গোরক্ষনাথ
মীননাথ-মৎস্যেন্দ্রনাথের শিষ্য ছিলেন গোরক্ষনাথ। বাঙলাদেশে গোরক্ষনাথ-কথা সুপরিজ্ঞাত। গোরক্ষনাথের রচিত কোনও পুঁথি এ-পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই; তবে ত্যাঙ্গুর তালিকায় এক গোরক্ষের নামে একটি বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থের উল্লেখ আছে। হয়তো এই গোরক্ষ এবং গোরক্ষনাথ একই ব্যক্তি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় অবশ্য বলিয়াছেন, জ্ঞানকারিকা নামে একটি গ্রন্থ গোরক্ষনাথের নামের সঙ্গে জড়িত। গোরক্ষনাথ কাহিনী নানা রূপে রূপান্তরিত হইয়া উত্তর-ভারতের সর্বত্র– নেপালে, তিব্বতে, মধ্য দেশে, মহারাষ্ট্রে, গুজরাটে, পাঞ্জাবে— ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। পঞ্জাবের যোগীরা, বাঙলাদেশের নাথাযোগীরা, নাথপন্থীরা সকলেই গোরক্ষনাথকে গুরু বলিয়া স্বীকার করেন। পরবর্তী কালে গোরক্ষাসংহিতা, গোরক্ষসিদ্ধান্ত প্রভৃতি গ্রন্থে গোরক্ষনাথের প্রতিষ্ঠিত ধর্ম সম্প্রদায়ের মতামত বিধূত হইয়া আছে। বাঙলাদেশে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী গোরক্ষনাথ রাজা গোপীচন্দ্র বা গোবিন্দচন্দ্রের সমসাময়িক ছিলেন।
জলন্ধরীপাদ
গোরক্ষনাথের শিষ্য ছিলেন জলন্ধরীপাদ বা জলন্ধরপাদ। বাঙলাদেশে প্রচলিত কাহিনী অনুসারে গোপচাদের গল্পের হাড়ি-পা এবং জলন্ধরীপাদকে অনেকে এক এবং অভিন্ন বলিয়া মনে করেন। তারনাথের মতে জলন্ধরীর শিষ্য ছিলেন কৃষ্ণাচার্য এবং তাহার সঙ্গে হাড়ি-পা’র একটা সম্বন্ধও ছিল। তারনাথ এবং সুমপা দুই জনই বলিতেছেন, জলন্ধরীর যথার্থ নাম ছিল সিদ্ধ বালপাদ, কিন্তু নেপাল ও কাশ্মীষ্মের মধ্যবর্তী জলন্ধর নামক স্থানে তিনি কিছুদিন বাস করিয়াছিলেন বলিয়া লোকে তাহাকে জলন্ধরের আচার্যবলিয়াই জানিত। তিনি উদ্যান, নেপাল, অবন্তী এবং চাটিগ্রাম বা চট্টগ্রামে গিয়াছিলেন ভ্রমণে; গোপীচন্দ্রের পুত্র বিমলচন্দ্র তখন চট্টগ্রামের রাজা। ত্যাঙ্গুর-তালিকায় এক মহাপণ্ডিত, মহাচার্য জালন্ধর, আচার্য জলন্ধরী বা সিদ্ধাচার্য জালন্ধরী পাদের উল্লেখ আছে; এই মহাচার্য জালন্ধর বা জালন্ধরীপাদ আর গোপীৰ্চাদগুরু জলন্ধরী পাদ বোধ হয় এক এবং অভিন্ন ব্যক্তি। পূর্বোক্ত জলন্ধরের নামে তাঙ্গুর-তালিকায় চারিখানা বজ্রযানী-গ্রন্থের উল্লেখ আছে।
জালন্ধরীপাদের অন্যতম শিষ্য ছিলেন বিরূ-পা বা বিরূপাদ। তারনাথ বলিতেছেন, এই বিরূ-পা ছিলেন সিদ্ধাচার্যদের অন্যতম। সুমপার মতে এই বিরূ-পার জন্ম হইয়াছিল ত্রিপুরের (ত্রিপুরা) পূর্বদিকে, এবং দেবপালের রাজত্বকালে। তাঙ্গুর-তালিকায় দেখিতেছি, আচার্য-মহাচার্য বিরূ-পা এবং মহাযোগী-যোগীশ্বর বিরূপ প্ৰায় দশখানা বজ্রযানী পুঁথি, এবং বিরূপাদ-চতুরশীতি এবং