চট্টগ্রাম অঞ্চলেও একটি প্রসিদ্ধ বিহার ছিল; তাহার নাম পণ্ডিত-বিহ্বার। এই বিহার ছিল সিদ্ধাচার্য তৈলপাদের কর্মভূমি। বর্তমান ত্রিপুরা-জেলার পট্টিকেরক নামক স্থানে একটি বিহার ছিল, তাহার নাম কনকস্তূপ-বিহার; কাশ্মীরী ভিক্ষু বিনয়শ্ৰীমিত্র এবং তাহার কয়েকজন সহকর্মীর স্মৃতি এই বিহারের সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি ময়নামতী পাহাড়ের উপর যে সুবিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহা বোধ হয় এই বিহারেরই ধ্বংসাবশেষ।। ১২২০ খ্ৰীষ্ট বৎসরের রণবঙ্কমল্ল হরিকালদেবের তাম্রপট্টোলীতেও পট্টিকের নগরীতে দুৰ্গােত্তার নামে উৎসৰ্গীকৃত একটি বিহারের উল্লেখ আছে।পট্টিকেরকের কনকন্তুপ-বিহার এবং পট্টিকেরার দুর্গেত্তারা-বিহার একই বিহার কিনা বলা কঠিন। উত্তরবঙ্গে আর একটি বিহার ছিল, তাহার নাম দেবীকেট-বিহার; আচার্য অদ্বয়বজি, ভিক্ষুণী মেখলা প্রভৃতির নাম এই বিহারের সঙ্গে জড়িত। ফুল্লহরি ও সন্নগর-বিহার নামে আরও দুইটি বিহার ছিল প্রাচ্য-ভারতে। ফুল্লহরির অবস্থিতি ছিল উত্তর-বিহারে, বোধ হয় মুঙ্গেরের নিকটে। এই বিহারেও অনেক গ্ৰন্থ রচিত ও অনূদিত হইয়াছিল। সন্নগর-বিহারও বৌদ্ধ জ্ঞান-সাধনার অন্যতম কেন্দ্র ছিল, এবং আচার্য বনরত্ন সেই বিহারে বাস করিতেন; কিন্তু ফুল্লহরির মতন এই বিহারটির অবস্থিতিও বোধ হয় ছিল প্রাচীন বাঙলাদেশের বাহিরে।
০৫. সৃজ্যমান বাংলাভাষা।। শৌরসেনী অপভ্ৰংশ
পাল-চন্দ্র পর্বে প্রধানত সংস্কৃত এবং হয়তো স্বল্পাংশে মাগধী প্রাকৃতের মাধ্যমে ব্ৰাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ ধৰ্মসম্প্রদায়কে আশ্রয় করিয়া যে সুবিপুল সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহার কিছুটা পরিচয় লাইতে চেষ্টা করিয়াছি। এ-কথাও আগে বলিয়াছি, লোকায়ত স্তরে মাগধী অপভ্রংশের স্থানীয় রূপ এবং উত্তর-ভারতের সর্বজনবোধ্য শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রচলনও ছিল যথেষ্ট। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা কেহ কেহ এই শেষোক্ত ভাষায় কিছু কিছু গান এবং পদ রচনাও করিয়াছেন। মাগধী অপভ্রংশের স্থানীয় গৌড়-বঙ্গীয় রূপের সঙ্গে শৌরসেনী অপভ্রংশের খুব বড় কিছু পার্থক্যও ছিল না। নবসৃজ্যমান বাঙলা ভাষায় রচিত চর্যাগীতিগুলিতে যে-ভাষা আমরা প্রত্যক্ষ করি তাহা সদ্যোও মাগধী অপভ্রংশের গৌড়-বঙ্গীয় রূপেরই সহজ ও স্বাভাবিক বিবর্তন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাহার উপর শৌরসেনী অপভ্রংশের প্রভাবও কিছু কিছু পড়িয়াছে। আর, প্রাচ্যদেশে স্থানীয় লেখকদের জনসাধারণের লেখনীতে ও মুখে মুখে শৌরসেনী অপভ্রংশও অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক উপায়েই কিছু কিছু প্ৰাচ্য উচ্চারণ ও বানান, বাক ও পদবিন্যাসভূঙ্গি স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছে। এই স্বীকৃত বাঙালী সিদ্ধাচার্যদের রচিত দোহা এবং পদগুলির মধ্যে সুস্পষ্ট।
