাণ করিয়াছেন, ইহাদের ভাষা প্রাচীনতম বাঙলা-ভাষার লক্ষণাক্রান্ত। শুধু তাহাই নয়, ইহাদের ব্যাকরণরীতি ও বাকভঙ্গি একান্তই বাঙলা, এবং এখনও বাঙলা-ভাষায় স্বীকৃত ও প্রচলিত। গীতগুলিতে এমন অনেক প্রবাদ আছে যাহা আজও বাঙলাদেশে সুপ্রচলিত; তাহা ছাড়া, ইহাদের মধ্যে নৌকা, নদনদী প্রভৃতি লইয়া ছবিতে উপমায় যে পারিপার্শ্বিকের চিত্র সুপরিস্ফুট তাহা একান্তই নদীমাতৃক বাঙলা দেশের।
৪৬টি চর্যাগীতির ২২ জন কবি সকলেই সিদ্ধাচার্য, এবং চুরাশি সিদ্ধার নামের তালিকায় ইহাদের প্রত্যেকেরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তবে, ইহাদের প্রত্যেকের দেশ ও কালনির্ণয় কঠিন। আচার্য সুনীতিকুমার, প্ৰবোধচন্দ্ৰ বাগচী, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রভৃতিরা নানাদিক হইতে বিচার করিয়া কাল-নির্ণয়ের চেষ্টা করিয়াছেন; সাক্ষ্য-প্রমাণ যাহা আছে তাহা কিছুটা পরস্পর বিরোধী, পরিমাণে স্বল্প এবং সর্বত্র সুস্পষ্ট এবং নিঃসংশয়ও নয়। তবে, এক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়া, আর সকলেই মনে করেন, এই সিদ্ধাচার্য কবিরা মোটামুটি নবম শতক হইতে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বিদ্যমান ছিলেন। ইহাদের মধ্যে লুই-পা, কাহ্ন-পা, জলন্ধৱী-পা বা হাড়ি-পা, শবরী-পা, ভুসুকু, তন্ত্রীপাদ প্রভৃতিরাই সমধিক প্রসিদ্ধ এবং ইহাদের দেশ ও কাল সম্বন্ধে আগেই বলিয়াছি। মনে হয়, এই গীত-রচয়িতারা সকলেই প্ৰাচীন বাঙলা দেশের অধিবাসী ছিলেন; যাঁহারা তাহা ছিলেন না তাহদেরও বাঙলা দেশ ও বাঙালীর জীবন সম্বন্ধে অন্তত প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছিল। তবু, এ-তথ্যও একেবারে নিঃসংশয়, এমন বলা চলে না।
বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসের দিক হইতে এই গীতগুলির মূল্য অপরিমেয়। প্রায় প্রত্যেকটি গীতই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত, এবং অন্তঃমিলে বাধা, প্রত্যেকটি গীত এক একটি বিশেষ বিশেষ রাগে গাওয়া হইত। বাঙলা পয়ার বা লাচাড়ী ছন্দ এই গীতিগুলির ছন্দ হইতেই বিবর্তিত। যত গুহ্য অধ্যািত্মসাধনার গুহ্যতার তত্ত্বই ইহাদের মধ্যে নিহিত থাকুক না কেন, স্থানে স্থানে এমন পদ দু’চারটি আছে যাহার ধ্বনি, ব্যঞ্জনা ও চিত্ৰগৌরব এক মুহূর্তে মন ও কল্পনাকে অধিকার করে। অথচ, এ-কথাও সত্য যে, সাহিত্যসৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই গীতগুলি রচিত হয় নাই, হইয়াছিল। বৌদ্ধ সহজসাধনার গুঢ় ইঙ্গিত ও তদনুযায়ী জীবনাচরণের (চর্যর) আনন্দকে ব্যক্ত করিবার জন্য। সহজ-সাধনার এই গীতিগুলি কর্তৃক প্রবর্তিত খাতেই পরবর্তীকালের বৈষ্ণব সহজিয়া গান, বৈষ্ণব ও শাক্ত-পদাবলী, আউল-বাউল-মারফতী-মুর্শিদা গানের প্রবাহ বহিয়া চলিয়াছে। এই গ্রন্থের নানা স্থানে নানা সূত্রে চর্যাগীতির নানা বিচ্ছিন্ন পদ উদ্ধার করিয়াছি; এখানেও দুই চারিটি উদ্ধার করিতেছি ইহাদের সাহিত্য-মূল্যের কিছুটা আস্বাদন দানের উদ্দেশ্যে।
উঁচা উঁচা পাবত তহি বসই সবরী বালী।
মোরঙ্গী পীচ্ছ পরহিণ সবরী গুঞ্জরী মালী৷।
উমত সবারো পাগল সবারো মা কর গুলি গুহাড়া তোহৌরি।
নিঅ ঘরিণী নামে সহজ সুন্দরী।।
নানা তরুবর মোউলিল রে গঅণত লাগেলী ডালী।
একেলী সবরী এ বন হিণ্ডই কর্ণকুণ্ডল বজ্রধারী৷
তিএ ধাউ খাট পাড়িলা সবরো মহাসুখে সেজি ছাইলী।
সবর ভূজঙ্গ নৈরামণি দারী পেহ্ম রাতি পোহাইলি৷।
উঁচু উঁচু পর্বত, সেখানে বসতি করে শবরী বালিকা, শবরীর পরিধানে ময়ূরের পাখা, গলায় গুঞ্জার মালা। ওগো উন্মত্ত শবর, পাগল শবর, গোলে ভুল করিও না, দোহাই তোমার— আমি তোমারই গৃহিণী, নামে সহজ সুন্দরী। নানা তরু মুকুলিত হইল, গগন স্পর্শ করিল। ডাল, কর্ণকুণ্ডল বজধারী একেলা শবর এ-বনে ঘুরিয়া বেড়ায়। তিন ধাতুর খাট পাতিল শবর, মহাসুখে বিছাইল শয্যা, শবর ভূজঙ্গ এবং নৈরাত্মা স্ত্রী- উভয়ে একত্র প্ৰেমারাত্রি পোহাইল।
তিন না চুপই হরিণা পিবই ন পাণী।
হরিণা হরিণীর ণিলয় ণ জাণী৷
হরিণী বোলঅ সুণ হরিণা তো।
এ বন চছাড়ি হোহু ভান্তো৷
ভয়ে তৃণ ছোঁয় না হরিণ, না খায় জল; হরিণ জানে না হরিণীর নিলয়। হরিণী আসিয়া বলে, হরিণ, তুমি শোনো, এ—বন ছাড়িয়া ভ্রান্ত হইয়া চলিয়া যাও।
কুলেঁ কুলেঁ মা হোইরে মূঢ়া উজুবাট সংসারা।
বাল ভিণ একুবাকু ণ ভূলহ রাজপথ কন্ধারা৷।
মায়া মোহ সমুদারে অস্ত ন বুঝসি থাহা।
আগে নাব ন ভেলা দীসই ভপ্তি ন পুচ্ছসি নাহা।।
সুনাপাস্তুর উহ ন দীসই ভান্তি ন বাসসি জান্তে।
এষা অটমহাসিদ্ধি সিঝই উজ বাট জায়ন্তে৷।
