জিনমিত্র নামে আর একজন বৌদ্ধ আচার্য ছিলেন নরপতি ধর্মপাল, আচার্য দানশীল ও শীলেন্দ্ৰবোধির সমসাময়িক। শেষোক্ত দুইজন আচার্যের সঙ্গে একযোগে এবং তিব্বতরাজের অনুরোধে জিনমিত্র একখানি সংস্কৃত-তিব্বতী অভিধান রচনা করিয়াছিলেন; এই তিনজন একযোগে নাগার্জনের প্রতীত্যসমুৎপাদহািদয়কারিকা-গ্ৰন্থখানি তিব্বতীতে অনুবাদও করিয়াছিলেন। জিনমাত্র আর একটি গ্রন্থ তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করিয়াছিলেন তিব্বতী পণ্ডিত জ্ঞানসেনের সহযোগিতায়; গ্রন্থটির নাম অভিধর্মসমুচ্চয়ব্যাখ্যা।
শাস্তুরক্ষিতের মধ্যমকালঙ্কার-কারিকা ও তাহার বৃত্তি এবং সত্যদ্বয়বিভঙ্গপঞ্জিকাও মহাযানী গ্রন্থ। দশম শতকের শেষে বা একাদশ শতকের গোড়ায় রত্নাকরশান্তি মৈত্ৰেয়নাথের অভিসময়ালঙ্কার-গ্রন্থের উপর শুদ্ধিমতী নামে একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন। তদ্রচিত সারোত্তমা, প্রজ্ঞাপারমিতাভাবনোপদেশ এবং প্রজ্ঞাপারমিতোপদেশ এই তিনখানি গ্ৰন্থ প্রজ্ঞাপারমিতাতত্ত্বের ব্যাখ্যা। দীপঙ্করগুরু জেতারির বোধিচিত্তোৎপাদসমাদানবিধি এবং বোধিসত্ত্বশিক্ষাক্রম দুইই মহাযানী গ্ৰন্থ।
তিব্বতী ঐতিহ্য মতে দীপঙ্কর মহাযানের উপর প্রায় শতাধিক গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন; তন্মধ্যে শিক্ষাসমুচ্চয়-অভিসময়, সূত্রার্থসমুচ্চায়োপদেশ, প্রজ্ঞাপারমিতাপিণ্ডার্থপ্রদীপ, মধ্যমোপদেশ সত্যদ্বয়বার, সংগ্ৰহগর্ভ বোধিসত্ত্বমণাবলী, মহাযানপথসাধনবৰ্ণসংগ্রহ এবং বোধিমাগপ্রদীপ উল্লেখযোগ্য।
রামপালের রাজত্বকালে অভয়াকর-গুপ্ত যোগাবলী, মৰ্মকৌমুদী, এবং বোধিপদ্ধতি নামে তিনখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন; তিনখানাই মহাযান গ্ৰন্থ এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। কুলদত্ত-রচিত মহাযানের ক্রিয়ানুষ্ঠান সম্বন্ধে বিস্তৃত ভাষ্য ক্রিয়াসংগ্ৰহপঞ্জিকাও এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। সোমপুর-বিহারবাসী বোধিভদ্রের জ্ঞানসারসমুচ্চয়ও মহাযানগ্রন্থ সন্দেহ নাই। জগদলের। বিভূতিচন্দ্ৰ শান্তিদেব-রচিত বোধিচর্যবিতারের একখানি টাকা লিখিয়াছিলেন; আর একখানি টীকা রচনা করিয়াছিলেন দীপঙ্কর স্বয়ং।
বাঙলার বৌদ্ধ বিহার
এতক্ষণ যে-সব বৌদ্ধ আচার্য ও তাঁহাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার কথা বলা হইল তাহার কেন্দ্র ছিল বাঙলার বৌদ্ধ-বিহারগুলি, এবং তাহাদের সংখ্যা কিছু কম ছিল না। জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার বিবৃতি-প্রসঙ্গে এই সব বিহারের কথা কিছু কিছু উল্লিখিত হইয়াছে; কিন্তু সমসাময়িক বাঙলার সংস্কৃতি-প্রচেষ্টায় ইহাদের দানের পরিমাপ করিতে হইলে সমগ্রভাবে ইহাদের একটু পরিচয় লণ্ডয়া প্রয়োজন।