শিক্ষিত বর্ণসমাজের উচ্চস্তরে প্রচলিত সংস্কৃত ভাষাকে বাদ দিলে মাগধী অপভ্রংশের স্থানীয় বিবর্তিত রূপই ছিল এই পর্বে রাঢ়-বরেন্দ্র-ব্যঙ্গ-সমতট-চট্টলের লোকায়ত ভাষা। মূলত এই আর্যভাষায় আর্যেতার অষ্টিক, দ্রাবিড় ও ভোটদ্ৰব্ৰহ্ম ভাষাগোষ্ঠীর নানা স্থানীয় বুলিরও যথেষ্ট প্রভাব ছিল, শুধু শব্দ ও উচ্চারণ-ভঙ্গিতেই নয়, কিছুটা বাকভঙ্গি ও পদবিন্যাসরীতিতেও, তাহাও অস্বীকার করা যায় না। সংস্কৃত হইতে মাগধী প্রাকৃত এবং প্রাকৃত হইতে মাগধী অপভ্রংশের বিবর্তন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া কী করিয়া হইতেছিল, এ-তথ্যও আজি আচার্য সুনীতিকুমারের গবেষণার ফলে সুবিদিত।
যাহাই হউক, সুবিস্তৃত আলোচনা-গবেষণার ফলে আজ এই তথ্য সুপ্রতিষ্ঠিত যে, আনুমানিক নবম-দশম-শতকে বাঙলাদেশে সংস্কৃত ছাড়া আরও দু’টি ভাষা প্রচলিত ছিল, একটি শৌরসেনী অপভ্রংশ, আর একটি মাগধী অপভ্রংশের স্থানীয় বিবর্তিত রূপ যাহাকে বলা যায় প্রাচীনতম বাঙলা। একই লেখক এই দুই ভাষায়ই পদ, দোহা ও গীত প্রভৃতি রচনা করিতেন; শ্রোতা ও পাঠকেরাও দুই ভাষাই বুঝিতে পারিতেন। নবম-দশম শতকের আগে এই লোকায়ত ভাষার রূপ। কী ছিল আজ আর তাহা জানিবার উপায় নাই; সে-ভাষার নমুনা কোনও সাহিত্যে কেহ ধরিয়া রাখে নাই। পরেও নবসৃজ্যমান যে প্রাচীনতম বাঙলা ভাষার কথা বলিতেছি, সে-ভাষায় লিখিত রচনার সংখ্যা অত্যন্ত স্বল্প। সংস্কৃতের মর্যাদা ও প্রভাব শিক্ষিত সমাজে ও উচ্চ বৰ্ণস্তরে ছিল। সর্বব্যাপী; তাহারা সকলে সংস্কৃতের চর্চাই করিতেন, এবং মধ্যযুগে চৈতন্যদেবের কালেও অধিকাংশ পণ্ডিত ও লেখক যখন যাহা কিছু রচনা করিয়াছেন— জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সাহিত্য-দর্শনে- সাধারণত সংস্কৃতের মাধ্যমেই করিয়াছেন। লোকায়ত ভাষার কৌলীন্য-মৰ্যাদা তখনও যথেষ্ট সুপ্রতিষ্ঠিত হয় নাই। এমন কি, পাল-চন্দ্র পর্বে তান্ত্রিক ও বজ্রযানী আচাৰ্যরা যে এক ধরনের প্রাকৃতধর্মী বৌদ্ধ-সংস্কৃতের প্রচলন করিয়াছিলেন দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে তাহাও পরিত্যক্ত হইয়াছিল, এবং তাঁহারও বিশুদ্ধ ব্যাকরণসম্মত সংস্কৃত লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। তবে, এক শ্রেণীর লোকেরা- তাহারা সাধারণত ইসলাম-প্রভাবে প্রভাবান্বিত— বাঙলাদেশের কোথাও কোথাও বোধ হয়। সেই প্রাকৃতধর্মী৷ ‘বৌদ্ধ-সংস্কৃতের ধারা বহমান রাখিয়াছিলেন; শোক-শুভোদয়া-গ্রন্থে সেই ভাষার কিছুটা আভাস ধরিতে পারা কঠিন নয়।
বলিয়াছি, সৃজ্যমান প্রাচীনতম বাঙলায় রচিত গ্রন্থের সংখ্যা অত্যন্ত স্বল্প। সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার দিক হইতে তাহার উল্লেখযোগ্য মূল্য না থাকিলেও বাঙলাভাষা ও বাঙালীর সংস্কৃতির দিক হইতে লোকায়ত ভাষার এই প্রাচীনতম নমুনাগুলির মূল্য অপরিসীম। ইহার পশ্চাতে বহুদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রের বা সমাজের শিক্ষিত উচ্চতর বর্ণস্তরের কোনও সক্রিয় সমর্থন বা সহযোগিতা ছিল না, এবং সংস্কৃত ভাষার মাধ্যম ও উচ্চস্তরের সংস্কৃতির আড়ালে লোকায়ত সংস্কৃতির এই প্রকাশ বহুদিন পর্যন্ত যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করিতে পারে নাই।
