উপরে উল্লিখিত গ্ৰন্থ-লেখকদের জীবনী এবং গ্রন্থনামগুলি বিশ্লেষণ করিলেই বুঝিতে পারা যায়, এই সব বিহারের আচাৰ্যরা তাঁহাদের নিজ নিজ ধৰ্মশাস্ত্ৰে অধ্যয়ন-অধ্যাপনা তো করিতেনই, তাহা ছাড়া মহাযান ন্যায় ও দর্শন, ব্রাহ্মণ্য তীৰ্থিক শাস্ত্রাদি, ব্রাহ্মণ্য তন্ত্র, শব্দবিদ্যা; ব্যাকরণ, জ্যোতিষ প্রভৃতির অধ্যয়ন-অধ্যাপনাও হইত। পুঁথি নকল ও অনুবাদ করা, বৌদ্ধ বজ্রযানী-তান্ত্রিক দেবদেবীর ছবি আঁকা (ফা-হিয়েন এই ধরনের ছবি আঁকাও অভ্যাস করিয়াছিলেন তাম্রলিপ্তির বিহারে) প্রভৃতিও বিহারের ভিক্ষুকদের অন্যতম অনুশীলনের বিষয় ছিল। প্রত্যেক বিহারের ছোট বড় গ্রন্থাগারও ছিল, এ-অনুমানও খুব অযৌক্তিক নয়; নালন্দা-মহাবিহারের ইতিহাস এবং প্রত্নসাক্ষ্যই ভাহার প্রমাণ। ই-ৎসিঙের প্রায় সমসাময়িক :আচার্য বন্দ্য সংঘমিত্রের একটি বিহার ছিল, এ-খবর পাওয়া যায় দেবখঙ্গের আশ্রফপুর লিপিটিতে।
অষ্টম শতকীয় বাঙলার প্রসিদ্ধতম বৌদ্ধ বিহার সোমপুরী-মহাবিহার। এই বিহারেরই ধ্বংসাবশেষ লোকলোচনের গোচর হইয়াছে রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে। ক্রমহ্রস্বায়মান সুউচ্চ ত্রিতল মন্দির-বিহার; সর্বতোভদ্র তাহার স্থাপত্যরূপ। উত্তর দিকে সুপ্ৰশস্ত সিঁড়ি ধাপে ধাপে উঠিয়া গিয়াছে ত্রিতল পর্যন্ত। দ্বিতীয় তলায় মন্দির-প্রকোষ্ঠী; বিহারের অধিষ্ঠাতা দেবতা এই মন্দিরে পূজিত হইতেন। ত্রিতলের উপরে শিখরাকৃতি (?) চূড়া। মন্দিরের চারিদিকে সুপ্রশস্ত অঙ্গন; প্রত্যেক কোণে একটি করিয়া মণ্ডপ; সর্বতোভদ্র বিহার-মন্দিরের চারিদিকে ভিক্ষুদের বাসকক্ষ, সর্বসুদ্ধ ১৭৭টি। গোড়ায় বোধ হয়। এখানে একটি জৈন-বিহার ছিল। অষ্টম-শতকের শেষার্ধে ধর্মপাল নরপতির পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তৃত অঙ্গন ব্যাপিয়া সুপ্ৰশস্ত সুসমৃদ্ধ বিহার-মন্দির গড়িয়া ওঠে। একাদশ শতকের শেষ বা দ্বাদশ শতকের গোড়া পর্যন্ত এই মহাবিহার সমসাময়িক বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অধ্যাত্ম-সাধনার অন্যতম সুপ্ৰসিদ্ধ কেন্দ্ররূপে বিরাজমান ছিল। ধৰ্মপালের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত ও বর্ধিত বলিয়া বিহারটির অন্যতম নামই ছিল শ্ৰীধৰ্মপালদেবী-মহাবিহার; পাহাড়পুরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে যে মাটির শীলমোহর পাওয়া তারনাথ ও সুমপা দুইজনই বলিতেছেন, বিহারটির নির্মাতা দেবপাল; একটু ভুল করিয়াছেন, সন্দেহ কি? সুপ্ৰসিদ্ধ আচার্য ও মহাপণ্ডিত বোধিভদ্র, আচার্য কালপাদ বা কালমহাপাদ, স্বনামধন্য দীপঙ্কর, স্থবিরবৃদ্ধ বীৰ্য্যেন্দ্ৰ আচার্য করুণাশ্ৰীমিত্র পমুখেরা কোনও না কোনও সময়ে এই মহাবিহারের অধিবাসী ছিলেন। এই বিহারের অন্তেবাসী মহাযান যায়ী বিজয়াচার্য স্থবিরবুদ্ধ বীৰ্যেন্দ্র বুদ্ধগয়ায় একটি স্থানক