দোহাকোষ নামে দুইখানা পদ ও দোহাগ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। চর্যাগীতিতে বিরূপার একটি গীতি স্থান পাইয়াছে, এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে বিরূপগীতিকা ও বিরূপবজগীতিকা নামক দুইটি গীতিগ্রন্থেরও লেখক ছিলেন বিরূ-পা। বিরূ-পা মহাসিদ্ধ ডোম্বি-হেরুকের অন্যতম গুরু ছিলেন। তিব্বতী ঐতিহ্যমতে ডোম্বি-হেরুক ছিলেন মগধের জনৈক ক্ষত্রিয় রাজা।
সরহ বা সরহপাদের কথা আগেই সরোরুহোবজ প্রসঙ্গে বলিয়াছি; এখানে পুনরুল্লেখের আর প্রয়োজন নাই।
তিলো-পা
তিলপ, তিল্লাপ, তিল্পিপা, তিলিপা, তিল্লোপা, তৈলোপ, তোল্লাপা, তেলোপা, তিলোপা, তৈলিকপাদ বা তেলিযোগী নামে একজন প্ৰসিদ্ধ সিদ্ধাচার্য ছিলেন মহীপালের সমসাময়িক। তিব্বতী ঐতিহ্যে তিনি ছিলেন ট্রাসাটির্গাও বা চট্টগ্রামের এক ব্ৰাহ্মণ, পরে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করিয়া প্রজ্ঞাবাৰ্মা বা প্রজ্ঞাভদ্ৰ নামে পরিচিত হন। তিনি চারখানা বোজযানী গ্ৰন্থ, একখানা দোহাকোষ, একখানা সহজওগ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। তিব্বতী ঐতিহ্যে আর এক সিদ্ধাচার্য তৈলিকপাদের কথা আছে র্যাহার বাড়ি ছিল ওদ্যানে। এই দুই সিদ্ধাচার্য তৈলিকপাদ এক এবং অভিন্ন বলিয়া মনে না করিবার কোনও কারণ নাই।
নাড়ো-পা
তৈলিকপাদের প্রধান শিষ্য ছিলেন নারো, ন্যারোপা, ন্যারোৎপা, নাড়োপা, নাড়, নাড়পাড়া, প্রভৃতি নামে পরিচিত জনৈক সিদ্ধাচার্য। তাহার অন্য দুইটি নাম বা উপাধি ছিল জ্ঞানসিদ্ধি ও যশোভদ্র। নাড়োপা জাতে ছিলেন শুড়ি, তাহার বাসস্থান ছিল প্রাচ্য-ভারতে সালপুত্ৰ নামক স্থানে; মগধের পশ্চিমে ফুল্লহরি নামক স্থানে (বিহার?)। তিনি তন্ত্রাভ্যাস করিতেন। এক তিরুবতী। ঐতিহ্যে তিনি ছিলেন প্রাচ্য দেশের রাজা শাক্য শুভশাস্তিবর্মর পুত্র; আর এক ঐতিহ্যমতে তিনি ছিলেন জনৈক কাশ্মীরী ব্রাহ্মণের পুত্র, পরে হন এক তীৰ্থিক (ব্রাহ্মণ) পণ্ডিত, এবং সর্বশেষে যশোধর বা জ্ঞানসিদ্ধি নাম লইয়া বৌদ্ধধর্মে সিদ্ধি লাভ করেন। তাঙ্গুরে তাঁহাকে মহাচার্য, মহাযোগী এবং শ্ৰীমহামুদ্রাচার্য উপাধিতে ভূষিত করা হইয়াছে। আচার্য জেতারির পশ্চাদগামী হিসাবে তিনি বিক্রমশীল-বিহারের উত্তরদারী পণ্ডিত নিযুক্ত হইয়াছিলেন, এবং বিদায় লইবার সময় আচার্য দীপঙ্করের উপর বিহারের দায়িত্বভার অর্পণ করিয়া যান। বৌদ্ধ আগমে ছিল তাহার পরম পাণ্ডিত্য; হেরুক, হেবজ এবং অন্যান্য বজ্রযানী দেবদেবীর উপর তিনি প্রায় দশখান। সাধন গ্রন্থ, সেকোদেশ-টীকা নামে কালচক্রযানী দীক্ষা সম্বন্ধে অন্তত একখানা গ্ৰন্থ, দুখানি বঙ্গীতি, একটি নাড়-পণ্ডিতগীতিকা এবং বর্জপদসারসংগ্ৰহ গ্রন্থের উপর একটি পঞ্জিকা বা টীকা রচনা করিয়াছিলেন।
