ভাষা-বিশুদ্ধিও যে ছিল আর্যভাষী নরগোষ্ঠীর তাহাও তো মনে হয় না।
৬. জনপ্রবাহ ও বাস্তব সভ্যতা
দ্বিতীয় অধ্যায় । ইতিহাসের গোড়ার কথা
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – জনপ্রবাহ ও বাস্তব সভ্যতা
জনপ্রবাহ ও বাস্তব সভ্যতা
সংক্ষেপে জনতত্ত্ব ও ভাষাপ্রসঙ্গ লইয়া বাঙালীর গোড়াপত্তনের কথা বলা হইল। এইবার বাস্তব সভ্যতার উপাদান-উপকরণ এবং তাহার সঙ্গে বাঙালীর ও বাঙলাদেশের সম্বন্ধের একটা দিগদর্শন করিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে।
ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ। এই কৃষিই আমাদের প্রধান ধনসম্বল; এবং উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যপাদ পর্যন্ত যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারা আমাদের দেশে চলিয়া আসিয়াছে তাহাকে যদি একান্তভাবে কৃষি-সভ্যতা ও সংস্কৃতি আখ্যা দেওয়া যায় তাহা হইলে খুব অন্যায় হয় না। বারিবহুল নদনদীবহুল সমতলপ্রধান বাঙলাদেশে উত্তর ভারতের অন্য প্রদেশাপেক্ষা কৃষির এক সমৃদ্ধতর রূপ দেখা যায়। এই কৃষিকার্য যে অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অষ্ট্রেলীয় লোকেরাই আমাদের দেশে প্রচলন করিয়াছিলেন, তাহা অনুমান করিবার কারণ আছে। পুশিলুস্কি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করিয়াছেন যে, ‘লাঙ্গল’ কথাটাই অস্ট্রিকভাষীদের ভাষা হইতে গৃহীত। আনামীয় ভাষায় এই লাঙ্গল শব্দের মূলের অর্থ ‘চাষ করা’ এবং ‘চাষ করিবার যন্ত্র’ দুই বস্তুকেই বুঝায়। খুব প্রাচীনকালেই লাঙ্গল শব্দটি আর্যভাষায় গৃহীত হইয়াছিল। ইহার অর্থ বোধহয় এই যে, আর্যভাষীরা চাষকার্য জানিতেন না এবং সেইহেতু যে যন্ত্রদ্বারা চাষ করা হয় সে যন্ত্রের সঙ্গেও তাঁহাদের পরিচয় ছিল না। এই দুইই তাঁহারা পাইয়াছিলেন মূলত অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকদের নিকট হইতে। তীক্ষ্ণমুখ কাষ্ঠদণ্ড যন্ত্রের সাহায্যে প্রধানত যে বস্তুর চাষ এই অস্ট্রিকভাষী লোকেরা করিত তাহা ধান, এবং এই ধানই ছিল তাঁহাদের প্রধান খাদ্যবস্তু। অস্ট্রিকভাষী লোকেদের ভিতর যে কৃষিসভ্যতার পরিচয় পাওয়া যায়, তাহাতে মনে হয়, সমতলভূমিতে ও স্তরে স্তরে পাহাড়ের গা কাটিয়া চাষের ব্যবস্থা করিয়া তাহারা বন্য ধানকে লোকালয়ের কৃষিবস্তু করিয়া লইয়াছিল এবং তাহাই ছিল তাঁহাদের প্রধান উপজীব্য। অস্ট্রিকভাষী লোকদের বিস্তৃতি ভারতবর্ষে যে যে স্থানে ছিল সর্বত্রই এই ধানচাষেরও প্রচলন হইয়াছিল; তবে বারিবহুল নদনদীবহুল সমতলভূমিতেই যে ধান বেশি জন্মাইত, ইহা তো খুবই স্বাভাবিক। সেইজন্যই আসামে, বাঙলাদেশে, ওড়িশায়, দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রশায়ী সমতল দেশগুলিতে তাহা প্রসারলাভ করিয়াছিল বেশি; উত্তর ভারতে তত নয়। এখনও তাহাই। পরবর্তী কালে দ্রাবিড়ভাষী দীর্ঘমুণ্ড লোকেরা ভারতবর্ষে যব ও গমচাষের প্রচলন করে এবং যব ও গম উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত হইতে আরম্ভ করিয়া ক্রমশ বিহার পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে। যব ও গম ধানের মতো তত বারিনির্ভর নয়; উত্তর ভারতে এই দুই বস্তুর চাষের বিস্তৃতি অনেকটা সেই কারণেই। জন-বিস্তৃতি ও জলবায়ুর কারণ দুটি একত্র করিলেই বুঝা যাইবে, উত্তর ভারতের লোকেরা কেন আজ পর্যন্তও সাধারণত রুটিভুক এবং বাঙলা-আসাম-ওড়িশা ও দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রশায়ী সমতলভূমির লোকেরা কেন ভাত-ভুক।
