কাহ্ন-পা
লুইপা-মৎস্যেন্দ্রনাথ এবং গোরক্ষনাথের পরই যে সিদ্ধাচার্যের প্রসিদ্ধি তাহার নাম কৃষ্ণ বা কৃষ্ণপাদ বা কতু-পা বা কাহ্ন-পা। কাহ্ন-পা ছিলেন জলন্ধৱীপাদের শিষ্য, এবং নাথপন্থী ও সহজপন্থীদের অন্যতম প্রধান আচার্য। তারনাথ বুলিতেছেন, জলন্ধরীশিষ্য কৃষ্ণাচার্যের বাড়ি ছিল পাদ্যানগর বা বিদ্যানগর; তিব্বতী ঐতিহ্যান্তর মতে কাহ্ন-পা ছিলেন দেবপালের সমসাময়িক জনৈক কায়স্থ, বাসস্থান ছিল সোমপুরী (বিহার)। সুমপা বলিতেছেন, জালন্ধর শিষ্য কাহ্ন ছিলেন ব্ৰাহ্মণ বংশজাত জনৈক তান্ত্রিক আচার্য। তারনাথ জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ দুই কৃষ্ণাচার্যের কথা বুলিতেছেন; তাহার মতে কনিষ্ঠ কৃষ্ণাচার্যই ছিলেন হেবজ, শম্বর, এবং জামন্তক প্রভৃতি বজ্রযানী দেবতার সাধনগ্রন্থের লেখক এবং দোহ-রচয়িতা; বর্ণে ছিলেন তিনি ব্রাহ্মণ। অন্য আর এক তিব্বতী ঐতিহ্যমতে এক কৃষ্ণ ছিলেন সোমপুরী-বিহারের অধিবাসী। জালন্ধর-শিষ্য কাহ্ন-কাহ্নপা-কৃষ্ণাচার্য এক এবং অভিন্ন, সন্দেহ নাই; তিনিই ছিলেন সোমপুরী বা সোমপুরী-বিহারের অধিবাসী, তান্ত্রিক ও বজ্রযানী সাধনগ্রন্থের লেখক এবং দোহা—রচিয়তা, এবং তারনাথ কথিত কনিষ্ঠ কৃষ্ণাচার্য। যাহা হউক, কাহ্ন-কাহ্নপা কৃষ্ণাচার্য পঞ্চাশ খানারও উপর গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন; অধিকাংশই বজ্ৰযান সাধন-সম্পর্কিত। তাহা ছাড়া চর্যাগীতি-গ্রন্থে কাহ্ন-কৃষ্ণাচার্যপদ-কৃষ্ণপদের দশখানা গীতি আছে প্রাচীনতম বাঙলা ভাষায়, এবং কৃষ্ণাচার্য-রচিত একখানা দোহাকোষ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক সম্পাদিত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। পণ্ডিতাচার্য শ্ৰীকৃষ্ণপাদ-বিরচিত, গোবিন্দপালের ৩৯ রাজ্যাঙ্কে লিখিত হেবজ্রপঞ্জিকা নামে একখানা পুঁথি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে।
দারিক, কিল-পা, কর্মার, বীণা-পা, গুণ্ডারীপাদ, কঙ্কণ, গর্ভপাদ
বাঙলার সিদ্ধাচার্যদের তালিকা সুদীর্ঘ। সকলের কথা বলিবার স্থান নাই; প্রয়োজনও নাই। কয়েকজনের কথা উল্লেখ করিতেছি মাত্র। লুই-পা ও নারো-পার এক শিষ্য ছিলেন দারিক বা দারিপাদ; তিব্বতী ঐতিহ্যমতে তাহার বাড়ি ছিল সালিপুত্ৰ (মগধ) নামক স্থানে এবং তিনি (পালবংশীয়?) ইন্দ্ৰপালের সমসাময়িক। ত্যাঙ্গুর—তালিকায় তদ্রচিত বারোখানা বজ্রযানী-গ্রন্থের উল্লেখ আছে; চর্যাগীতিতে একটি গীতিও স্থান পাইয়াছে। লুই-পাঁর এক বংশধর ছিলেন কিল-পা বা কিল-পাদ; দোহাচাৰ্য-গীতিকাদৃষ্টি নামে তিনি একখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। বিরূ-পা’র এক বংশধর ছিলেন কর্মর বা কর্মরি বা কমরি; তিনি মগধান্তৰ্গত সালিপুত্রের এক কর্মকার ছিলেন, এবং অন্তত একখানা বজ্রযানী গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। বীণাপাদ বা