পাল-চন্দ্র পর্বের আগেও বাঙলাদেশে বিহার-সংঘারামের কিছু যে অপ্রতুলতা ছিল না, তাহার সাক্ষ্য রাজকীয় লিপিমালা, ফা-হিয়েন, যুয়ান-চোয়াঙ ও ই-ৎসিঙের বিবরণ। বৈনাগুপ্তের গুণাইঘর-পট্টে তিন তিনটি বিহারের উল্লেখ আছে- রুদ্রদত্তের আশ্রম-বিহার, রাজবিহার ও জিনসেন-বিহার। ফা-হিয়েনের সময় এক তাম্রলিপ্তিতেই বাইশটি বিহার ছিল এবং বহু স্থবির ও আচার্য সেই সব বিহারে বাস করিতেন। য়ুয়ান-চোয়াঙের কালে পুণ্ড্রবর্ধনে ছিল বিশটি বিহার, সমতটে ত্রিশটি, তাম্রলিপ্তিতে দশটি, কযঙ্গলে ছয়-সাতটি এবং কর্ণসুবৰ্ণে দশটি। পুণ্ড্রবর্ধন-রাজধানীর প্রায় তিন মাইল দক্ষিণে ছিল পো-চি-পো বিহার; সুপ্ৰশস্ত ও আলোকজজুল ছিল ইহার অঙ্গন, সুউচ্চ ছিল ইহার মণ্ডপ ও চূড়া। সাত শত মহাযানী শ্রমণ এবং পূর্ব-ভারতের অনেক খ্যাতনামা আচার্যের অধিষ্ঠান ছিল সংঘারাম। মহাস্থান-সমীপবর্তী ভাসূ-বিহারের ধ্বংসাবশেষই বোধ হয় য়ুয়ান-চোয়াঙ-বর্ণিত পো-চি-পো বিহার। কর্ণসুবর্ণের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বিহার ছিল লো-টো-মো-চি বা রক্তমৃত্তিক (রাঙামাটি)-বিহার। এই বিহারেরও কক্ষগুলি ছিল প্রশস্ত এবং সুউচ্চ সৌধগুলি ছিল একাধিক তলযুক্ত। ক্যঙ্গলের উত্তরাংশে গঙ্গার অনতিদূরে একটি সুউচ্চ সুগঠিত বিহার ছিল; চারিদিকের দেয়ালে নানা অলংকরণ, নানা দেবদেবীর খোদিত মূর্তি। ই-এসিঙের কালে তাম্রলিপ্তির শ্রেষ্ঠ বিহার ছিল পো-লো-হো বা বরাহ বিহার। এই বিহারের ভিক্ষুদের জীবনযাত্রা, তাহাদের দৈনন্দিন নিয়ম-সংযম খ্যাতি ও সমৃদ্ধি ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের পরস্পর সম্বন্ধ প্রভৃতি বিষয়ে কিছু কিছু বিবরণ ই-ৎসিঙ রাখিয়া গিয়াছেন। এই সমস্ত বিহারের ব্যয়ভার কীভাবে নির্বাহ হইত ফা-হিয়েন ও ই-ৎসিঙ তাহারও কিছু আভাস রাখিয়া গিয়াছেন। ফা-হিয়েন বলিতেছেন,
‘দেশের রাজা-রাজড়া, নাগরিক ও অন্যান্য সম্রাপ্ত ব্যক্তিরা বৌদ্ধ শ্রমণদের জন্য বিহার নির্মাণ এবং তাঁহাদের সকল প্রকার ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য ভূমি-ঘরবাড়ি, উদ্যান আরাম প্রভৃতি দান করিয়া থাকেন। এক রাজার পর অন্য রাজা সেই উদ্দেশ্যে তাম্রশাসন দান ও পট্টিকৃত করিয়াছেন। সেই জন্য কেহই সে-সব আত্মসাৎ বা বাজেয়াপ্ত করিতে পারে না।‘
ই-ৎসিঙের বর্ণনাও উল্লেখযোগ্য।
‘বুদ্ধ ভিক্ষুদের পক্ষে চাষবাসের কাজ নিষেধ করিয়া গিয়াছিলেন, সেই জন্য তাঁহারা বিহার বা ভিক্ষুসংঘের কৃষিভূমি বিনা করে অন্যকে চাষবাস করিতে দিতেন এবং পরিবর্তে উৎপাদিত শস্যের অংশমাত্র গ্রহণ করিতেন। তাহার ফলে তাহারা সাংসারিক চিস্ত হইতে মুক্ত থাকিতেন, জলসেচনের ফলে প্ৰাণীহত্যাও তাঁহাদের করিতে হইত না, শীল ও সদাচার পালন করা সহজ হইত। ভিক্ষুদের পরিচ্ছদের ব্যয় সংঘের সাধারণ সম্পত্তি হইতেই বহন করা হইত। বিহারগুলি যে নিষ্কর ভূমি ভােগ করিত সেই ভূমির উৎপাদিত শস্য, বৃক্ষ ও ফল হইতে ভিক্ষু-শ্রমণদের চীবর, অন্তর্বাস, বহির্বােস প্রভৃতি সব কিছুর ব্যয় নির্বাহ হইত। গৃহী ভক্ত ও উপাসকের নিকট হইতে তাঁহারা নানাপ্রকারের দানও গ্রহণ করিতেন; আহার্য গ্রহণেও কাহারও কোনও আপত্তি ছিল না। আহার্য ও পরিচ্ছদ সম্বন্ধে তাহারা নির্ভাবনা ছিলেন বলিয়াই সুস্থ ও স্বচ্ছন্দচিত্তে ধান ও পূজায় (এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায়) তাহারা কালাতিপাত করিতে পারিতেন।‘