বুদ্ধমূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। পাহাড়পুরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আবিষ্কৃত খ্ৰীষ্টীয় একাদশ শতকের লিপি-উৎকীর্ণ একটি লেখা হইতে জানা যায়, জনৈক শ্ৰীদশাবলগৰ্ভ সমস্ত জীবের কল্যাণার্থ এই বিহার-চত্বরের কোথাও একটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। একাদশ শতকের শেষাশেষি বা দ্বাদশ শতকের গোড়ায় সোমপুরের এই বিহারে যতি বিপুল শ্ৰীমিত্রের পরম গুরুর গুরু, যতি করুণাশ্ৰীমিত্র বাস করিতেন। তখন একদিন বঙ্গালী-সৈন্যদল আসিয়া বিহারে অগ্নিসংযোগ করে; প্ৰজ্বলমান আলয়ে দেবতার পদাশ্ৰয় করিয়া করুণাশ্ৰী পড়িয়ছিলেন; তবুও সেই গৃহ পরিত্যাগ করেন নাই; সেই ভাবেই অগ্নিদগ্ধ হইয়া তিনি প্রাণত্যাগ করেন। বিপুলশ্রমিত্র অগ্নিদাহে বিনষ্ট প্রকোষ্ঠগুলির সংস্কার সাধন করেন, বিহার-প্রাঙ্গণে একটি তারা-মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং সোমপুরীর বুদ্ধমূর্তিকে বিচিত্র স্বর্ণভরণে অলংকৃত করেন। তিনি নিজে বহুকাল বশী সন্ন্যাসীর মতো সেই বিহারে যাপন করিয়াছিলেন।
সোমপুরীর পরই বাঙলার প্রসিদ্ধ বিহার ছিল জগদ্দল-মহাবিহার। এই বিহারটি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল একাদশ শতকের শেষে, না হয় দ্বাদশ শতকের গোড়ায়, নরপতি রামপালের আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। রামাবতীতে রামপালের রাজধানীর সন্নিকটেই ছিল বোধ হয় ইহার অবস্থিতি। এই বিহারের অধিষ্ঠাতা দেবতা ও অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন যথাক্রমে অবলোকিতেশ্বর ও মহত্তারা। জগদলের আয়ু স্বল্পকাল, কিন্তু সেই স্বল্পকালের মধ্যেই সমসাময়িক বৌদ্ধ জগতের সর্বত্র জগদলের প্রতিষ্ঠা বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। বিভূতিচন্দ্ৰ, দানশীল, মোক্ষাকর-গুপ্ত, শুভাকর গুপ্ত, ধর্মােকর প্রভৃতি মনীষী আচার্যরা কোনও না কোনও সময়ে এই মহাবিহারের অধিবাসী ছিলেন।
উত্তরবঙ্গে যেমন সোমপুরী-বিহার ও জগদ্দল-বিহার, পূর্ববঙ্গে তেমনই সুপ্ৰসিদ্ধ বিহার ছিল বিক্রমপুরী-বিহার, ঢাকা জেলার বিক্রমপুর-পরগণায়। এই বিক্রমপুরী বিহারও বোধ হয় বিক্রমশীল-ধৰ্মপালের আনুকূল্যেই প্রতিষ্ঠিত ও লালিত হইয়াছিল। এই বিক্রমপুরী-বিহারই অন্তত কিছুদিনের জন্য অবধূতাচার্য কুমারচন্দ্র এবং লক্ষ্মীঙ্কর্যশিষ্য লীলাবজের কর্মভূমি ছিল।
ধর্মপালের সমসাময়িক আর একটি বিহার ছিল বাঙলাদেশে, কিন্তু কোন স্থানে তাহা বলা কঠিন। এই বিহারটির নাম ত্ৰৈকূটক-বিহার এবং এই বিহারে বসিয়াই আচার্য হরিভদ্র অষ্টসাহস্ত্ৰিকা-প্রজ্ঞাপারমিতার উপর তাহার সুপ্রসিদ্ধ টীকাটি রচনা করিয়াছিলেন। সুমপা রাঢ়দেশের এক ত্ৰৈকূটক-দেবালয়ের কথা বলিয়াছেন; ত্ৰৈকূটক-দেবালয় ও ত্ৰৈকূটক-বিহার এক এবং অভিন্ন হওয়া অসম্ভব নয়।