বীণা-পাও ছিলেন বিরূপার অন্যতম বংশধর। তিনি খুব ভালো বীণা বাজাইতেন, গহুরের (গৌড়ের?) এক ক্ষত্রিয় পরিবারে তাহার জন্ম হয়। বজাডাকিনী এবং গুহ্যসমাজের উপর তিনি অন্তত দুখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন; চর্যাগীতিতে তদ্রচিত একটি গীতিও স্থানলাভ করিয়াছে। কৃষ্ণের বা কৃষ্ণপদের এক বংশধর ছিলেন ধর্মপাদ বা গুণ্ডারীপাদ। ত্যাঙ্গুর-তালিকায় তদ্রচিত বারোখানা গ্রন্থের নামোল্লেখ আছে এবং চর্যাগীতিতে আছে দু’টি গীত। কম্বলপাদের এক বংশধর ছিলেন কঙ্কন; চর্যাগীতিতে তদ্রচিত একটি গীত আছে; তাহা ছাড়া চর্যান্দোহাকোর্যগীতিকা নামে তিনি একখানা গ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন। গর্ভরী-পা বা গর্ভপাদ বা গাভুরসিদ্ধ হেবজের উপর একখানা গ্রন্থ এবং একখানা বজ্ৰযান টীকা রচনা করিয়াছিলেন।
বাঙলাদেশে রচিত মহাযান গ্রন্থাদি
বজ্রযানী-কালচক্রযানী মন্ত্রযানী এবং বৌদ্ধ তান্ত্রিক অন্যান্য পন্থর পণ্ডিত ও আচার্যদের যে সংক্ষিপ্ত উল্লেখ ও পরিচয় দেওয়া হইল তাহা হইতে এ কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এই সব আচার্যরা শুধু কেবল বজ্রযানী সাধন, দোহা এবং গীতই শুধু রচনা করিয়াছেন, শুধু তন্ত্রধর্মেরই অনুশীলন করিয়াছেন শত শতু গ্রন্থে। এ-ধারণা কতকাংশে সত্যু হইলেও সর্বাংশে নয়। এই সব পণ্ডিত ও আচার্যরা মহাযানী ন্যায়শাস্ত্র, বিশুদ্ধ বিজ্ঞানবাদী দর্শন প্রভৃতির আলোচনাও করিয়াছেন, এবং কিছু কিছু মৌলিক চিন্তার প্রমাণও দিয়াছেন। ধর্মপালের সময় হইতেই সে-চেষ্টা আরম্ভ হইয়াছিল।
অষ্টসাহস্ত্ৰিকা প্রজ্ঞাপারমিতার উপর আচার্য হরিভদ্র-রচিত অভিসময়ালঙ্কারাবলোক নামীয় টীকায় হরিভদ্র নাগার্জুন-প্রবর্তিত মধ্যমক চিন্তা ও মৈত্ৰেয়নাথের যোগাচার-চিন্তার যে সমন্বয় চেষ্টা করিয়াছেন তাহা উল্লেখযােগ্য। টীকাখানি লেখা হইয়াছিল ধর্মপালের পৃষ্ঠপোষকতায়, ত্ৰৈকূটক-বিহারে। একাদশ শতকের গোড়ায় আচার্য রত্নভদ্র কর্তৃক এই গ্ৰন্থ তিব্বতীতে অনুদিত হয়। তিব্বতী ঐতিহ্যে জানা যায়, হরিভদ্র এই সুপ্রসিদ্ধ টীকাটি ছাড়া আরও অনেকগুলি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন মহাযান তত্ত্বাদি সম্বন্ধে; তন্মধ্যে পঞ্চবিংশতিসাহস্ত্ৰিকার একটি সংক্ষিপ্তসার, সঞ্চয়টীিকাসুবোধিনী, স্ফুটার্থনামক টীকা এবং প্রজ্ঞাপারমিতভাবনাই উল্লেখযোগ্য! আচার্য অসঙ্গ ও বিমুক্তসেনের মতামত ও গ্রন্থাদির উপরও তিনি কিছু আলোচনা করিয়াছিলেন।
হরিভদ্রের প্রধান শিষ্য ছিলেন আচার্য বুদ্ধশ্ৰীজ্ঞান বা বুদ্ধজ্ঞানপাদ। তিব্বতী জনশ্রুতিমতে তিনি ছিলেন ধর্মপালের সমসাময়িক এবং বিক্রমশীলা-মহাবিহারের অধ্যক্ষ; তাহার বাড়ি ছিল উড্ডয়ানে। তিনি মহাযানলক্ষ্মণসমুচ্চয় নামক একখানা মৌলিক গ্রন্থ এবং প্রজ্ঞাপ্ৰদীপাবলী নামে অভিসময়ালঙ্কারের একটি বৃত্তি রচনা করিয়াছিলেন।