ধান ছাড়া অস্ট্রিকভাষী লোকেরা কলা, বেগুন, লাউ, লেবু, পান (বর), নারিকেল, জাম্বুরা (বাতাবি লেবু), কামরাঙ্গা, ডুমুর, হলুদ, সুপারি, ডালিম ইত্যাদিরও চাষ করিত। এই কৃষিদ্রব্যের নামের প্রত্যেকটিই মূলত অষ্ট্রিকগোষ্ঠীর ভাষা হইতে গৃহীত, এবং ইহার প্রত্যেকটিই বাঙালীর প্রিয় খাদ্যবস্তু। এইসব শব্দের সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ ও বাঙলা রূপ লইয়া যে সব সুবিস্তৃত বিচার ও গবেষণা হইয়াছে তাহার মধ্যে ইতিহাসের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। আমি সেই শব্দতাত্ত্বিক আলোচনার বিস্তৃত পুনরুক্তির অবতারণা এখানে আর করিলাম না। কিন্তু চাষবাসের সঙ্গে ইহাদের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ হইলেও গো-পালন ইহারা জানিত বলিয়া মনে হয় না। বস্তুত, অস্ট্রিকভাষী লোকদের মধ্যে আজও গো-পালনের প্রচলন কম; যাহাদের মধ্যে আছে তাহারা পরবর্তী কালে আর্যভাষীদের নিকট হইতে তাহা গ্রহণ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। যতদূর সম্ভব, গো-পালন আর্যভাষীদের সঙ্গে জড়িত।
তবে, তুলার কাপড়ের ব্যবহারও অস্ট্রিকভাষীদের দান ৷ কর্পাস (কার্পাস) শব্দটিই মূলত অষ্টিক। তাঁতী বা তত্ত্ববায়েরা যে প্রাচীন ও বর্তমান বাঙালী সমাজের নিম্নতর স্তরের ইহার মধ্যে কি তাহার কিছুটা কারণ নিহিত? পট (পট্টবস্ত্র, বাঙলা পট্, পাট), কর্পট (= পট্টবস্ত্র) এই দুটি শব্দও মূলত অস্ট্রিক ভাষা হইতে গৃহীত। মেড়া বা ভেড়ার সঙ্গে ইহারা পরিচিত ছিল। ভেড়ার লোম কি ইহারা কাজে লাগাইত? ‘কম্বল’ কথাটি কিন্তু মূলত অস্ট্রিক, এবং আমরা যে অর্থে কথাটি ব্যবহার করি, সেই অর্থেই এই ভাষাভাষী লোকেরাও করে।
বুঝা গেল, অস্ট্রিকভাষী আদি অষ্ট্রেলীয়েরা ছিল মূলত কৃষিজীবী। কিন্তু ইহাদের সবারই জীবিকা ছিল কৃষিকার্য, এ কথা বলা যায় না। কতকগুলি শাখা অরণ্যচারীও ছিল। এই অরণ্যচারী নিখাদ ও ভীল, কোল শ্রেণীর শবর, মুণ্ডা, গদব, হো, সাঁওতাল প্রভৃতিরা প্রধানত ছিল পশুশিকারজীবী এবং পশু-শিকারে ধনুর্বাণই ছিল তাঁহাদের প্রধান অস্ত্রোপকরণ। বাণ, ধনু বা ধনুক, পিনাক -এই সব-কটি শব্দই মূলত অস্ট্রিক। ইহারা যে সব পশুপক্ষী শিকার করিত, অনুমান করা। তাঁহাদের মধ্যে হাতি, মেড়া (ভেড়া), কাক, কর্কট (কাঁকড়া) এবং কপোতের (যাহার অর্থ – পায়রাই নয়, যে কোনও পক্ষী) নাম করা যাইতে পারে। গজ, মাতঙ্গ, গণ্ডার (হস্তী অর্থে) এবং কপোত মূলত অস্ট্রিক ভাষা হইতে গৃহীত। অন্যান্য অস্ত্রোপকরণের মধ্যে দা ও করাতের নামোল্লেখ করা যায়; ইহারাও অস্ট্রিকগোষ্ঠীর ভাষালব্ধ বলিয়া শব্দতাত্ত্বিকেরা অনুমান করেন।
